শুক্রবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৪, ঢাকা

আতঙ্ক কাটছে না পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের

খলিলুর রহমান
প্রকাশিত: ১০ মার্চ ২০২৩, ১০:৪৮ এএম

শেয়ার করুন:

আতঙ্ক কাটছে না পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের

একের পর এক আগুন আর বিস্ফোরণে পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সবশেষ গুলিস্তানের পাশে সিদ্দিকবাজারের ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনার পর আতঙ্কের মাত্রা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এমনকি আতঙ্কের কারণে অনেকেই রাতে ঘুমাতেও পারছেন না।

বৃহস্পতিবার (৯ মার্চ) গুলিস্তানের সিদ্দিকবাজার, আলুবাজার, নাজিরাবাজারসহ আশপাশের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।


বিজ্ঞাপন


স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরান ঢাকার প্রতিটি অলিগলিই এখন ঝুঁকিতে রয়েছে। একের পর এক দুর্ঘটনা এবং মুত্যুর মিছিল দীর্ঘ হলেও কোনো টনক নড়ছে না কর্তৃপক্ষের।

স্থানীয়রা জানান, পুরান ঢাকায় অলি-গলির ভেতরে হাজার হাজার কেমিক্যাল গোদাম, প্লাস্টিক কারখানা, জুতার কারখানা, ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাসের লাইন, অপরিকল্পিত ভবনের কারণে আতঙ্ক দিন দিন বেড়েই চলছে। যখনই কোনো বড় ঘটনা ঘটে, তখই সংশ্লিষ্টরা ঝুঁকিমুক্ত করতে নানা পদক্ষেপের কথা শোনালেও বাস্তবায়ন হয় না কিছুই। বিশেষ করে মৃত্যুকূপ খ্যাত কেমিক্যাল গোদামগুলো সরানো হয়নি এখনো। এগুলোকে রাসায়সিক পল্লীতে স্থানান্তরের কথা বলা হলেও কবে নাগাদ সেখানে সরানো হবে সেটিরও নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই কারো কাছে। ফলে বছরের পর বছর ধরে আতঙ্ক নিয়েই পুরান ঢাকাতে বসবাস করছেন বাসিন্দারা।

আরও পড়ুন: সবাই যেন আরেকটি ট্রাজেডির জন্য অপেক্ষায়…

ফায়সাল ইসলাম নামের এক বাসিন্দা ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামে। ১০ বছর থেকে পুরান ঢাকার আলু বাজার এলাকায় থাকি। সেখানে থেকে সিদ্দিকবাজার এলাকায় ব্যবসা করি। কিন্তু গত রোববার ভবন বিস্ফোরণের ঘটনার পর থেকে ঘুম আসছে না। শুধু আমার একার নয়, পরিবারের বাকি সদস্যরাও ঘুমাতে পারছে না।


বিজ্ঞাপন


dhaka3

এই ব্যবসায়ী বলেন, ঘটনার দিন আমি দোকানে ছিলাম। ঘটনাস্থল থেকে দুটি ভবন পেছনেই আমার দোকান। ঘটনার সময় বিকট আওয়াজের শব্দ এখনো ভুলতে পারছি না। সেই সময় মনে হয়েছিল আমিও মারা যাব। কিন্তু আল্লাহর রহমতে প্রাণে বেঁচে গেছি।

আরও পড়ুন: নিমতলী ট্র্যাজেডির এক যুগ, শঙ্কা নিয়ে বসবাস পুরান ঢাকায়

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, বিস্ফোরণের পরপর ঘটনাস্থল থেকে আহত মানুষদের উদ্ধার কাজ সরাসরি দেখেছি। আমিও উদ্ধারে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। এজন্য আমার মনে আতঙ্ক আরও বেশি বিরাজ করছে।

নাজিরা বাজারের বাসিন্দা জাফর সরকার ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে। বাবার ব্যবসার সুবাধে পুরান ঢাকায় বসবাস করি। আমার জন্মও পুরান ঢাকায়। কিন্তু গত রোববারের ঘটনার পর থেকে আমার মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। শুধু আমার নয়, আমাদের পরিবারের সবাই আতঙ্কের মধ্যে আছে। ঠিক মতো খাওয়া-ধাওয়া করা যাচ্ছে না।

জাফর সরকার বলেন, এভাবে দুর্ঘটনা ঘটতে থাকলে সেই এলাকায় বসবাস করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে। সরকারের উচিত পুরান ঢাকাকে বসবাস উপযোগী করে তোলার ব্যবস্থা নেওয়া। না হয় আরও ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

dhaka4

সিদ্দিকবাজারের স্যানিটারি ব্যবসায়ী ফরহাদ হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, পুরান ঢাকা সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ। এরপরেও আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আত্মীয়-স্বজনসহ এখানে থাকছি, ব্যবসা করছি। কিন্তু কষ্টের বিষয় হচ্ছে, একের পর এক বড় ট্রাজেডির সাক্ষী হতে হচ্ছে আমাদের। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে। আমরা আর আতঙ্ক নিয়ে বাস করতে চাই না। পুরান ঢাকাকে ঝুঁকিমুক্ত করতে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হোক। গ্যাস লাইন সংস্কার করে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।

আরও পড়ুন: নিমতলী থেকে সীতাকুণ্ড ট্রাজেডি

জানা যায়, ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীর নবাব কাটরায় রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে নারী ও শিশুসহ ১২৪ জন নিহত হন। এ ঘটনার পর ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সেখানে কেমিক্যালের গোডাউন থাকায় আগুন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। কেমিক্যালের কারণে বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। এ সময় ৭০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ১১ বছরে শুধু পুরান ঢাকায় পৃথক ঘটনায় দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। হতাহতের দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ ১৫টি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে মাত্র তিনটি ঘটনার পর মামলা হয়েছে। এসব দুর্ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অগ্নিকাণ্ডে জান-মালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও দোষীদের চিহ্নিত করা গেলেও তারা সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যায়।

dhaka33

ফায়ার সার্ভিস সূত্র বলছে, পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউনের ৯৮ ভাগই অবৈধ। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রাসায়নিকের এক একটি ড্রাম এক হাজার বোমার চেয়েও বেশি শক্তিশালী, যা থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে পুরান ঢাকার অধিকাংশ জায়গাই পুড়ে যেতে পারে।

আরও পড়ুন: একের পর এক বিস্ফোরণ, আতঙ্কে রাজধানীবাসী

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব ঢাকা মেইলকে বলেন, পুরান ঢাকা সবসময়ই ঝুঁকিতে রয়েছে। ঝুঁকিমুক্ত হতে সবার আগে পুরান ঢাকাবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তারা ঐক্যবদ্ধ নয় বলেই নিমতলি ট্রাজেডির পর যে ১৭ দফা বাস্তবায়নের কথা ছিল, সরকার সেই জায়গা থেকে সরে এসেছে।

এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, ঝুঁকি এড়াতে পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের নিয়ে নানা ধরনের সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম করা হচ্ছে। বাসিন্দাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। কারণ পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল গোডাউন, প্লাস্টিক কারখানাগুলোর কারণে ঝুঁকি কয়েকগুণ বেশি। এছাড়া অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণ ঘটলে সরু রাস্তার কারণে উদ্ধার অভিযানেও বেগ পেতে হয়।

কেআর/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর