শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

কাছ থেকে দেখা বিস্ফোরণ-পরবর্তী মুহূর্তগুলো

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ০৭ মার্চ ২০২৩, ১০:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

কাছ থেকে দেখা বিস্ফোরণ-পরবর্তী মুহূর্তগুলো

ঘড়ির কাঁটায় ঠিক মঙ্গলবার (৭ মার্চ) বিকেল ৪টা ৪২ মিনিট। শবে বরাতের বিকেল। গুলিস্তানমুখী ও সদরঘাটমুখী সড়কে তীব্র যানজট। থেমে থেমে যানবাহন চলছিল। হঠাৎ করেই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকা। বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে চারদিকে মানুষের চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়।

তখন বিস্ফোরণস্থল থেকে এক মিনিট দূরত্বে সাভার পরিবহনের বাসে আমিসহ ৪০-৪২ জন যাত্রী। প্রথমে সবাই ধারণা করছিল বাসের চাকা ফেটে গেছে। কিন্তু চালক পেছনে তাকিয়ে বললেন বাসের চাকা না। এসি বিস্ফোরণ মনে হয়।

মুহূর্তেই নেমে পড়ি বাস থেকে। পেছনে তাকাতেই দেখি চারিদিকে ধোঁয়ার কুণ্ডুলি। মানুষের ‘বাঁচাও’ ‘বাঁচাও’ চিৎকার।

F1

অফিসে দ্রুত খবরটি সংক্ষেপে জানিয়ে স্পটের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ততক্ষণে হাজারও মানুষের ভিড় দেখা যায়। কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ মিলছিল না।

এরমধ্যে চোখের সামনে দিয়ে একে একে দেখতে পাই আহত মানুষকে হাসপাতালে নেওয়ার দৃশ্য। পুরো ধুলোমাখা শরীরের একজন রিকশাচালক সামনে এসে বললেন, বাবা আমারে বাঁচান। কিছু চোখে দেখি না। তার রিকশায় মালামাল নিয়ে আসা লোকটির হাতও রক্তাক্ত। পরে দুজনকে দিয়ে তাদের ঢাকা মেডিকেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম।

এরপরই দেখি বীভৎস এক দৃশ্য। ভ্যানে করে পুরো শরীর রক্তাক্ত একজনকে শোয়ানো অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখেই মনে হচ্ছিল লোকটা বেঁচে নেই।

এমন করে একে একে যখন রক্তাক্ত মানুষগুলোকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখনকার দৃশ্য আসলে ভোলার নয়। কারণ যাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তাদের বেশিরভাগই রক্তাক্ত। অনেকের পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত ছিল। অনেকের চেহারা চেনা যাচ্ছিল না।

এক সময় দেখা যায়, সেনাবাহিনীর মালামাল নেওয়ার জন্য আসা একটা গাড়িতে করে ১০ থেকে ১২ জনকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলে।

কাছাকাছি গিয়ে দেখা যায়, স্যানিটারি মার্কেটের ভবনটির পূর্বপাশের দেয়াল, গ্রিল পুরোপুরি ভেঙে গেছে। ভেতরের ডেকোরেশনও ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। পাশের ব্র্যাক ব্যাংকের গুলিস্তান শাখারও পূর্বপাশের গ্রিল, গ্লাস পুরোপুরি ভেঙে গেছে।

F2

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট। পুলিশ সদস্যদের বাড়ানো হয় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে। ফলে পুরো এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় অন্ধকারে কাজ করতে বেগ পেতে হয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের। অন্যদিকে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। এতে উদ্ধার অভিযানে বেগ পেতে হয়।

ফলে বারবার মাইকিং করে, মৃদু লাঠিচার্জও করতে হয় পুলিশকে। তবুও লোকজনকে যেন সরানো যাচ্ছিল না।

সন্ধ্যার পরে ফায়ার সার্ভিসের আধুনিক যন্ত্রপাতি আনা হয়। যা দিয়ে সুউচ্চ ভবনের ভেতরেও কিছু আছে কি না তা খুঁজে বের করা যায়। পরে একে একে লাইট দিয়ে প্রত্যেক ফ্লোরে খোঁজা হয় মানুষের অস্তিত্ব।

উপরের দিকে তেমন কারও উপস্থিতি না পাওয়া গেলেও নিচতলা ও ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে মিলতে থাকে আহত, নিহত মানুষের লাশ। একে একে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলে।

F3

ঘটনাস্থলের আশপাশে ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার উল্টো দিকে ছিটকে পড়েছে ভাঙা কাচ। যার আঘাতে আহত হয়েছেন অনেকে। আহত-নিহতদের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এদের বেশিরভাগই সামনের ফুটপাতে ভ্যান রেখে মালামালের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কেউ আবার রিকশা চালক, অনেকে আছেন পথচারী।

এদিকে এখন পর্যন্ত বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে না পারলেও পুলিশ বলছে গ্যাসের গন্ধ মিলেছে। তবে ফায়ার সার্ভিস তদন্তের আগে কিছু বলতে পারছে না।

অন্যদিকে শুরুতে বিস্ফোরণের ভয়াবহতা বোঝা না গেলেও ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে সব। যে কারণে উদ্ধার অভিযানে যুক্ত করা হয়েছে সেনাবাহিনীকে। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই ঘটনায় বাড়তে পারে লাশের সারি।

বিইউ/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর