রাজধানীর ঢাকা-৫ আসনের ডেমরার ডগাইর দারুচ্ছুন্নত ফাজিল মাদরাসা ভোটকেন্দ্রে বৃহস্পতিবার বিকালে ভিড়ের মাঝেও এক দৃশ্য আলাদা করে চোখে পড়ছিল। ধীর পায়ে এগিয়ে আসছেন এক প্রবীণ মানুষ, পাশে কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে তার নাতি। বয়স ৭৭, নাম রবিউল আলম। ভোট দিতে এসেছেন, কিন্তু তার চোখেমুখে ছিল শুধুই দায়িত্ববোধ নয়, এক ধরনের নিঃশব্দ আবেগও।
কেন্দ্রের বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভোটারদের কৌতূহলী দৃষ্টি তখন তার দিকেই। কেউ জায়গা করে দিচ্ছেন, কেউ খোঁজ নিচ্ছেন শরীরের। রবিউল আলম হালকা হাসি দিয়ে সবার শুভেচ্ছা নিচ্ছিলেন। যেন একটি সাধারণ ভোটদানের মুহূর্ত ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছিল একটি গল্পে।
বিজ্ঞাপন
হয়তো এটাই জীবনের শেষ ভোট
ভোটকক্ষে ঢোকার আগে কথোপকথনে নিজের অনুভূতির কথা বলেন রবিউল আলম। শান্ত গলায় বলেন, জীবনে কতবার ভোট দিলাম, হিসাব নেই। কিন্তু এবার আসতে আসতে মনে হচ্ছিল, হয়তো এটাই শেষ ভোট।
তার কথায় নাটকীয়তা ছিল না, ছিল বাস্তবতার ছাপ। বয়সের ভার, শরীরের সীমাবদ্ধতা আর সময়ের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এক গভীর উপলব্ধি।
তিনি জানান, আগের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতায় ভুগছিলেন। হাঁটাচলায় কষ্ট, চিকিৎসকের পরামর্শ—সব মিলিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসা সম্ভব হয়নি। সেই অপূর্ণতা থেকেই এবারের দৃঢ় সিদ্ধান্ত। গতবার খুব খারাপ লেগেছিল। ভোটের দিন বাসায় বসে ছিলাম। মনে হচ্ছিল একটা দায়িত্ব পালন করতে পারলাম না।
বিজ্ঞাপন
নাতির চোখে প্রথম ভোটের শিক্ষা
রবিউল আলমের পাশে থাকা কিশোর নাতির চোখে ছিল গর্বের ঝিলিক। দাদুর হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিল সে। দাদুর সঙ্গে কেন এসেছে জানতে চাইলে লাজুক হাসি দিয়ে বলে, দাদুকে একা ছাড়িনি। আর উনিই বলেছেন, ভোট দেওয়া দেখতে হবে।
রবিউল আলম বলেন, নতুন প্রজন্মের জন্য ভোট কেবল একটি দিন নয়, একটি শিক্ষা। ওরা বইয়ে গণতন্ত্র পড়ে। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে এসে সেটা দেখা আলাদা ব্যাপার। আমি চাই ওরা বুঝুক—ভোট দেওয়া মানে দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক তৈরি করা।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ‘শান্তির ভোট’
কেন্দ্রের পরিবেশ দেখে সন্তুষ্ট রবিউল আলম। নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি তার মনে স্বস্তি দিয়েছে। তিনি বলেন, অনেক নির্বাচন দেখেছি। উত্তেজনা দেখেছি, ভয় দেখেছি। আজকে এসে শান্তি লাগছে। মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিচ্ছে—এইটা বড় কথা।
ভোট দিয়ে বের হওয়ার পর তার কণ্ঠে ছিল তৃপ্তির সুর। আঙুলে কালি, মুখে প্রশান্তি। তবু কথার মাঝেই হালকা বিষণ্নতার ছোঁয়া। তিনি বলেন, আল্লাহ হায়াতে বাঁচিয়ে রাখলে পাঁচ বছর পর আবার ভোট দেব। সেই পর্যন্ত যদি বেঁচে থাকি, শরীরের যে অবস্থা। বাকিটা শেষ না করেই চুপ হয়ে যান।
কেন্দ্রজুড়ে প্রবীণ ভোটারদের উপস্থিতি
এই কেন্দ্রেই দেখা গেছে আরও অনেক প্রবীণ ভোটারকে। কেউ লাঠিতে ভর দিয়ে এসেছেন, কেউ ছেলের কাঁধে হাত রেখে। বয়স যেন তাদের থামাতে পারেনি।
কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানান, সকাল থেকেই বিভিন্ন বয়সি ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। প্রবীণ ভোটারদের জন্য আলাদা সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
একজন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা বলেন, বয়স্ক ভোটাররা এলে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। তাদের বসার ব্যবস্থা, দ্রুত ভোট দেওয়ার সুবিধা—সবকিছু দেখছি।
ভোট শুধু সংখ্যা নয়, অনুভূতিও
ঢাকা-৫ আসনে মোট ভোটার ৪,১৯,৯৯৬ জন। সংখ্যার হিসেবে তারা পরিসংখ্যানের অংশ, কিন্তু প্রতিটি ভোটের পেছনে রয়েছে আলাদা গল্প, আলাদা অভিজ্ঞতা।
রবিউল আলমের মতো একজন প্রবীণ ভোটারের কাছে ভোট ছিল জীবনের ধারাবাহিকতার অংশ। তার কথায় স্পষ্ট, ভোট দেওয়া তার কাছে রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, নাগরিক অস্তিত্বের প্রকাশ। ভোট মানে আমি আছি, আমার মত আছে—এইটা বলা, ধীরে ধীরে বলেন তিনি।
ভোটকেন্দ্র থেকে বের হয়ে নাতির হাত ধরে বাড়ির পথে হাঁটছিলেন রবিউল আলম। ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিলেন ধীরে ধীরে। কিন্তু তার বলা কয়েকটি বাক্য যেন কেন্দ্রের বাতাসে থেকে যাচ্ছিল।
হয়তো সত্যিই এটি তার শেষ ভোট, হয়তো নয়। কিন্তু তার উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র কেবল তরুণদের উদ্দীপনায় নয়, প্রবীণদের স্থির বিশ্বাসেও বেঁচে থাকে। রবিউল আলমের শেষ মন্তব্যটি ছিল খুব সাধারণ, তবু গভীর—শরীর যতদিন সায় দেবে, ভোট দিয়ে যাব।
এমআর/এএইচ









































































































































































































