শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ইরানে মার্কিন হামলায় নিহত ৮, প্রস্তুত ৫০ হাজার মার্কিন সেনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১০:০৯ এএম

শেয়ার করুন:

ইরানে মার্কিন হামলায় নিহত ৮ প্রস্তুত ৫০ হাজার মার্কিন সেনা

যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল রূপ ধারণ করছে মধ্যপ্রাচ্যে। টানা সপ্তম রাতের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাণঘাতী হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় কমপক্ষে আটজন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। পাল্টা জবাবে ইরানও কুয়েত ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা করেছে।

ইরানি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল দক্ষিণাঞ্চলের জাস্ক, সিরিক, বুশেহর ও বন্দর আব্বাস শহর। এ ছাড়া কেশম দ্বীপ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আহভাজ এবং মধ্যাঞ্চলের ইয়াজদ শহরেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
 
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হরমোজগান প্রদেশে চালানো হামলায় অন্তত তিনজন নিহত এবং আরও আটজন আহত হয়েছেন। প্রদেশটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটা হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ ও তথ্যকেন্দ্রের প্রধান হোসেইন কেরমানপুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জানান, চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় শুরু করা হামলায় এখন পর্যন্ত মোট ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৪০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

কেরমানপুরের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে তিনজন নারী এবং ১৮ বছরের কম বয়সি একজন কিশোর রয়েছেন। আহতদের মধ্যে ২২ জন নারী ও নয়জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। বর্তমানে ৪৭ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলেও জানান তিনি।

হামলার পর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে নিহতদের পরিচয় বা ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করেনি ইরানি কর্তৃপক্ষ।

শনিবার (১৮ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর টানা সপ্তম রাতের মতো হামলা সম্পন্ন করেছে। এই হামলায় যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করা হয়েছে।

সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের নজরদারি কেন্দ্র, সামরিক লজিস্টিক অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার এবং সামুদ্রিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে এসব হামলা চালানো হয়। ১৭ জুলাই পূর্বাঞ্চলীয় সময় রাত সাড়ে ৯টায় (জিএমটি ১৮ জুলাই রাত ১টা ৩০ মিনিট, বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৭টা) এই হামলা শেষ হয়।

মার্কিন কমান্ডের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশনায় সেন্টকম ইরানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনছে। একই সঙ্গে ইরানি বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর করা হচ্ছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ৫০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘সর্বাধিনায়কের (প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প) নির্দেশে সেন্টকম ইরানকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর রেখেছে।’

সেন্টকমের দাবি, এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং আঞ্চলিক নৌ চলাচলের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত অবকাঠামো ধ্বংস করা।

হরমোজগানে সতর্কতা

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের স্থানীয় কর্মকর্তারা নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ফের হামলার আশঙ্কায় এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতির পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য বিকল্প পথ তৈরির কাজ চলছে। গত দুই রাতে মার্কিন হামলায় হরমোজগানের বেশ কয়েকটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শনিবার ভোরে চালানো সর্বশেষ হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

বাহরাইনে বাজছে বিমান হামলার সাইরেন

উপসাগরীয় দেশ বাহরাইনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো বিমান হামলার সাইরেন বেজে উঠেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় এই সতর্কবার্তা জারি করা হয়। সাইরেন বাজার পরপরই স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য জরুরি নির্দেশ দিয়েছে। পুরো এলাকায় এখন বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক।

কুয়েত ও জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলা

পাল্টা আঘাত হিসেবে ইরানের সামরিক বাহিনী কুয়েত এবং জর্ডানে থাকা বেশ কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি এই খবর নিশ্চিত করেছে। ইরানি সামরিক বাহিনীর বিবৃতি অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট কিছু মার্কিন অবকাঠামো লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়।

ইরানে হামলার শিকার হওয়া স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে কুয়েতের ক্যাম্প উদাইরি। সেখানকার একটি বড় গোলাবারুদ ডিপো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া কুয়েতের আলী আল সালেম ঘাঁটির সদর দফতর, গোলাবারুদ ডিপো এবং সংযোগকারী সেতুগুলোতে আঘাত করা হয়েছে।

পাশাপাশি জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বা আল আজরাক বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর জ্বালানি ট্যাংকে সফল ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। ইরানি সামরিক বাহিনী কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যারা ইরানের ইচ্ছা ও শক্তি পরীক্ষা করতে আসবে, তাদের সশস্ত্র বাহিনীর লৌহকঠিন সংকল্প ও প্রস্তুতির মুখোমুখি হতে হবে।

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আরও দুই থেকে তিন দিন হামলা চালিয়ে গেলে ‘পূর্ণমাত্রার আক্রমণাত্মক পর্যায়ে’ প্রবেশ করবে ইরান। তখন শুধু পাল্টা হামলাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না তেহরান। আক্রমণ থেকে তখন কোনো রাজনৈতিক সীমান্তই নিরাপদ থাকবে না।
 
ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
 
জাতিসংঘের ভাষ্য, এই সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই; সংলাপ ও কূটনীতিই একমাত্র পথ। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও যুদ্ধবিরতি পুনর্বহাল এবং আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, যুদ্ধবিরতি বজায় থাকলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সূত্র: আল জাজিরা

এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর