যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর অনেকের মনেই প্রশ্ন ছিল, তার প্রভাবশালী ছেলে মোজতবা খামেনিই কি পিতার উত্তরসূরি হবেন। এ নিয়ে বেশ কয়েক দিন ধরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সেই মোজতবা খামেনিকেই দেশের নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে নির্বাচিত করেছে ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবর অনুসারে, রোববার ৮৮ সদস্যের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস (ধর্মীয় নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত সংস্থা) ভোটের মাধ্যমে ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনিকে নির্বাচিত করে। এর ফলে তিনি ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের পর তৃতীয় সুপ্রিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। দেশটির প্রথম সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন- আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি (১৯৭৯-১৯৮৯), দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা সদ্য প্রয়াত আয়াতুল্লা আলী খামেনি (১৯৮৯-২০২৬)।
বিজ্ঞাপন
এদিকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে যতটা প্রকাশ্যে দেখা গেছে তার বিপরীতে মোজতবা সাধারণত আড়ালে থেকেছেন। তিনি কখনো কোনো সরকারি পদে ছিলেন না। জনসমক্ষে বক্তৃতা বা সাক্ষাৎকারও দেননি, এবং তার খুব সীমিত সংখ্যক ছবি ও ভিডিও প্রকাশ হয়েছে। তবে বহুদিন ধরেই গুজব রয়েছে যে, তার বাবার কাছে যাওয়ার ‘গেটকিপার’ বা রক্ষক হিসেবে তার প্রভাব ছিল।
বার্তা সংস্থা এপি (অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস) জানিয়েছে, ২০০০ দশকের শেষ দিকে উইকিলিকসে প্রকাশিত মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় তাকে ‘আড়ালের শক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
সেখানে বলা হয়, শাসনব্যবস্থার ভেতরে তাকে ব্যাপকভাবে একজন 'দক্ষ ও শক্তিশালী নেতা' হিসেবে দেখা হতো। তবে মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হলে তা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হতে পারে।
১৯৭৯ সালে রাজতন্ত্র উৎখাতের পর যে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার নীতি ও আদর্শ অনুযায়ী, ধর্মীয় মর্যাদা ও প্রমাণিত নেতৃত্বের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ নেতা নির্ধারণ করা উচিত, পারিবারিক উত্তরাধিকার হিসেবে নয়।
বিজ্ঞাপন
আলী খামেনি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে কেবল সাধারণ ভাষায় কথা বলেছেন।
দুই বছর আগে বিশেষজ্ঞ পরিষদের এক সদস্য বলেছিলেন, আলী খামেনি ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রার্থী হিসেবে মোজতবার নামের বিরোধিতা করেছিলেন। তবে তিনি কখনো প্রকাশ্যে এ ধরনের ধারণা নিয়ে কথা বলেননি।
মোজতবা খামেনি কে?
১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন মোজতবা। তিনি খামেনির ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। তেহরানের ধর্মীয় আলাভি স্কুলে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন।
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ বছর বয়সে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য বেশ কয়েকবার সেনাবাহিনীতে কাজ করেছিলেন। আট বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ইরানের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি সন্দেহ আরও বেড়ে যায়, কারণ তারা ইরাককে সমর্থন করেছিল।
১৯৯৯ সালে তিনি ধর্মীয় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পবিত্র শহর কোমে যান, যা শিয়া ধর্মতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এর আগ পর্যন্ত তিনি ধর্মীয় পোশাক পরতেন না। কেন তিনি ৩০ বছর বয়সে মাদরাসায় পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তা স্পষ্ট নয়, কারণ সাধারণত কম বয়সেই এ ধরনের শিক্ষা শুরু করা হয়।
মোজতবা এখনো মধ্যম পর্যায়ের এক ধর্মীয় আলেম। ফলে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পথে এটি একটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
২০২৪ সালে তেহরানে হেজবুল্লাহর অফিস পরিদর্শনের সময় কালো পাগড়ি এবং চশমা পরা মোজতবা খামেনির ছবি তোলা হয়েছে।ছবির উৎস, West Asia News Agency Via Reuters
তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি কিছু সংবাদমাধ্যম ও কর্মকর্তারা তাকে ‘আয়াতোল্লাহ’ হিসেবে উল্লেখ করতে শুরু করেছেন, যা একেবারে উচ্চ পর্যায়ের ধর্মীয় উপাধি।
কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, এটি তার ধর্মীয় মর্যাদা বাড়িয়ে তাকে দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য আস্থাভাজন প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা হতে পারে।
মাদরাসা বা ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় 'আয়াতোল্লাহ' পদমর্যাদা অর্জন এবং উচ্চতর শ্রেণীতে পড়ানো, একজন ব্যক্তির জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের সূচক হিসেবে ধরা হয়। ভবিষ্যৎ নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
এর আগে এমন নজির রয়েছে। ১৯৮৯ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর আলী খামেনিকে দ্রুত ‘আয়াতুল্লাহ’ পদে উন্নীত করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ
২০০৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় প্রথমবারের মতো মোজতবার নাম জনসমক্ষে আলোচনায় আসে। সেই নির্বাচনে জয়ী হন জনপ্রিয়তাবাদী কট্টরপন্থি নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ।
খামেনিকে লেখা এক খোলা চিঠিতে সংস্কারপন্থি প্রার্থী মেহদি কারুবি অভিযোগ করেন, আইআরজিসি ও বাসিজ মিলিশিয়ার কিছু সদস্যের মাধ্যমে মোজতবা ভোটে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। তাদের মাধ্যমে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অর্থ বিতরণ করা হয়েছিল, যাতে আহমাদিনেজাদ জয়ী হয় বলে অভিযোগ করেছিলেন তিনি।
চার বছর পর আবার মোজতবার বিরুদ্ধে একই অভিযোগ ওঠে।

২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, যা ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত। বাবার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হতে পারেন মোজতবা- এমন ধারণার বিরোধিতা করে স্লোগানও দিয়েছিলেন কিছু বিক্ষোভকারী।
তৎকালীন উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তফা তাজ্জেদেহ ফলাফলকে ‘নির্বাচনি ক্যু’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি সাত বছর কারাবন্দি ছিলেন এবং এর জন্য তিনি ‘মোজতবা খামেনির সরাসরি ইচ্ছাকে’ দায়ী করেন।
২০০৯ সালের নির্বাচনের পর দুই সংস্কারপন্থি প্রার্থী মীর-হোসেইন মুসাভি এবং মেহেদী কারুবিকে গৃহবন্দি করা হয়। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুসাভির সঙ্গে দেখা করে তাকে বিক্ষোভ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন মোজতবা, এমনটা ইরানি সূত্র বিবিসি নিউজ ফার্সিকে জানায়।
সামনে যত চ্যালেঞ্জ
এদিকে মোজতবা খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হওয়ায় ‘খুশি নন’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ব্রায়ান কিলমিড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক বার্তায় এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় ব্রায়ান কিলমিড বলেছেন, তিনি হোয়াইট হাউসে যোগাযোগ করেছিলেন এবং তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি খুশি নই’।
এর আগে এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা যে-ই হোন— তাকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন নিতে হবে। নাহলে তিনি বেশিদিন টিকে থাকতে পারবেন না।
এছাড়াও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘আয়াতুল্লাহ খামেনি উত্তরসূরি যেই হবে তাকে নির্মূল করা হবে’।
অন্যদিকে মোজতবা খামেনিতেই সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করার মাধ্যমে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পিতা-পুত্রের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরকে চিহ্নিত করেছে, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর রাজতন্ত্র উল্টে দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অনেকে মনে করেন।
যুদ্ধের এই সংকটময় মুহূর্তে মোজতবা খামেনেইয়ের নেতৃত্ব ইরানের ভবিষ্যৎ ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার উপর গভীর প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ মোজতবা এখন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং আঞ্চলিক ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ (হিজবুল্লাহ, হুথি, হামাসসহ)-এর নেতৃত্বও পাবেন।
অনেকের ধারণা, মোজতবা তার বাবার কঠোর নীতিগুলোই অব্যাহত রাখবেন। কেউ কেউ এটাও মনে করেন যে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় যিনি তার বাবা, মা ও স্ত্রীকে হারিয়েছেন, তিনি পশ্চিমা চাপের কাছে সহজে নতি স্বীকার করবেন না।
তবে তাকে কঠিন এক দায়িত্বের মুখোমুখি হতে হবে। জনগণকে তার বোঝাতে হবে যে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে বের করে আনার জন্য তিনিই সঠিক ব্যক্তি। তার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা এখনো সেভাবে প্রমাণিত না।
সূত্র: বিবিসি
এমএইচআর



























































































































































































































