ইরানে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্থির হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ১২ দশমিক ৭৭ ডলার বা ১৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ দশমিক ৪৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড ফিউচারসের দাম ১২ দশমিক ৬৬ ডলার বা ১৪ শতাংশ বেড়ে ১০৩ দশমিক ৫৬ ডলারে পৌঁছেছে। যদিও আগের সেশনে এক পর্যায়ে ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ দশমিক ৫০ ডলার এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ১১৯ দশমিক ৪৮ ডলারে উঠেছিল, পরে দাম কিছুটা কমে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬৬ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মূলত, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, ইরাক, আরব আমিরাত এবং কুয়েত উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়াও ইরান বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহনের সমুদ্র পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, যা তেলের বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
তিনটি শিল্প সূত্র জানিয়েছে, সপ্তাহের শুরুতেই ইরাক তার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রধান তেলক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন ৭০ শতাংশ কমিয়ে প্রতিদিন ১.৩ মিলিয়ন ব্যারেল করেছে, অন্যদিকে কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন শনিবার থেকে উৎপাদন কমানো শুরু করেছে এবং ফোর্স ম্যাজেউর ঘোষণা করেছে। সর্বশেষ সোমবার সৌদি আরবও তেল উৎপাদন কমানো শুরু করেছে।
অন্যদিকে এই অঞ্চলের দেশগুলোর বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনাও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতের জ্বালানি স্থাপনায় একাধিক হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এছাড়াও যুদ্ধ শুরুর পর গত শনিবার প্রথমবারের মতো ইসরায়েল ইরানের তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় তেহরান ও আলবোরজ প্রদেশে চারটি তেল সংরক্ষণাগার ও একটি তেল পরিবহন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এরই প্রেক্ষিতে রোববার ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘এই খেলা’ চালিয়ে গেলে তারা গোটা অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করবে। এতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলেও সতর্ক করেছে তারা।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসিয়ের একজন মুখপাত্র (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের জ্বালানি স্থাপনা, জ্বালানি সুবিধা এবং বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, আইআরজিসি এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো অনুরূপ পদক্ষেপ থেকে বিরত রয়েছে।
মুখপাত্র আরও বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই হামলা বন্ধ করার জন্য চাপ দিতে হবে। অন্যথায়, অঞ্চলজুড়ে ‘অনুরূপ পদক্ষেপ’ নেওয়া হবে। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘যদি তোমরা প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ২০০ ডলারের বেশি সহ্য করতে পারো, তাহলে এই খেলা চালিয়ে যাও।
আইএমএফ’র হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম যদি স্থায়ীভাবে ১০ শতাংশ বাড়ে, তাহলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ০ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমতে পারে ০ দশমিক ১৫ শতাংশ।
গত শুক্রবার ফাইন্যানশিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল কাবি সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শিগগিরই উপসাগরীয় অঞ্চলের সব উৎপাদক দেশ উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারেও পৌঁছাতে পারে।
আর রয়টার্স বলছে, চলমান সংঘাত দ্রুত শেষ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং জাহাজ চলাচলের ঝুঁকির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে থাকতে পারে।
উল্লেখ্য, লন্ডন ভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আর্থিক বাজার অবকাঠামো এবং তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এলএসইজির ১৯৮০ সাল পরবর্তী তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে তেলের দাম সর্বোচ্চ ব্যারেলপ্রতি ১৪৭ ডলারে উঠেছিল। আর ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ওই বছরের ৭-৮ মার্চের দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১৩৯ ডলারে পৌঁছেছিল।
সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা
এমএইচআর

















































































































































































































































