সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

ইরানে হামলার পর অস্থির বাজার, কোথায় গিয়ে ঠেকবে তেলের দাম!

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২ মার্চ ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম

শেয়ার করুন:

Oil
ছবি- ঢাকা মেইল

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে গত তিন দিন ধরে অনবরত হামলা চালাচ্ছে দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কির ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরানও। 

এছাড়াও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীর কাছে কমপক্ষে তিনটি তেলবাহী জাহাজেও হামলা চালিয়েছে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর দেশ। 


বিজ্ঞাপন


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের এই সংঘাতের জেরে অস্থির তেলের বাজার। বিশ্বব্যাপী এরইমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম। কোথায় গিয়ে ঠেকবে এই মূল্যবৃদ্ধি? এই প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলছে সারা বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য সংশ্লিষ্টদের।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের অন্যতম মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সোমবার (২ মার্চ) প্রতি ব্যারেলে আগের চেয়ে দশ শতাংশ বেড়ে ৮২ মার্কিন ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালীকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সারা বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল-গ্যাস ওই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।


বিজ্ঞাপন


কিন্তু ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। দেশটির দক্ষিণে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ ওই জলপথ দিয়ে নৌ-যান চলাচল না করার জন্য সতর্ক করেছে তেহরান। এতে ওই প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে তেলের বাজারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।

1
ইরানের একটি স্কুলে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় শতাধিক বাচ্চা নিহত হয়। ছবি- সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় তেলবাহী দুটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া আরেকটি জাহাজের ‘খুব কাছাকাছি’ জায়গায় বিস্ফোরণ হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ ঘটনার পর ব্রেন্টের অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে ৮২ ডলারের ওপরে উঠে যায়। যদিও পরে সেটি কিছুটা কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেলের দাম প্রায় সাত দশমিক ছয় শতাংশ বেড়ে ৭২ দশমিক ২০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

সিডনিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমএসটি মার্কির জ্বালানি গবেষণা বিভাগের প্রধান শৌল কাভোনিক গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বাজার এখনো অস্থির হয়ে ওঠেনি। বরং স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত তেল পরিবহন ও উৎপাদন অবকাঠামো কোনো পক্ষেরই হামলার প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু নয়।

তবে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি। ফলে সেটির ওপরেও তেলের দরে উত্থান-পতন অনেকাংশে নির্ভর করবে বলে জানান এমএসটি মার্কির এই বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ‘জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণগুলো দেখা যেতে শুরু করলে তেলের দাম আবারও কমে আসবে।’

তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ ইঙ্গিত দিয়েছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম একশ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর বাস্তবে তেমনটি ঘটলে মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হারের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দুবাইভিত্তিক জ্বালানি পরামর্শ প্রতিষ্ঠান কামার এনার্জির বর্তমান প্রধান নির্বাহী রবিন মিলস বলেন, ‘তেল ব্যবসায়ীরা এই খবরটির দিকে দৃষ্টি রাখছেন। ফলে তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।’ তবে তেলের বাজার এখনো ‘আতঙ্কিত হওয়ার মতো’ সংকটে পড়েনি বলে জানান তিনি।

রবিন মিলস আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে তেলের যে দাম দেখা যাচ্ছে, সেটি খুব বেশি নয়। এমনকি দুই বছর আগের দামের চেয়েও কম বলা চলে। ফলে আমরা এখনো পুরোপুরি তেল সংকটের মধ্যে নেই।’

এদিকে তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে রোববার (১ মার্চ) জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেক প্লাসের সদস্যরা তাদের তেলের উৎপাদন আগের চেয়ে বাড়িয়ে প্রতিদিন দুই লাখ ছয় হাজার ব্যারেল করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এতে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা যাবে বলে আশা করছেন তারা। যদিও এই কৌশলটি কতটা কাজে দেবে, সেটি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ সন্দেহ পোষণ করছেন।

যুক্তরাজ্যের অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএ) প্রেসিডেন্ট এডমন্ড কিং সতর্ক করে বলেন, ‘চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে পেট্রোলের দাম বেড়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে অস্থিরতা এবং বোমা হামলার ঘটনা দেখা যাচ্ছে, সেটি নিশ্চিতভাবেই সারা বিশ্বের তেল বিতরণ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করার জন্য অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম অনিবার্যভাবে বেড়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তেলের দাম কতটুকু বৃদ্ধি পাবে এবং সেটি কতদিন স্থায়ী হবে- তা নির্ভর করছে সংঘাত কতদিন চলবে, তার ওপর।’

অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘদিন সময় ধরে বাড়তে থাকলে সেটি কৃষি, শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে জানাচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।

2
সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটিতে বিমান ড্রোন হামলা চালায় ইরান। ছবি- সংগৃহীত

সারাসিন অ্যান্ড পার্টনার্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ সুবিথা সুব্রামানিয়াম বলেন, ‘যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকে, তাহলে সেটি খাদ্য, কৃষি ও শিল্প পণ্যের মতো অন্যান্য অনেক পণ্যের দামের সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করবে। প্রকৃতপক্ষে এটি মুদ্রাস্ফীতিতে পরিণত হবে।’ 

যুক্তরাজ্যে মুদ্রাস্ফীতির গতি আগের চেয়ে অনেকটাই কমে এসেছে। সেই কারণে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও সুদের হার কমাতে শুরু করেছে। সুদের এই হার আগামীতে আরও কমানো হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদ সুব্রামানিয়াম মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইঙ্গিতের পরও যুক্তরাজ্যে ব্যাংক সুদের হার আপাতত তিন দশমিক ৭৫ শতাংশে আটকে থাকতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা যতটুকু জানতে পারছি, তাতে এই সংঘাত আগামী এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে। তেলের বাজারের পাশাপাশি জাহাজ চলাচলের ওপর এটি দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সেটি বলা যাচ্ছে না।’

রোববার (১ মার্চ) ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পুড়ে গেছে। তবে যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি।

ইউকেএমটিও জানিয়েছে, আরব এবং ওমান উপসাগর এলাকাজুড়ে একাধিক হামলার খবর পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় জাহাজগুলোকে সাবধানতার সঙ্গে চলাচল করার পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

জাহাজের অবস্থান ট্র্যাকিংয়ের প্ল্যাটফর্ম কেপলারের তথ্যমতে, ইরানে হামলার জেরে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-যান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় অনেক জাহাজ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালীর ওপারে উপসাগরীয় জলসীমায় কমপক্ষে ১৫০টি ট্যাংকার নোঙর ফেলেছে বলে জানিয়েছে কেপলার।

কেপলারের কর্মকর্তা হুমায়ুন ফালাকশাহি বলেন, ‘ইরানের হুমকির কারণে প্রণালীটিতে নৌ-যান চলাচল রীতিমত স্থবির হয়ে পড়েছে। জাহাজগুলো ওই প্রণালী দিয়ে প্রবেশ না করার বিষয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। কারণ সেখানে ঝুঁকি অনেক বেশি এবং তাদের বিমা খরচও বেড়ে গেছে।’

তিনি এও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন হয়তো জাহাজ চলাচলের রুটগুলোকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করবে। সেটি করা সম্ভব হলে তেলের দাম বৃদ্ধি রোধ করা যাবে। তেমনটি যদি না ঘটে, যদি হরমুজ প্রণালীর দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকে, তবে তেলের দাম বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএইচ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর