সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ: কারা ছিলেন তারা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২ মার্চ ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম

শেয়ার করুন:

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ: কারা ছিলেন তারা

শনিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতা নিহত হয়েছেন। রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’ (IRNA) ৮৬ বছর বয়সী খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। এই হামলায় খামেনির মেয়ে, জামাতা এবং নাতিও নিহত হয়েছেন।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান খামেনির এই হত্যাকাণ্ডকে ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রকাশ্য ঘোষণা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরান শাসন করা এই নেতার মৃত্যুতে শোকবার্তায় পেজেশকিয়ান বলেন, ‘এই বিয়োগান্তক ঘটনাটি বর্তমান ইসলামি বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।’


বিজ্ঞাপন


ইরনা (IRNA) খামেনি ছাড়াও আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। তারা হলেন—

আলি শামখানি

আলি শামখানি ছিলেন ইরানের নবগঠিত ‘প্রতিরক্ষা কাউন্সিল’-এর সচিব এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা। ৭০ বছর বয়সী এই ঝানু রাজনীতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্ব ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনার তদারকি করতেন। উল্লেখ্য, এই আলোচনার সর্বশেষ দফার বৈঠকটি মাত্র গত শুক্রবার শেষ হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবারও তিনি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। শামখানি বলেছিলেন, ‘যদি আলোচনার মূল লক্ষ্য এটিই হয় যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, তবে এটি আমাদের সর্বোচ্চ নেতার ধর্মীয় ফতোয়া এবং দেশের প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ; এমতাবস্থায় দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছানো অবশ্যই সম্ভব।’


বিজ্ঞাপন


AS
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রাক্তন সচিব আলি শামখানি / ফাইল ছবি

২০২৫ সালের জুন মাসে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলা ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও শামখানি ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন। সে সময় তার বাড়িতে চালানো হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে পরবর্তীতে জানা যায়, তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন। নিজের বিধ্বস্ত বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়েছিল, যদিও সে সময় তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন।

২০২৫ সালের সেই যুদ্ধের পর ইরানের প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা নীতিগুলো সমন্বয় এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় সম্পদ সমাবেশের লক্ষ্যে ‘প্রতিরক্ষা কাউন্সিল’ গঠন করা হয়। শামখানি সম্প্রতি এই গুরুত্বপূর্ণ কাউন্সিলের সচিব হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
 
এর আগে তিনি টানা এক দশক (২০২৩ সাল পর্যন্ত) ইরানের ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’ (SNSC)-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘসময় নিরাপত্তা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের তালিকায় তার অবস্থান দ্বিতীয় (প্রথম অবস্থানে রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি, যিনি প্রায় ১৬ বছর এই দায়িত্বে ছিলেন)।

আবদুর রহিম মুসাভি

আবদুর রহিম মুসাভি ছিলেন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ। গত বছর জুনে ইরানের ওপর ইসরায়েলের হামলার মাত্র কয়েকদিন পরেই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এর আগে তিনি ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ইরানের সেনাবাহিনীর (Army) প্রধান কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জেনারেল মুসাভিকে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, উন্নত ড্রোন সিস্টেম এবং মহাকাশ গবেষণার (যা পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল) অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ও কারিগর মনে করা হয়। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৩ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়া যৌথভাবে মুসাভির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ ছিল ইরানে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ।

I2
তেহরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলাকালে জনতার উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন মেজর জেনারেল আবদুর রহিম মুসাভি / ফাইল ছবি

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের (US Department of State) একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৯ সালের নভেম্বরে মুসাভির কমান্ডে থাকা ইরানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের ওপর মেশিনগান থেকে গুলি চালিয়েছিল। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ধুঁকতে থাকা ইরানের অর্থনীতি সচল করতে কর্তৃপক্ষ আকস্মিকভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়। এর প্রতিবাদে পুরো ইরানজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, যা দমনে মুসাভির নেতৃত্বাধীন বাহিনী কঠোর অবস্থান নিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

আজিজ নাসিরজাদেহ

আজিজ নাসিরজাদেহ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর এই সরকার ক্ষমতায় আসে। এর আগে তিনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এবং ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইরানীয় বিমান বাহিনীর (Air Force) কমান্ডার হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার মুখে ইরানের সামরিক, বিশেষ করে পারমাণবিক অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে নাসিরজাদেহ মূল কারিগরের ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমেই ইরানের স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হতো।

২০২৫ সালের জুন মাসে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে হামলার হুমকি দিচ্ছিল, তখন নাসিরজাদেহ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রথম হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা সকল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। সে সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘যদি আমাদের ওপর কোনো যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়... তবে এই অঞ্চলের সকল মার্কিন ঘাঁটি আমাদের নাগালের মধ্যেই রয়েছে এবং আমরা সাহসের সাথে সেসব দেশে থাকা ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানব।’

২০২৫ সালের জুনে হওয়া হামলার পরও একবার খবর ছড়িয়েছিল যে নাসিরজাদেহ নিহত হয়েছেন। তবে পরবর্তীকালে স্থানীয় সাংবাদিকরা নিশ্চিত করেছিলেন যে তিনি জীবিত এবং সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছেন।

AN
ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদেহ / ফাইল ছবি

নাসিরজাদেহ গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের চরম সমালোচক ছিলেন। ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলি অভিযান এবং দক্ষিণ লেবাননে হামলার সময় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘প্রতিরোধ যোদ্ধারা ইসরায়েলকে ঠিক সেভাবেই পরাজিত করবে যেভাবে ২০০৬ সালে করেছিল।’ এখানে তিনি ২০০৬ সালের সেই ৩৪ দিনের যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছিলেন, যেখানে ইসরায়েল লেবাননের হিজবুল্লাহর প্রভাব পুরোপুরি নির্মূল করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

মোহাম্মদ পাকপুর

আইআরজিসি’র অভিজ্ঞ সমরনায়ক ও শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে তার মৃত্যু পর্যন্ত ইরানের অভিজাত বাহিনী ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর’ (আইআরজিসি) এর প্রধান কমান্ডার (কমান্ডার-ইন-চিফ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

গত বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেন। পাকপুর ছিলেন এই বাহিনীর একজন প্রবীণ ও অত্যন্ত অভিজ্ঞ কমান্ডার, যিনি তার পুরো সামরিক ক্যারিয়ার এই অভিজাত বাহিনীর ভেতরেই গড়ে তুলেছেন। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি প্রথমে আইআরজিসি’র সাঁজোয়া ইউনিট (Armoured Unit) এবং পরবর্তীতে একটি আস্ত কমব্যাট ডিভিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

MP
তেহরানে একটি সামরিক কুচকাওয়াজে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর / ফাইল ছবি

আইআরজিসি’র প্রধান কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার আগে পাকপুর দীর্ঘ ১৬ বছর এই বাহিনীর পদাতিক শাখা বা ‘গ্রাউন্ড ফোর্সেস’-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি আইআরজিসি’র অপারেশনাল ডেপুটি (ডেপুটি ফর অপারেশনস) হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং এই বাহিনীর দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হেডকোয়ার্টার বা সদর দফতরের প্রধান ছিলেন।

মোহাম্মদ পাকপুরের মৃত্যু আইআরজিসি’র জন্য এক বিশাল ক্ষতি, কারণ তিনি ছিলেন মাঠ পর্যায়ের যুদ্ধ এবং কৌশলগত পরিকল্পনা— উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষ একজন নেতা। তার হাত ধরেই ইরানের পদাতিক বাহিনী আধুনিক রূপ পেয়েছিল।

পরবর্তী উত্তরসূরি কে হচ্ছেন?

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্যমতে, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অস্থায়ীভাবে একটি তিন সদস্যের কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এই কাউন্সিলে রয়েছেন— ১. প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, ২. প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেই এবং ৩. অভিভাবক পরিষদের (Guardian Council) একজন প্রতিনিধি।

অভিভাবক পরিষদের ধর্মীয় নেতা আলীরেজা আরাফি-কে নেতৃত্ব পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।

তেহরান থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক মাজিয়ার মোতামেদি জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আইআরজিসি এবং নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করবেন। আইআরজিসি’র পরবর্তী প্রধান হিসেবে খামেনির দুই মাস আগে নিয়োগ দেওয়া উপ-প্রধান আহমদ ওয়াহিদি’র নাম শোনা যাচ্ছে।

সূত্র: আল-জাজিরা

এফএ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর