বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও কাতারের গ্যাসবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে চীন।
আলোচনার সঙ্গে জড়িত কূটনৈতিক তিনটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ সাত দিনে গড়িয়েছে, এর মধ্যেই শত শত জাহাজ ওই প্রণালীর চারপাশে স্থবির হয়ে আছে—যা বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এ কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে।
সূত্রগুলো জানায়, ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল চীন এই পরিস্থিতিতে অসন্তুষ্ট। তাই বেইজিং তেহরানের ওপর চাপ দিচ্ছে যাতে অপরিশোধিত তেল ও কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন তাদের মোট তেল আমদানির প্রায় ৪৫ শতাংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পেয়ে থাকে।
জাহাজ-ট্র্যাকিং ডেটার উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ‘আয়রন মেইডেন; নামের একটি জাহাজ সংকেত পরিবর্তন করে চীনা মালিকানাধীন হিসেবে দেখানোর পর বৃহস্পতিবার রাতে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। তবে বৈশ্বিক বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে আরও অনেক জাহাজের চলাচল প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা ও হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী জাহাজে হামলা চালানোর কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে, এতে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতোমধ্যে ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

ভর্টেক্সা এবং জাহাজ ট্র্যাকার কেপ্লারের মতে, প্রণালীর ভেতরে প্রায় ৩০০টি তেল ট্যাংকার আটকে আছে। এছাড়া প্রণালীর বাইরে খোলা সাগরে আরও শতাধিক জাহাজ নোঙর করে অপেক্ষা করছে।
এদিকে দুবাইভিত্তিক আল খালিজ সুগারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল আল ঘুরাইর রয়টার্সকে জানিয়েছেন, কিছু চিনি বহনকারী জাহাজকে প্রণালী দিয়ে যেতে দেওয়া হলেও অন্যগুলোকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।
এর আগে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইউরোপ ও তাদের মিত্র দেশগুলোর জাহাজের জন্য বন্ধ থাকবে।
বৃহস্পতিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউচে প্রকাশিত এক বিবৃতি আইআরজিসি বলছে, আন্তর্জাতিক আইন ও বিধি অনুসারে, যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌ চলাচলের অধিকার ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং সকলকে অবশ্যই এই নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইউরোপীয় জোট এবং তাদের মিত্রদেগুলোর সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হবে না। যেকোনো মার্কিন, ইসরায়েলি বা ইউরোপীয় জাহাজ শনাক্ত করা হলে অবশ্যই আঘাত করা হবে।
সংস্থাটি আরও সতর্ক করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইউরোপ এবং তাদের সমর্থক দেশগুলোর কোনো জাহাজ ওই এলাকায় দেখা গেলে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের জ্বালানি বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রাণরেখা হিসেবে বিবেচিত। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি, যার এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান। ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার থেকে অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলো এই সরু পথ দিয়েই চলাচল করে।

বিশ্বের মোট তেল, কনডেনসেট ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৩০ শতাংশের বেশি এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ এই পথে চলাচল করে; ব্যস্ত সময়ে কখনও কখনও প্রতি ছয় মিনিট পরপর জাহাজ চলতে দেখা যায়। এ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা তেলের প্রায় ৮২ শতাংশ যায় এশিয়ায়, বাকি অংশ ইউরোপে। চীনের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ২৪ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়।
তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই হুমকি দিয়ে আসছিল, ইরান আক্রান্ত হলে এই নৌপথ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএইচআর

















































































































































































































































