২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ কেবল মাঠের ফুটবল লড়াই নয়, এটি বিশ্ব ফ্যাশনেরও অন্যতম বড় এক মঞ্চ। ইতোমধ্যেই উত্তর আমেরিকায় পা রেখেছে বিশ্বের ৪৮টি দেশ। আর মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই গ্যালারি এবং ড্রেসিংরুমে শুরু হয়ে গেছে রঙের উৎসব, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রদর্শনী আর ডিজাইনের সৃজনশীল ঝুঁকি নেওয়ার প্রতিযোগিতা।
বিশ্বকাপের জার্সি নিয়ে অনেক ধরনের র্যাঙ্কিং হলেও এবারের মূল্যায়নটি একটু ভিন্ন। এখানে কেবল একটি একক জার্সির ওপর ভিত্তি করে বিচার করা হয়নি। মূল শর্ত ছিল ‘ধারাবাহিকতা’- অর্থাৎ একটি দেশের হোম এবং অ্যাওয়ে দুটি জার্সিই সমান আকর্ষণীয় ও নান্দনিক হতে হবে। কোনো দেশের কেবল একটি জার্সি ভালো আর অন্যটি সাধারণ হলে, তারা এই তালিকায় জায়গা পায়নি। পুরো টুর্নামেন্টের সব দেশের জার্সি কালেকশন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পর বেছে নেওয়া সেরা ১০টি দেশের জার্সি বেছে নিয়েছে নিউ ইয়র্ক পোস্ট। চলুন দেখে নেওয়া যাক:
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন- দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনা ছেড়ে ব্রাজিলের সমর্থক হলেন তরুণ
১০. মরক্কো
মাঠের ফুটবলে মরক্কোর উত্থান যেমন এক রূপকথা, তাদের জার্সির গল্পটাও ঠিক তেমনই আকর্ষণীয়। ‘অ্যাটলাস লায়ন্স’রা তাদের ঐতিহ্যবাহী লাল-সবুজ পরিচয়কে অক্ষুণ্ণ রেখে দেশের অনন্য শৈল্পিক ঐতিহ্যকে জার্সিতে ফুটিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে তাদের অ্যাওয়ে জার্সিটি সবার নজর কেড়েছে, যেখানে মরক্কোর ঐতিহাসিক কারুশিল্প ও আলংকারিক শিল্পকলা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে জ্যামিতিক নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। খুব বেশি জমকালো না করেও এটিকে দারুণ মার্জিত রূপ দেওয়া হয়েছে।

৯. স্পেন
স্পেনের জার্সির মূল সাফল্য হলো এর সংযম ও আভিজাত্য। হোম জার্সিতে তাদের সিগনেচার লাল রঙের পাশাপাশি নেভি ব্লু শেড ফিরিয়ে আনা হয়েছে, যা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক নিখুঁত ভারসাম্য তৈরি করেছে। বুকের ওপর সূক্ষ্ম ডিটেইলিং জার্সির গভীরতা বাড়িয়েছে। তবে আসল চমক তাদের অ্যাওয়ে কিটে। ক্রিম রঙের জার্সি নিখুঁত করা বেশ কঠিন, কিন্তু স্পেনের এই হালকা ক্রিম রঙের সাথে মেরুন এবং গোল্ডেন রঙের মিশ্রণ তৈরি করেছে এক রাজকীয় আবহ, যা স্পেনের শিল্প ও সাহিত্যিক ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিজ্ঞাপন

৮. দক্ষিণ কোরিয়া
মিনিমালিস্ট বা সাধারণ ডিজাইনের ট্রেন্ড ভেঙে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের জার্সিতে রঙ এবং ব্যক্তিত্বের এক দারুণ উৎসব নিয়ে এসেছে। তাদের বেগুনি রঙের অ্যাওয়ে জার্সিটিতে ফুলের নকশার ছোঁয়া রয়েছে, যা কোরিয়ান সংস্কৃতিকে ধারণ করার পাশাপাশি বেশ সতেজ ও প্রাণবন্ত দেখায়। এমনকি জার্সির ‘গ্লো-ইন-দ্য-ডার্ক’ (অন্ধকারে জ্বলে ওঠা) ডিটেইলিংটিও কোনো সস্তা ট্রিক মনে না হয়ে বেশ উদ্ভাবনী লেগেছে।

৭. জাপান
জার্সি ডিজাইনে জাপান সবসময়ই ফুটবল বিশ্বে অন্যতম সেরা। তাদের হোম জার্সিতে চিরচেনা ‘সামুরাই ব্লু’র ওপর এমন এক সূক্ষ্ম ভিজ্যুয়াল টেক্সচার ব্যবহার করা হয়েছে, যা আকাশ ও সমুদ্রের মিলনস্থলকে ফুটিয়ে তোলে। আর তাদের অ্যাওয়ে জার্সিটি তৈরি হয়েছে এক মাস্টারস্ট্রোক আইডিয়া থেকে- ঐতিহ্যবাহী বেসবল ইউনিফর্ম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নরম অফ-হোয়াইট বেসের ওপর রঙিন স্ট্রাইপ দেওয়া হয়েছে। এটি একই সাথে নস্টালজিক এবং আধুনিক।

৬. মেক্সিকো
যেখানে বেশিরভাগ দেশ দুটি করে জার্সি পেয়েছে, সেখানে স্বাগতিক মেক্সিকো পেয়েছে তিনটি (হোম, অ্যাওয়ে এবং থার্ড কিট)। ফলে তাদের কালেকশনটি টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা ও গভীর। হোম জার্সিতে মেক্সিকোর সমৃদ্ধ আদিবাসী ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। অ্যাওয়ে কিটটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও সাধারণ, যা টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পরও ভক্তরা ফ্যাশন হিসেবে গায়ে জড়াবেন। আর তাদের কালো রঙের থার্ড কিটটি মেক্সিকোকে বাকিদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা স্তরে নিয়ে গেছে।

৫. ব্রাজিল
ফুটবল দুনিয়ায় ব্রাজিলের ‘হলুদ জার্সি’ মানেই এক রাজকীয় অনুভূতি। এবার হোম জার্সিতে বুননের মাধ্যমে কাপড়ের ভেতরেই ব্রাজিলের পতাকার জ্যামিতিক নকশার ছোঁয়া দেওয়া হয়েছে। তবে আসল সাহসিকতা দেখানো হয়েছে নীল ও কালো রঙের অ্যাওয়ে জার্সিতে, যা বিশ্বখ্যাত ‘জর্ডান ব্র্যান্ড’ এর সাথে যৌথভাবে তৈরি। অ্যামাজন রেইনফরেস্ট এবং সেখানকার রঙিন এক প্রাণীর গায়ের রঙ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি এই ডিজাইনটি বেশ সাহসী ও আকর্ষণীয়।

৪. যুক্তরাষ্ট্র
আমেরিকান ভক্তরা দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ ও বোরিং জার্সির অভিযোগ করে আসছিলেন, তবে এবার সেই আক্ষেপ ঘুচেছে। ঘরের মাঠে ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের পর এবারই প্রথম টুর্নামেন্ট ফিরছে, আর তাই স্পনসর নাইকি আমেরিকার হোম ও অ্যাওয়ে জার্সির এক দুর্দান্ত কম্বিনেশন তৈরি করেছে। হোম জার্সিতে ১৯৯৪ সালের দেশাত্মবোধক শক্তির আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে, যেখানে লাল ও সাদার তরঙ্গায়িত স্ট্রাইপ গতিশীলতা প্রকাশ করে। আর অ্যাওয়ে জার্সিতে রয়েছে নীল ব্যাকগ্রাউন্ডে তারার মেলা। তারা ও স্ট্রাইপের এই কম্বিনেশনটি এককথায় নিখুঁত আমেরিকান।

৩. আর্জেন্টিনা
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা এবার মাঠে নামবে চ্যাম্পিয়নদের মতোই জমকালো পোশাকে। আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী আকাশী-সাদা হোম জার্সি রি-ডিজাইন করার প্রয়োজন পড়ে না, কারণ এটি ফুটবলের অন্যতম পবিত্র প্রতিষ্ঠান। তবে এই কালেকশনকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে তাদের কালো রঙের অ্যাওয়ে জার্সিটি। বুয়েনস এইরেসের শৈল্পিক প্রভাব মিশ্রিত এই কালো কিটটি অত্যন্ত সাহসী, অভিব্যক্তিপূর্ণ এবং সম্পূর্ণ আলাদা। রক্ষণশীল ফুটবল ভক্তদের এটি পছন্দ না-ই হতে পারে, কিন্তু দুর্দান্ত ডিজাইন সবার নজর কাড়বেই।

২. উরুগুয়ে
উরুগুয়ের জার্সি কালেকশনে ফুটে উঠেছে এক প্রবল আত্মবিশ্বাস। তাদের হালকা নীল রঙের ক্লাসিক হোম জার্সি, সাথে চমৎকার কলার এবং নিখুঁত ফিনিশিং দেখে মনে হবে এটি কোনো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলেরই পোশাক হওয়া উচিত। অন্যদিকে তাদের অ্যাওয়ে জার্সিটি একাধারে উচ্চাভিলাষী এবং ইতিহাস-ভিত্তিক। ১৯৩০ সালের প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের গৌরবকে মাথায় রেখে তৈরি করা এই নকশাটি নস্টালজিক না হয়ে বরং বেশ ফিউচারিস্টিক বা আধুনিক লেগেছে।

১. ফ্রান্স
ফুটবল ফ্যাশনের কথা আসলে ফ্রান্সের চেয়ে সেরা কেউ নেই। ফরাসিদের দুটি জার্সির প্রতিটিই বিশ্বমঞ্চের জন্য এক একটি মাস্টারপিস। তাদের হোম জার্সিটি সূক্ষ্ম পরিশীলন ও আভিজাত্যের এক অনন্য উদাহরণ; নীলের একাধিক শেড জার্সিতে গভীরতা এনেছে এবং সাদা রঙের ফোল্ড-ওভার কলারটি ওল্ড-স্কুল ক্লাসিক লুক দিয়েছে। এর সাথে ব্রোঞ্জ রঙের লোগো ও ডিটেইলিং দারুণ বৈসাদৃশ্য তৈরি করেছে। অ্যাওয়ে জার্সিটিও সমান আকর্ষণীয়। সামগ্রিকভাবে ফ্রান্সের এই সংগ্রহটি একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল জার্সির আসল সংজ্ঞা- সাংস্কৃতিকভাবে প্রাসঙ্গিক, দৃষ্টিনন্দন এবং দেখামাত্রই চেনা যায়।

আগামী ১৯ জুলাই হয়তো কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ মূল সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরবে, তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই ২০২৬ বিশ্বকাপের ‘ফ্যাশন ট্রফি’টা কিন্তু ফ্রান্স অলরেডি জিতে নিয়েছে!


















