ফুটবল বিশ্বকাপে হার মানেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়- সাধারণভাবে আমরা এমনটাই ভেবে থাকি। কিন্তু ফুটবলের ব্যাকরণে এই সমীকরণ সবসময় খাটে না। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরেও শেষ পর্যন্ত ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিল আর্জেন্টিনা। একইভাবে ২০১০ সালে সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে বিশ্বকাপ শুরু করা স্পেন শেষে হয়েছিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।
এর ঠিক বিপরীত পিঠও রয়েছে। কোনো ম্যাচে না হেরেও অনেক দলকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছে; এমনকি কোনো কোনো দল গ্রুপ পর্বের গণ্ডিও পার হতে পারেনি। টাইব্রেকারের ভাগ্য পরীক্ষা যেহেতু দাপ্তরিকভাবে ‘ড্র’ হিসেবে গণ্য হয়, তাই অপরাজিত থেকেও বিদায় নেওয়ার এমন ১৯টি ট্র্যাজিক ও রোমাঞ্চকর গল্প চলুন জেনে নেওয়া যাক:
বিজ্ঞাপন
ভাগ্যের শিকার: নকআউটে টাইব্রেকারে অপরাজিত বিদায় (১৪ থেকে ১৯ নম্বর)
১৯. আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র (২০০২): টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে অধিনায়ক রয় কিনের বিতর্কিত বিদায়ের পরও দারুণ খেলেছিল আয়ারল্যান্ড। গ্রুপ পর্বে ক্যামেরুন ও জার্মানির সাথে ড্র এবং সৌদি আরবকে হারিয়ে তারা নকআউটে ওঠে। শেষ ১৬-র ম্যাচে রব্বি কিনের শেষ মুহূর্তের গোলে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ালেও, শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় মিক ম্যাককার্থির শিষ্যরা।
১৮. সুইজারল্যান্ড (২০০৬): ফ্রান্সের সাথে গোলশূন্য ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করে টোগো এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ ১৬-তে উঠেছিল সুইসরা। কিন্তু ইউক্রেনের বিপক্ষে ম্যাচটি ০-০ ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারের ভাগ্য পরীক্ষায় হেরে তাদের অপরাজিত বিদায় ঘটে।
১৭. ডেনমার্ক (২০১৮): রাশিয়া বিশ্বকাপে পেরুকে হারিয়ে এবং অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সের সাথে ড্র করে রানার্স-আপ হিসেবে নকআউটে ওঠে ডেনমার্ক। শেষ ১৬-র লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়ার সাথে ১-১ গোলে ড্র করার পর টাইব্রেকারে ৩-২ ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় ডেনিশরা।
বিজ্ঞাপন
১৬. কোস্টারিকা (২০১৪): উরুগুয়ে, ইতালি এবং ইংল্যান্ডের মতো পরাশক্তিদের গ্রুপে থেকেও সবাইকে চমকে দিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় কোস্টারিকা। শেষ ১৬-তে গ্রিসকে টাইব্রেকারে হারালেও, কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচটি গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকার ভাগ্য তাদের ছিটকে দেয়।
১৫. মেক্সিকো (১৯৮৬): স্বাগতিক হিসেবে মেক্সিকো বেলজিয়াম ও ইরাককে হারায় এবং প্যারাগুয়ের সাথে ড্র করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়। শেষ ১৬-তে বুলগেরিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে তারা। সেখানে পশ্চিম জার্মানির সাথে ম্যাচটি ০-০ ড্র হওয়ার পর ঐতিহাসিক এস্তাদিও আসতেকা স্টেডিয়ামে টাইব্রেকারে ৪-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় স্বাগতিকরা।
১৪. নেদারল্যান্ডস (২০১৪ এবং ২০২২): ডাচদের জন্য টাইব্রেকার এক চিরন্তন ট্র্যাজেডি। ২০১৪ বিশ্বকাপে লুই ফন গালের অধীনে সেমিফাইনাল পর্যন্ত ডাচরা ছিল অপরাজিত। কিন্তু সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় তারা (পরে স্বাগতিক ব্রাজিলকে হারিয়ে তৃতীয় হয়)। ২০২২ সালে ফন গাল যখন আবারও দলের দায়িত্বে, এবারও কোয়ার্টার ফাইনালে সেই আর্জেন্টিনার কাছেই টাইব্রেকারে হেরে অপরাজিত বিদায় নিতে হয় ডাচদের।
টাইব্রেকার ও ভূতুড়ে নিয়মের বলি (৮ থেকে ১৩ নম্বর)
১৩. স্পেন (২০০২ এবং ২০১৮): ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়নরা ২০০২ এবং ২০১৮ বিশ্বকাপে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে কোনো ম্যাচ হারেনি। কিন্তু ২০০২ সালে সহ-স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়া এবং ২০১৮ সালে স্বাগতিক রাশিয়ার কাছে নকআউট পর্বে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হয় লা রোহাদের।
১২. অস্ট্রিয়া (১৯৩৮): এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা। ১৯৩৮ বিশ্বকাপের ঠিক আগে মার্চ মাসে ‘আনশ্লুস’-এর মাধ্যমে অস্ট্রিয়াকে জার্মান রাইখের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। ফলে অস্ট্রিয়া টুর্নামেন্ট থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয় এবং সুইডেনকে বাই-পাস দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পাঠানো হয়। প্রযুক্তিগতভাবে কোনো ম্যাচ না খেলেও তারা অপরাজিত অবস্থায় বিদায় নেয়।
১১. বেলজিয়াম (১৯৯৮): ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচের একটিতেও হারেনি বেলজিয়াম। কিন্তু নেদারল্যান্ডস, মেক্সিকো এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে টানা তিনটি ম্যাচই ড্র করায় তারা গ্রুপে তৃতীয় হয় এবং ওলন্দাজ ও মেক্সিকানদের চেয়ে ২ পয়েন্ট পিছিয়ে থেকে প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নেয়।
১০. নিউজিল্যান্ড (২০১০): ২০১০ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিস্ময়! সেবার চ্যাম্পিয়ন স্পেনও একটি ম্যাচ হেরেছিল, কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে অপরাজিত একমাত্র দল ছিল নিউজিল্যান্ড। গ্রুপ পর্বে স্লোভাকিয়া, ইতালি এবং প্যারাগুয়ের সাথে তিনটি ম্যাচই ড্র করে তারা। ফলে ৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপে তৃতীয় হয়ে তারা বিদায় নেয়, যেখানে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি হয়েছিল গ্রুপের তলানি।
৯. ক্যামেরুন (১৯৮২): নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই এক ট্র্যাজিক ইতিহাসের অংশ হয় ক্যামেরুন। পেরু এবং পোল্যান্ডের সাথে গোলশূন্য ড্র করার পর ইতালির সাথে ১-১ গোলে ড্র করে তারা। কিন্তু সেবারের চ্যাম্পিয়ন ইতালির সমান পয়েন্ট ও গোল ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও, কেবল ইতালির চেয়ে ‘কম গোল করার’ কারণে গ্রুপ পর্ব থেকেই অপরাজিত বিদায় নেয় আফ্রিকার এই অদম্য সিংহরা।
৮. স্কটল্যান্ড (১৯৭৪): স্কটল্যান্ড কখনোই বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠতে পারেনি, তবে ১৯৭৪ সালে তারা অপরাজিত থাকার গৌরব অর্জন করেছিল। যুগোস্লাভিয়া এবং ব্রাজিলের সাথে ড্র করার পাশাপাশি জাইরকে ৩-০ গোলে হারিয়েছিল তারা। কিন্তু গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় ৩টি দলই ৪ পয়েন্ট পাওয়া সত্ত্বেও স্কটিশদের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়।
অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন ও ট্র্যাজিক পরাশক্তি (১ থেকে ৭ নম্বর)
৭. আর্জেন্টিনা (১৯৮৬ এবং ২০০৬): ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরী ছোঁয়ায় মেক্সিকোর মাটিতে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্জেন্টিনা। এছাড়া ১৯৭৮ ও ২০২২ সালেও তারা চ্যাম্পিয়ন হয়, তবে ১৯৭৮-এ ইতালির কাছে এবং ২০২২-এ সৌদির কাছে হেরেছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে হোসে পেকারম্যানের অধীনে পুরো টুর্নামেন্টে অপরাজিত থাকা দলটি কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয়।
৬. ইংল্যান্ড (১৯৬৬, ১৯৮২ এবং ২০০৬): ১৯৬৬ সালে ঘরের মাঠে পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল থ্রি লায়ন্সরা। ১৯৮২ সালেও তারা কোনো ম্যাচ হারেনি, কিন্তু দ্বিতীয় গ্রুপ পর্বে টানা দুই ড্রয়ের কারণে পশ্চিম জার্মানির কাছে পিছিয়ে পড়ে বিদায় নেয়। আর ২০০৬ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের কাছে কেবল টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের।
৫. ফ্রান্স (১৯৯৮, ২০০৬ এবং ২০১৮): ১৯৯৮ সালে নিজেদের মাটিতে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে এবং ২০১৮ সালে ক্রোয়েশায়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় ফ্রান্স। আর ২০০৬ সালে পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা ফরাসিবাহিনী ফাইনালে ইতালির কাছে কেবল টাইব্রেকারে হেরে রানার্স-আপ হয়ে মাঠ ছাড়ে।
৪. উরুগুয়ে (১৯৩০ এবং ১৯৫০): ১৯২৪ ও ১৯২৮-এর অলিম্পিক জয়ী উরুগুয়ে ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর ১৯৫০ সালের বিখ্যাত ‘মারাকানাজো’র রাতে স্বাগতিক ব্রাজিলকে ২-১ গোলে স্তব্ধ করে দিয়ে আরও একবার অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে সেলেস্তেরা।
৩. জার্মানি (১৯৯০ এবং 2014): ১৯৯০ সালে পশ্চিম জার্মানি হিসেবে নিজেদের তৃতীয় বিশ্বকাপটি তারা জিতেছিল সম্পূর্ণ অপরাজিত থেকে (যা তাদের ১৯৫৪ বা ১৯৭৪ সালের চ্যাম্পিয়ন দলেও সম্ভব হয়নি)। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে একীভূত দেশ হিসেবে ব্রাজিলের মাটিতে স্বাগতিকদের ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে এবং ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় ‘ডাই মানশাফট’।
২. ইতালি (১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২, ১৯৯০, ১৯৯৮ এবং ২০০৬): আজ্জুরিদের চারবারের বিশ্বজয়ের (১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ ও ২০০৬) প্রতিটিই ছিল সম্পূর্ণ অপরাজিত ক্যাম্পেইন। এর বাইরে ১৯৯০ এবং ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপেও তারা নির্ধারিত সময়ে কোনো ম্যাচ হারেনি, দুইবারই কেবল টাইব্রেকারের ভাগ্য দেবীর নির্মম পরিহাসে তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল।
১. ব্রাজিল (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৭৮, ১৯৮৬, ১৯৯৪ এবং ২০০২): ফুটবল ইতিহাসের সফলতম দল ব্রাজিল তাদের পাঁচবার বিশ্বজয়ের (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২) প্রতিটিতেই ছিল সম্পূর্ণ অপরাজিত। এর বাইরে ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপে ক্লাউডিও কুটিনহোর অধীনে একটি ম্যাচও না হেরে কেবল গোল ব্যবধানে স্বাগতিক আর্জেন্টিনার চেয়ে পিছিয়ে থাকায় ফাইনাল খেলা হয়নি তাদের (পরে ইতালিকে হারিয়ে তৃতীয় হয়)। আর ১৯৮৬ সালে টেলে সান্তানার সেই স্বপ্নের ব্রাজিল দল কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে কেবল টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিয়েছিল।
বিশ্বকাপের এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, ফুটবল মাঠে কখনো কখনো নিখুঁত বা অপরাজিত থাকাই শেষ কথা নয়; ভাগ্য এবং মুহূর্তের ব্যবধানই নির্ধারণ করে দেয় কার হাতে উঠবে সোনালি ট্রফি আর কাকে অপরাজিত থেকেও কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়তে হবে।
আরএ
























































































