সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ঢাকা

রোনালদোকে ছাড়াই কি বিশ্বকাপে পর্তুগাল আরও ভালো দল হত?

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮ জুন ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

রোনালদোকে ছাড়াই কী বিশ্বকাপে পর্তুগাল আরও ভালো দল হত?

ম্যাচটি ছিল একদম সাধারণ এক আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ, যা খুব সহজেই ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যেতে পারত। প্রতিপক্ষ ছিল কাজাখস্তান, যারা কেবল কিছুদিন আগেই উয়েফাতে যোগ দিয়েছে। উত্তর পর্তুগালের চাভেসের মাত্র ৮ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এক স্টেডিয়ামে ম্যাচটি হয়েছিল এমন এক জীর্ণ মাঠে, যার শ্রী বাড়াতে ঘাসগুলোকে সবুজ রঙ করতে হয়েছিল!

কিন্তু ২০০৩ সালের ২০ আগস্টের সেই সংকীর্ণ ১-০ ব্যবধানের জয়টি ফুটবল ইতিহাস থেকে কখনো মুছে যায়নি। কারণ, সেদিনই পর্তুগালের জাতীয় দলের জার্সিতে শুরু হয়েছিল এক ১৮ বছর বয়সী তরুণের মহাকাব্য- যার নাম ক্রিশ্চিয়ানও রোনালদো।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন- রোমাঞ্চ ছেড়ে বাস্তবতার পথে ব্রাজিল: বয়স্ক দল নিয়ে এক অন্য ‘সেলেসাও’

আরও পড়ুন- ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার যেমন হতে পারে ফাইনাল খেলার রোডম্যাপ

সেদিন হয়তো কেউ ভাবেনি মাদেইরা দ্বীপ থেকে আসা সেই চপল বালকটি তিন বছর পর বিশ্বকাপে অভিষেক করবে, আর দীর্ঘ ২৩ বছর পর ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে এসে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে রেকর্ড ৬ষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার অনন্য কীর্তি গড়বেন (আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি এবং মেক্সিকোর গুইলারমো ওচোয়ার সাথে)। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৪৩ গোলের মালিক রোনালদো কেবল পর্তুগালের ফুটবলকেই বদলে দেননি, বদলে দিয়েছেন একটি পুরো জাতির মানসিকতা। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে বিশ্বাস করতে হয়।

তবে এবারের বিশ্বকাপে ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকাকে ঘিরে পর্তুগালের অভ্যন্তরীণ ফুটবল মহলে চলছে তুমুল বিতর্ক। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের পর থেকে যে রোনালদোকে স্কোয়াডের বাইরে রাখার কথা ভাবা ‘দেশদ্রোহীতা’র শামিল ছিল, আজ তা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের ডাইনামিকস এবং সিআরসেভেন এর শেষ মিশন নিয়ে আজকের বিশেষ খুঁটিনাটি প্রিভিউ।


বিজ্ঞাপন


ফুটবল বনাম ব্যক্তিত্ব: দলের ভেতরেই সমালোচনা

ক্যারিয়ারে শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন রোনালদো। জীবন্ত কিংবদন্তির বিদায়টা বিশ্বকাপ জিতে হোক- এমনটা চান তাঁর সতীর্থ এবং ভক্তরাও। তবে সমালোচনাও কম হচ্ছে না। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করা কিংবদন্তি ফুটবলার আন্তোনিও সিমোয়েস সরাসরি সমালোচনা করে বলেন, "রোনালদো এখন দলের জয়ের জন্য খেলে না, সে খেলে নিজে মূল আকর্ষণ হয়ে থাকার জন্য। এটা আমাদের মহান ইউসেবিওর দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমি বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারি না, বিশ্বকাপে ট্রফি জিততে হলে এই মানসিকতা বদলাতে হবে।"

একই সুরে কথা বলেছেন সিএনএন ও ড্যাজন পর্তুগালের প্রখ্যাত ফুটবল বিশ্লেষক সোফিয়া অলিভিয়েরা, "বিশ্বকাপ জিততে চায় এমন একটি দলের শুরুর একাদশে খেলার মতো ফুটবলীয় ধার এখন আর রোনালদোর নেই। তবে বড় সমস্যা হলো, পর্তুগাল দল তাঁর বিকল্প তৈরি করার কোনো প্রস্তুতিই নেয়নি।"

বিশ্বকাপ দলে রোনালদোর থাকা নিয়ে যখন সমালোচকরা এসব মন্তব্য করছেন তখন ঢাল হয়েই দাঁড়িয়েছেন পর্তুগীজদের কোচ রবার্তো মার্তিনেজ। সমালোচকদের এসব মন্তব্যকে কেবল ‘লিফটের আড্ডা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন পর্তুগালের স্প্যানিশ কোচ। রোনালদোকে দলে রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে তিনি একটি অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান তুলে ধরেন— সেলেসাওদের হয়ে শেষ ৩১ ম্যাচে রোনালদোর গোল ২৫টি!

মার্তিনেজ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "আমরা ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়কে নিয়ে কথা বলছি। সে এখানে তার অতীতের অর্জনের জন্য আসেনি, সে এখনও সর্বোচ্চ স্তরে পারফর্ম করছে বলেই দলে আছে।"

পরিসংখ্যানের বৈপরীত্য: রোনালদোকে ছাড়াও কি পর্তুগাল সেরা?

মার্তিনেস ২০২৩ সালে বেলজিয়াম ছেড়ে পর্তুগালের দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩৯টি ম্যাচের মধ্যে ৩১টিতেই খেলেছেন রোনালদো। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই কোচিং চক্রে পর্তুগাল তাদের ইতিহাসের অন্যতম দুটি বড় জয় পেয়েছে রোনালদোকে ছাড়াই!

সেপ্টেম্বর ২০২৩-এ লাক্সেমবার্গের বিপক্ষে ৯-০ গোলের ঐতিহাসিক জয়।
গত নভেম্বরে আর্মেনিয়ার বিপক্ষে ৯-১ গোলের বিধ্বংসী জয়।

এই দুটি ম্যাচেই রোনালদো ইনজুরি বা নিষেধাজ্ঞার কারণে ছিলেন না। আর এর পরেই পর্তুগিজ মিডিয়ায় প্রশ্ন ওঠে- দল কি অধিনায়ককে ছাড়াই বেশি গতিশীল ও ছন্দময় ফুটবল খেলে?

তা সত্ত্বেও সাবেক গোলরক্ষক রিকার্দো (যিনি ২০০৩ সালে রোনালদোর অভিষেক ম্যাচে মাঠে ছিলেন এবং বর্তমানে কোচিং স্টাফের অংশ) রোনালদোর পক্ষ নিয়ে বলেন, "গতির দিক থেকে সে হয়তো এখন আর ২০০ কিমি/ঘণ্টা বেগে দৌড়াতে পারে না, কিন্তু ১৯৫ কিমি/ঘণ্টা বেগে ঠিকই দৌড়ায়! এই বয়সেও এটা অবিশ্বাস্য। মাঠে তাঁর উপস্থিতি তরুণদের মানসিকভাবে চাঙ্গা করে।"

মাঠের বাইরে রোনালদোর একচ্ছত্র ক্ষমতা ও এফপিএফ

পর্তুগালে রোনালদোর প্রভাব কতটা শক্তিশালী, তা বোঝা যায় মাঠের বাইরের কিছু ঘটনায়। ২০২২ বিশ্বকাপে রোনালদোকে বেঞ্চে বসানোর খেসারত দিতে হয়েছিল তৎকালীন কোচ ফের্নান্দো সান্তোসকে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোনালদোর পরিবারের তোপের মুখে পড়ে বিশ্বকাপ শেষেই চাকরি হারান তিনি।

এমনকি সম্প্রতি পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন রোনালদোর মালিকানাধীন কোম্পানি 'AVA CR7'-এর সাথে ব্যবসায়িক চুক্তি করায় স্বার্থের সংঘাত নিয়ে জলঘোলা হয়েছে। ফেডারেশন অবশ্য বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই চুক্তির সাথে খেলোয়াড় বা অধিনায়ক রোনালদোর কোনো সম্পর্ক নেই, এটি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক। ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনকা আশ্বস্ত করেছেন যে, রোনালদো-পরবর্তী যুগের আর্থিক ও কাঠামোগত প্রস্তুতি ফেডারেশন কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই সম্পন্ন করে রেখেছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে রোনালদোর সামনে যেসব লক্ষ্য

১৭ জুন ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে মিশন শুরু করবে পর্তুগাল। রোনালদো ইতিমধ্যেই নিশ্চিত করেছেন, এটাই তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। এই আসরে তাঁর সামনে দুটি মূল লক্ষ্য:
১. ইউসেবিওর রেকর্ড ভাঙা: বিশ্বকাপে রোনালদোর গোল সংখ্যা বর্তমানে ৮টি। আর ১টি গোল করলেই তিনি কিংবদন্তি ইউসেবিওর করা বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে সর্বোচ্চ ৯ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করবেন।
২. অধরা ট্রফি জয়: বিগত ৫টি বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র খেলোয়াড় রোনালদো এবার চাইবেন তাঁর ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতা বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাতে।

পর্তুগিজ ফুটবল এবং ক্রিশ্চিয়ানও রোনালদোর ব্র্যান্ড ভ্যালু এখন একে অপরের পরিপূরক। চাভেসের সেই রঙ করা ঘাসের মাঠ থেকে শুরু হওয়া গল্পটি কি উত্তর আমেরিকার আধুনিক গ্যালারিতে বিশ্বজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হবে? নাকি বেঞ্চ বনাম শুরুর একাদশের দ্বন্দ্বে ট্র্যাজিক সমাপ্তি ঘটবে? ফুটবল বিশ্ব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই উত্তর জানতে।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর