ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো এই গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা জুড়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপকে এভাবেই স্বাগত জানিয়েছেন। ফুটবলের এই মেগা আসরকে বাড়িয়ে গুছিয়ে বলতে তিনি কখনই দ্বিধাবোধ করেন না। বিশ্ব ফুটবলের এই সর্বোচ্চ অভিভাবক এবার মহাদেশ-জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই সংস্করণটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক, উদাৎ ও ঐক্যবদ্ধ করার একটি রূপরেখা তৈরি করেছেন। কিন্তু বাকি বিশ্ব হয়তো এর উল্টো পিঠটাও দেখছে। অনেকের কাছেই এর বিশেষণগুলো ভিন্ন।
যেমন, এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ‘রাজনৈতিক প্রভাবিত’ এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ। সম্ভবত সবচেয়ে উত্তপ্ত কিংবা সবচেয়ে বেশি পরিবেশ দূষণকারী আসরও এটি। তবে একটা বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই—ফিফার পকেটে এবার রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ঢুকছে। দৃষ্টিভঙ্গি যা-ই হোক না কেন, মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক এই দানবীয় আকৃতির বিশ্বকাপটিকে ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত আসরে পরিণত করতে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
দর্শকদের টিকিটের আকাশচুম্বী দাম, ভূ-রাজনীতি এবং অভিবাসন নীতির প্রভাব থেকে শুরু করে নিরাপত্তা, চরম আবহাওয়া, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা—সব মিলিয়ে এই বিশ্বকাপ যেমন উন্মাদনা ছড়াচ্ছে, তেমনি জাগাচ্ছে এক গভীর শঙ্কা।
তাহলে এই আসরের মূল সংকটগুলো ঠিক কী? আমরা কীভাবে এই পরিস্থিতিতে এলাম? আর এখানে ঠিক কী বাজি ধরা হয়েছে? বিশ্ব ফুটবলের চোখ যখন বৃহস্পতিবারের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে মেক্সিকো সিটির দিকে নিবদ্ধ, তখন এই সহ-আয়োজক দেশটিই একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আগামী কয়েকটি সপ্তাহ কতটা রোমাঞ্চকর এবং একই সাথে চ্যালেঞ্জিং হতে যাচ্ছে।
ফুটবলের এই চারণভূমিতে, যে শহরটি বিশ্বকাপকে ইতিহাসের কিছু আইকনিক মুহূর্ত উপহার দিয়েছে, সেই কিংবদন্তি ‘এস্তাদিও আজতেকা’ ইতিহাস গড়তে প্রস্তুত। বিশ্বের প্রথম ভেন্যু হিসেবে এটি তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজন করতে যাচ্ছে।
নিশ্চয়ই এটি একটি রোমাঞ্চকর সম্ভাবনা। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মতোই (যেখানে প্রায় ৭৫% ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে) এখানেও টিকিটের অতিরিক্ত দাম ভাবিয়ে তুলছে সাধারণ সমর্থকদের। পাশাপাশি চলতি বছরে মেক্সিকোতে ড্রাগ কার্টেল বা মাদক চক্রের ভয়াবহ সহিংসতার কারণে নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
মেক্সিকোর রাজধানীতে ইতিমধ্যেই বিক্ষোভকারীরা বিশ্বকাপের জন্য তৈরি খেলোয়াড়দের বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য ভেঙে ফেলেছে। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকরা হুমকি দিয়েছেন, তাদের দাবি মানা না হলে তারা ম্যাচ চলাকালীন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন। অন্যদিকে, টিহুয়ানা শহরে ইরান দলের উপস্থিতিই মনে করিয়ে দিচ্ছে মাঠের খেলার পেছনে লুকিয়ে থাকা জটিল রাজনৈতিক উত্তেজনার কথা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান: ইতিহাসে প্রথমবার যুদ্ধের আবহেই মুখোমুখি আয়োজক ও অংশগ্রহণকারী দেশ
এর আগে কোনো বিশ্বকাপ একসঙ্গে তিনটি দেশে ছড়িয়ে যায়নি। কখনো ৪৮টি দল এবং ১০৪টি ম্যাচের বিশাল সূচিও দেখেনি ফুটবল বিশ্ব। তবে কেবল এই বিশাল আকারই নয়, অন্য অনেক দিক থেকেও এই টুর্নামেন্ট নজিরবিহীন। এর আগে কখনো কোনো আয়োজক দেশ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অন্য একটি দেশের সাথে সরাসরি সামরিক সংঘাতে লিপ্ত থাকা অবস্থায় খেলা আয়োজন করেনি।
গত মাসেই ফিফা নিশ্চিত করেছে যে ইরান দল তাদের বেস ক্যাম্প অ্যারিজোনা থেকে মেক্সিকোতে সরিয়ে নিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যে পাল্টা হামলা শুরু হয়, এটি তারই সর্বশেষ প্রভাব। এপ্রিলের শুরুতে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও দুই পক্ষের মধ্যে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
গত কয়েক মাসে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে এক চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক পর্যায়ে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানের খেলোয়াড়দের "নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার স্বার্থে" এই টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া "উপযুক্ত নয়"। এমনকি তার বিশেষ দূত পরামর্শ দিয়েছিলেন, ইরানকে বাদ দিয়ে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে (যারা কোয়ালিফাই করতে পারেনি) সুযোগ দেওয়া হোক।
সব বাধা পেরিয়ে ইরান এখন তাদের টানা চতুর্থ বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও ব্যাকরুম স্টাফকে ভিসা দিতে অস্বীকার করেছে। এক ইরানি কর্মকর্তা দাবি করেছেন, খেলোয়াড়দের বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের গ্রুপ পর্বের ৩টি ম্যাচের দিনই সেখানে প্রবেশ করতে হবে এবং ম্যাচ শেষেই দেশ ছাড়তে হবে। তুরস্কে অবস্থিত ইরানি দূতাবাসও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে "খেলাধুলায় রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হস্তক্ষেপের" অভিযোগ এনেছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ফিফা স্টেডিয়ামগুলোতে বিপ্লব-পূর্ববর্তী ইরানের পুরনো পতাকা নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে। ফলে ইরানের ম্যাচগুলো যে রাজনৈতিকভাবে চরম উত্তপ্ত থাকবে, তা বলাই বাহুল্য; বিশেষ করে প্রথম দুটি ম্যাচ লস অ্যাঞ্জেলেসে হওয়ায়, যেখানে বিশাল সংখ্যক প্রবাসী ইরানি সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে।
আয়োজনকে ম্লান করেছে টিকিটের দাম ও খরচের বিতর্ক
আট বছর আগে, ২০১৮ সালে ফিফা এই ২০৬৬ বিশ্বকাপের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডাকে দিয়েছিল। তখন লক্ষ্য ছিল ২০১০ সালের রাশিয়া (২০১৮) এবং কাতার (২০২২) বিশ্বকাপের ভোটিংয়ে জড়িয়ে পড়া ফিফার সেই কুখ্যাত দুর্নীতি কেলেঙ্কারি থেকে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা। ঐ দুটি দেশকে যেখানে ঘুষের অভিযোগ অস্বীকার করতে হয়েছিল, সেখানে উত্তর আমেরিকায় স্টেডিয়াম ও অবকাঠামো আগে থেকেই প্রস্তুত থাকায় ফিফার কাছে এই আয়োজনকে অনেক নিরাপদ মনে হয়েছিল।
আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিল আর্থিক। বিলিয়ন ডলারের সম্প্রচার স্বত্ব এবং স্পনসরশিপ চুক্তির মাধ্যমে, বিশ্বের সবচেয়ে বাণিজ্যিকীকৃত ক্রীড়া বাজারে এই বর্ধিত টুর্নামেন্টটি ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক ইভেন্ট হতে যাচ্ছে। ফিফা কেবল এই বছরই রেকর্ড ৯ বিলিয়ন ডলার (৬.৭৪ বিলিয়ন পাউন্ড) আয় করতে যাচ্ছে।
এই বিশাল অর্থ ফিফাকে আগামী চার বছরে বিভিন্ন দেশের জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মধ্যে ২.৭ বিলিয়ন ডলার পুনর্বণ্টন করার সুযোগ করে দেবে। এটি বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নে সাহায্য করবে এবং আগামী বছর জিয়ানি ইনফান্তিনোর তৃতীয়বারের মতো পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু এই অর্থের সিংহভাগ যেভাবে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে তোলা হচ্ছে, তা নিয়েই বিশ্বকাপের আগে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম হয়েছে।
একটি শীর্ষস্থানীয় সমর্থক গোষ্ঠী এই খরচকে সাধারণ ভক্তদের সাথে "মহাপ্রতারণা" হিসেবে অভিহিত করেছে। এরপর ফিফা অবশ্য মাত্র ৬০ ডলারের কিছু টিকিটের ঘোষণা দেয়। কিন্তু টিকিটের এই চড়া মূল্য নির্ধারণের কৌশল এবং বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো 'ডাইনামিক প্রাইসিং' (চাহিদা ও সময়ের ওপর ভিত্তি করে টিকিটের দাম ওঠা-নামা করা) পদ্ধতি চালু করায় বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, দলের সবচেয়ে একনিষ্ঠ ও আবেগী সমর্থকরা টাকার অভাবে স্টেডিয়ামে ঢোকার সুযোগই পাবেন না।
এমনকি ফিফার অফিশিয়াল রিসেল (পুনর্বিক্রয়) প্ল্যাটফর্মেও ভক্তদের চড়া দাম দিতে হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি টিকিট বিক্রি থেকে ফিফা ৩০% কমিশন কেটে নিচ্ছে। ফিফা অবশ্য মার্কিন ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার দোহাই দিয়ে দাবি করেছে যে, ইতিমধ্যেই ৫০ লাখের বেশি টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে এবং সব ম্যাচই 'হাউসফুল' হবে।
তবে বিবিসি স্পোর্টস অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলোর ম্যাচের হাজার হাজার টিকিট ফিফার নিজস্ব রিসেল সাইট এবং অন্যান্য সেকেন্ডারি মার্কেটে আসল দামের চেয়েও অনেক কম দামে পড়ে রয়েছে। এমনকি বিক্রি করতে না পারা টিকিটগুলো ফিফা ‘সিটগিক’ নামক সাইটে সস্তায় ছেড়ে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ নিয়েও অসন্তোষ কম নয়। সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক থেকে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম (যেখানে ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে) পর্যন্ত ট্রেনের সাধারণ টিকিটের দাম ১২.৯০ ডলার থেকে বাড়িয়ে এক লাফে ১৫০ ডলার করা হয়েছিল! পরবর্তীতে তা কমিয়ে ৯৮ ডলার করা হয়। নিউ জার্সির গভর্নর এর জন্য ফিফাকে দায়ী করে বলেছেন, তারা যাতায়াত খরচে কোনো ভর্তুকি দিতে রাজি হয়নি।
সমর্থকদের মেজাজ আরও বিগড়ে যায় যখন গত সপ্তাহে ফিফা নিরাপত্তার অজুহাতে স্টেডিয়ামের ভেতরে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল নিয়ে ঢোকা নিষিদ্ধ করে। অনেকেই মনে করছেন, স্টেডিয়ামের ভেতরের বাণিজ্যিক দোকানগুলোর সুবিধার জন্যই শেষ মুহূর্তে এই নিয়ম আনা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, ১৬টি ভেন্যুর মধ্যে ১৪টিতেই তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এমন গরমে পানির বোতল নিষিদ্ধ করায় ভক্তদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সমর্থক গোষ্ঠী এবং রাজনীতিবিদদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে অবশেষে ফিফা নতি স্বীকার করে এবং সিলগালা করা ওয়ান-টাইম প্লাস্টিকের পানির বোতল নিয়ে ঢোকার অনুমতি দিতে বাধ্য হয়।
আজ থেকে ৩২ বছর আগে, ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপ দেশটির সাধারণ মানুষের মাঝে ফুটবলের জোয়ার এনে দিয়েছিল। এখন সেখানে একটি প্রতিষ্ঠিত ঘরোয়া লিগ রয়েছে এবং ইউরোপীয় ফুটবলেও মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাপক। ফলে এবারের আসর নিয়ে প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষই মনে করেন একজন গড়পড়তা আমেরিকান নাগরিকের জন্য স্টেডিয়ামে গিয়ে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখা এখন বড্ড বেশি ব্যয়বহুল।
হোটেল বুকিংয়ের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি আয়োজক শহরেই বুকিংয়ের হার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। মানুষের মনে এই ধারণা দানা বাঁধছে যে, রেকর্ড খরচ এবং রাজনৈতিক ডামাডোলের কারণে সাধারণ পর্যটকরা এবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
একটি ‘রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত’ টুর্নামেন্ট
২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে, মুসলিম প্রধান ছয়টি দেশের নাগরিকদের ওপর মার্কিন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির পর ইনফান্তিনো মন্তব্য করেছিলেন যে, এই নীতি ফিফার নিয়মের পরিপন্থী এবং এটি ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক হওয়ার দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্ন ভেস্তে দিতে পারে। তিনি তখন সতর্ক করে বলেছিলেন, "ফিফা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এটা স্পষ্ট যে, বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা যেকোনো দল, তাদের সমর্থক এবং কর্মকর্তাদের সেই দেশে অবাধ প্রবেশের অধিকার থাকতে হবে, অন্যথায় সেখানে কোনো বিশ্বকাপ হতে পারে না।"
অথচ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে কার্যকর হওয়া অভিবাসন নীতির কারণে এবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া চারটি দেশ—ইরান, হাইতি, সেনেগাল এবং আইভরি কোস্টের সমর্থকদের পূর্ণ বা আংশিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের দাবি, নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার জন্যই এই কঠোর পদক্ষেপ।
তবে বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দেশের মধ্যে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি দেশের ভক্তরা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, কঠোর নিয়ম বা উচ্চ ভিসা প্রত্যাখ্যান হারের সম্মুখীন হচ্ছেন। একেবারে শেষ মুহূর্তে, গত মাসে আলজেরিয়া, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, কেপ ভার্দে এবং তিউনিসিয়ার দর্শকদের জন্য মার্কিন ভিসা পাওয়ার আগে ১৫,০০০ ডলার পর্যন্ত জামানত বা ডিপোজিট দেওয়ার নিয়মটি শিথিল করা হয়।
গত উইকএন্ডে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সাংবাদিক সংস্থা অভিযোগ করেছে, "আমাদের সাংবাদিকদের জন্য এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং অগ্রহণযোগ্য সমস্যা- বৈধ অ্যাক্রেডিটেশন থাকা সত্ত্বেও সহকর্মীদের এন্ট্রি ভিসা দেওয়া হচ্ছে না।" আর গত সোমবার ফিফা জানিয়েছে, ওমর আরতান- যিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম সোমালিয়ার রেফারি হিসেবে ম্যাচ পরিচালনা করতে যাচ্ছিলেন—তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে কারণ যুক্তরাষ্ট্র তাকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। মার্কিন ইমিগ্রেশন এর কোনো কারণ দর্শায়নি, তবে সোমালিয়া ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা দেশগুলোর একটি।
"এটি এমন একটি টুর্নামেন্ট যেখানে খেলোয়াড়, ভক্ত বা কর্মকর্তারা অনায়াসে বা সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্তভাবে প্রবেশ করতে পারছেন না—যদি তারা আদৌ ঢুকতে পারেন," বলছিলেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান মানবাধিকার কর্মী ক্রেগ ফস্টার।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যে খেলাটি গত এক দশক ধরে নিজেদের মানবাধিকার নীতির প্রতি অঙ্গীকারের কথা বড় গলায় প্রচার করে আসছে, তার জন্য এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক। এর ফলে রাজনীতি ও খেলাধুলাকে আলাদা রাখার যে ধারণা প্রচলিত ছিল, তা পুরোপুরি ভেঙে যাওয়া উচিত। আধুনিক যুগে আমার মনে পড়া অন্য যেকোনো টুর্নামেন্টের চেয়ে এটি একটি গভীর রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বিশ্বকাপ।"
স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর ‘নজিরবিহীন’ চাপ
কয়েক সপ্তাহ আগেই হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছিলেন যে, ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (যা নিরাপত্তার বড় অংশ দেখভাল করছে) পুরোপুরি সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কংগ্রেস সদস্যদের মধ্যে তহবিল সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এই বিভাগের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে আংশিক বন্ধ ছিল। এখন এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলেও, কর্মকর্তাদের সামনের চ্যালেঞ্জগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
হোয়াইট হাউস ওয়ার্ল্ড কাপ টাস্কফোর্সের প্রধান অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি গত সপ্তাহে ইএসপিএনকে বলেন, "পুরো দেশের পুলিশ বাহিনী এই আয়োজনে জানপ্রাণ দিয়ে লেগেছে। আগামী ৪০ দিন স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে যা করতে হবে, তা ভাবলে এটি একটি অবিশ্বাস্য রকমের কঠিন কাজ মনে হয়। এটি সম্পূর্ণ নজিরবিহীন। কোনো কিছু যেন ভুল না হয়, সেজন্য আমরা আমাদের সাধ্যের সবটুকু করব।"
জুলিয়ানি স্বীকার করেছেন যে, ফান্ডিং সংকটের কারণে তারা এতদিন "এক হাত বাঁধা অবস্থায়" পরিকল্পনা করছিলেন এবং নিরাপত্তার কিছু ফাঁকফোকর এখনো তারা পূরণ করার চেষ্টা করছেন। নিরাপত্তার এই বিশাল চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষকে এখন ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো-কে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়েও মাথা ঘামাতে হচ্ছে। কঙ্গো দলের ম্যাচ রয়েছে হিউস্টন, আটলান্টা এবং গুয়াদালাহারায়।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে, "ফিফা বিশ্বকাপে আমাদের নাগরিকসহ যে লাখ লাখ দর্শক, ভক্ত, অ্যাথলেট এবং পর্যটকের আগমন ঘটবে, তাদের সুরক্ষায় একটি সমন্বিত পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র।"
ইতিহাসের ‘সবচেয়ে পরিবেশ-বিধ্বংসী’ টুর্নামেন্ট
ফিফা ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন ৫০% কমিয়ে আনার এবং ২০৪০ সালের মধ্যে 'নেট-জিরো' বা শূন্য কার্বন নির্গমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। পুরনো ও তৈরি স্টেডিয়ামগুলোতে ম্যাচ আয়োজন এই লক্ষ্য পূরণে সাহায্য করলেও, টুর্নামেন্টের এই বিশাল সম্প্রসারণ সেই উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে। কারণ এই আয়োজনের মোট কার্বন ফুটপ্রিন্টের ৮০-৯০ শতাংশেরই উৎস বিমানভ্রমণ।
পরিবেশবাদীদের দাবি, এটি ইতিহাসের "সবচেয়ে জলবায়ু-বিধ্বংসী" টুর্নামেন্ট হতে যাচ্ছে। বিমান ভ্রমণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে এই আসর থেকে ৯০ লাখ টনেরও বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে- যা গত চারটি বিশ্বকাপের গড় নির্গমনের প্রায় দ্বিগুণ।
অথচ তাদের মূল বিড বুকে তিন আয়োজক দেশ প্রাথমিক প্রাক্কলন দেখিয়েছিল ৩৬ লাখ টন কার্বন নির্গমনের এবং আশা প্রকাশ করেছিল যে এটি "খেলাধুলায় পরিবেশগত স্থায়িত্বের এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে।" গত সপ্তাহেও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীদের একটি দল ফিফাকে সতর্ক করে বলেছে যে, তীব্র গরম থেকে খেলোয়াড়দের সুরক্ষার জন্য তাদের বর্তমান ব্যবস্থা "অপ্রতুল" এবং এটি খেলোয়াড়দের গুরুতর শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
ফিফা অবশ্য বলছে, তারা "খেলোয়াড়, রেফারি, ভক্ত ও কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ" এবং জলবায়ু সংক্রান্ত সব ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও চরম আবহাওয়ার প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বজ্রঝড়ের কারণে ম্যাচ দীর্ঘক্ষণ বন্ধ রাখতে হলে কী হবে- যেমন টেক্সাসে গত ৬ জুন পুয়ের্তো রিকোর বিরুদ্ধে সৌদি আরবের প্রস্তুতি ম্যাচটি প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল। এর ফলে ফিফা নিজেই জলবায়ু সংকটকে আরও উসকে দিচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।
গত মে মাসে ইনফান্তিনো আমেরিকার ফুটবলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছিলেন, বৈশ্বিক ফুটবলের মোট জিডিপির মাত্র ৩% আসে মার্কিন বাজার থেকে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি ট্রিলিয়ন ডলারের এক বিশাল বাজার। আগামী কয়েকটি সপ্তাহ নির্ধারণ করবে এই ক্রীড়া ও বাণিজ্যিক মহোৎসব অবশেষে আমেরিকাকে জয় করতে পারল কি না।
নাকি এই টুর্নামেন্টটি নিজেই তার আকাশচুম্বী খরচ আর মাঠের বাইরের নোংরা রাজনীতির বেড়াজালে পিষ্ট হয়ে ভেঙে পড়বে। মঞ্চ প্রস্তুত, ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকাদের আলো ছড়ানোর সময় সমাগত। তবে এই আসর একই সাথে এটিও দেখিয়ে দেবে যে, ফুটবলের এই অতি-সম্প্রসারণ এবং আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতিকে খেলার দুনিয়া ও এর কোটি কোটি ভক্তরা শেষ পর্যন্ত কতটা মেনে নিতে প্রস্তুত।
আরএ/এসটি


















