বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ঢাকা

ফুটবল ইতিহাসে কলঙ্কিত বিশ্বকাপ জয়ী দল আর্জেন্টিনা

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০ জুন ২০২৬, ০৭:৫২ পিএম

শেয়ার করুন:

ফুটবল ইতিহাসে কলঙ্কিত বিশ্বকাপ জয়ী দল আর্জেন্টিনা

আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। এরপরই পর্দা উঠছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মহাযজ্ঞ, ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর। এবার প্রথমবারের মতো যৌথভাবে তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর আয়োজন করছে বিশ্বকাপের আসর। ১৯৩০ সালে যাত্রা শুরু করা এই টুর্নামেন্ট ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ এই পথচলায় বিশ্বকাপ যেমন উপহার দিয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত, তেমনি কিছু আসর স্থান করে নিয়েছে বিতর্ক, রাজনৈতিক প্রভাব ও নানা প্রশ্নের কারণে। সেই তালিকায় অন্যতম আলোচিত বিশ্বকাপ হলো ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ। রোমাঞ্চ, আবেগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নানা বিতর্কে ঘেরা সেই বিশ্বকাপের গল্প আজও ফুটবল ইতিহাসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।

বিশ্বকাপের ১১তম আসর


বিজ্ঞাপন


১৯৭৮ সালের ১ জুন থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত ২৪ দিনের ফুটবল উৎসব বসেছিল দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনাতে। এটি ছিল ফিফা বিশ্বকাপের ১১তম আসর। ফাইনালে নেদারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় স্বাগতিক আর্জেন্টিনা।

এই শিরোপার মাধ্যমে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জয়ী দেশের তালিকায় নতুন সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়। একই সঙ্গে তারা ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জয় করা পঞ্চম দেশ হিসেবে ইতিহাস গড়ে। এর আগে উরগুয়ে, ইতালি, ইংল্যান্ড এবং জার্মানি নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছিল।

শেষ ১৬ দলের বিশ্বকাপ

১৯৭৮ বিশ্বকাপ ছিল ১৬ দল নিয়ে আয়োজিত শেষ বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয় তুনাইসিয়া ও ইরান।


বিজ্ঞাপন


এরপর ১৯৮২ সাল থেকে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বেড়ে হয় ২৪। পরবর্তীতে তা ৩২ দলে উন্নীত হয় এবং বর্তমানে ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে রেকর্ড ৪৮টি দল। ফলে ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপকে অনেকেই একটি যুগের সমাপ্তি হিসেবেও দেখেন।

বাছাইপর্বেই বিদায় বেশ কয়েকটি শক্তিশালী দল

এই বিশ্বকাপের বাছাইপর্বও ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। শক্তিশালী ফুটবল জাতি ইংল্যান্ড ইতালির কাছে হেরে বিশ্বকাপে উঠতে পারেনি। একইভাবে বেলজিয়াম বাদ পড়ে নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে। শুধু তাই নয়, ১৯৭৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন চেক প্রজাতন্ত্রও বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়। পাশাপাশি যুগোস্লাভিয়া, বুলগেরিয়া এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন-এর মতো দলও টিকিট পায়নি মূল পর্বে।

আয়োজনের শুরু থেকেই বিতর্ক

১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপকে ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত বিশ্বকাপ বলা হয়। কারণ মাঠের খেলার বাইরেও পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। সাধারণত বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ অনেক বছর আগেই নির্ধারিত হয়। ১৯৭৮ বিশ্বকাপের আয়োজনের দায়িত্বও আগেভাগেই পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু ১৯৭৬ সালে দেশটিতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং ক্ষমতায় আসে সামরিক জান্তা সরকার।

এরপর শুরু হয় রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, হত্যা, গুম এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য অভিযোগ। বিরোধী মতের হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যমতে, সামরিক শাসনামলে হাজারো মানুষ গুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি ওঠে। বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশ বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানায়। তবে এত বড় টুর্নামেন্ট স্থানান্তর করা সম্ভব না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাতেই অনুষ্ঠিত হয়।

ক্রুইফ ও ব্রিটনারের বয়কট

বিশ্বকাপে সব দল অংশ নিলেও অংশ নেননি ডাচ কিংবদন্তি জোহান ক্রুইফ এবং জার্মান তারকা ডিফেন্ডার পল ব্রেইটনার। আনুষ্ঠানিকভাবে পারিবারিক কারণ দেখানো হলেও ক্রুইফের ঘনিষ্ঠ অনেকের মতে, সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবেই তিনি বিশ্বকাপে অংশ নেননি। ফলে বিশ্বসেরা ফুটবলারদের একজনকে ছাড়াই মাঠে নামে নেদারল্যান্ডস।

আয়োজক কমিটির প্রধান হত্যার অভিযোগ

টুর্নামেন্ট শুরুর কিছুদিন আগে আয়োজক কমিটির প্রধানকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, বিশ্বকাপ আয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়ের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ায় তিনি সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন। ফলে অনেক বিশ্লেষক ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপকে তুলনা করেছেন ১৯৩৬ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক এবং ১৯৩৪ ফিফা বিশ্বকাপ-এর সঙ্গে, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রীড়া আসরকে প্রভাবিত করার অভিযোগে সমালোচিত হয়েছিল।

পেরু ম্যাচ নিয়ে বিতর্ক

এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত বিতর্কগুলোর একটি ছিল আর্জেন্টিনা ও পেরুর ম্যাচ। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন সাময়িকীতে অভিযোগ ওঠে, আর্জেন্টিনার কারাগারে আটক ১৩ জন পেরুভিয়ান নাগরিককে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে ম্যাচের ফলাফল প্রভাবিত করা হয়েছিল। এমনকি পেরুর বিদেশি অর্থ নিয়ে গোপন সমঝোতার কথাও আলোচনায় আসে। তবে এসব অভিযোগের কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ কখনোই সামনে আসেনি। ফলে বিষয়টি ইতিহাসের অন্যতম বড় বিতর্ক হিসেবেই থেকে গেছে।

ম্যারাডোনাকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত

আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় ছিল ১৭ বছর বয়সী উঠতি তারকা দিয়াগো ম্যারাডোনাকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে না রাখা। তৎকালীন কোচের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। অনেকেই মনে করেছিলেন, ভবিষ্যতের সুপারস্টারকে সুযোগ না দিয়ে আর্জেন্টিনা বড় ঝুঁকি নিয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতে সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব মাঠে পড়েনি।

ফাইনাল ঘিরেও প্রশ্ন

বিতর্ক শেষ হয়নি ফাইনালেও। ফাইনালে নেদারল্যান্ডস দলকে স্টেডিয়ামে আনার সময় তাদের দীর্ঘ পথ ঘুরিয়ে আনা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। যখন ডাচ ফুটবলাররা মাঠে প্রবেশ করেন, তখনও আর্জেন্টিনা দল ড্রেসিংরুমে অবস্থান করছিল। এর ফলে বুয়েনস আয়ার্সের প্রায় ৭০ হাজার দর্শকের সামনে একপ্রকার একা পড়ে যায় নেদারল্যান্ডস। দর্শকদের লাগাতার হুইসেল, দুয়ো এবং শোরগোলের মধ্যে মানসিক চাপ নিয়ে মাঠে নামতে হয় তাদের। লাতিন আমেরিকার ফুটবল সংস্কৃতিতে সমর্থকদের আবেগ বরাবরই প্রবল। তবে সমালোচকদের মতে, এমন পরিবেশ তৈরি করা ছিল স্বাগতিকদের জন্য বাড়তি সুবিধা আদায়ের একটি কৌশল।

ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়

১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয় নিঃসন্দেহে দেশটির ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। কিন্তু একই সঙ্গে এই আসরকে ঘিরে থাকা রাজনৈতিক বিতর্ক, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, পেরু ম্যাচ নিয়ে প্রশ্ন এবং ফাইনালকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া নানা আলোচনা একে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত আসরে পরিণত করেছে।

ফুটবলপ্রেমীরা আজও সেই বিশ্বকাপকে স্মরণ করেন দুই ভিন্ন কারণে, একদিকে আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বজয়ের আনন্দ, অন্যদিকে বিতর্ক ও অভিযোগে ঘেরা এক অন্ধকার অধ্যায়ের জন্য। বিশ্বকাপ ২০২৬-এর নতুন যাত্রার প্রাক্কালে তাই ফিরে দেখা যায় ১৯৭৮ সালের সেই বিশ্বকাপকে, যা শুধুমাত্র একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়; বরং খেলাধুলা, রাজনীতি এবং ইতিহাসের জটিল সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর