শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬, ঢাকা

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

ইউরো জয়ের ছন্দে দ্বিতীয় শিরোপার খোঁজে স্পেন

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬ জুন ২০২৬, ০২:১৫ পিএম

শেয়ার করুন:

ইউরো জয়ের ছন্দে দ্বিতীয় শিরোপার খোঁজে স্পেন

ইউরো ২০২৪-এর মঞ্চে প্রতিপক্ষদের স্রেফ উড়িয়ে দিয়ে রেকর্ড চতুর্থবারের মতো ইউরোপসেরা হয়েছিল স্পেন। লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেনের সেই চেনা মাঝমাঠের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ ও পাসিং ফুটবলের সাথে যুক্ত হয়েছিল দুই তরুণ উইঙ্গার- লামিন ইয়ামাল এবং নিকো উইলিয়ামসের গতিশীল ও আক্রমণাত্মক ফুটবল।

কিন্তু ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে স্পেনের সেই চেনা আক্রমণভাগ কিছুটা অনিশ্চয়তার মুখে। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে এই দুই তারকার খেলা নিয়েই তৈরি হয়েছে সংশয়। যদি তারা শুরুর দিকে খেলতে না পারেন, তবে স্পেনের আক্রমণে সেই চিরচেনা বৈচিত্র্য ও 'এক্স-ফ্যাক্টর'-এর অভাব দেখা যেতে পারে।


বিজ্ঞাপন


তবে কেপ ভার্দে এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথম দুটি ম্যাচে স্পেনকে খুব একটা বেগ পেতে হবে না, তাই শুরুতেই এই দুই তারকাকে নিয়ে বাড়তি ঝুঁকি নেওয়ার কোনো প্রয়োজন দেখছেন না কোচ। দে লা ফুয়েন্তে তার ৪-৩-৩ এবং ৪-২-৩-১ ফর্মেশনের ওপর ভরসা রাখছেন, যেখানে উইঙ্গারদের অনুপস্থিতি পুষিয়ে দিতে প্রস্তুত ইউরোর অন্যতম নায়ক দানি ওলমো।

আরও পড়ুন- হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের অভিযানে কত দূর যেতে পারবে জার্মানি?

আরও পড়ুন- ‘ই’ গ্রুপে জার্মানির ঘুরে দাঁড়ানোর মিশন, আছে চ্যালেঞ্জও

স্পেনের শক্তির জায়গা
স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো তাদের মাঝমাঠের গভীরতা এবং গোলপোস্টের নিচে বিশ্বমানের গোলরক্ষকদের প্রাচুর্য। পাশাপাশি, ১৬ বছর বয়সেই ইউরো কাঁপানো বার্সেলোনার বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল এখন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম বড় সুপারস্টার, যা দলের জন্য মস্ত বড় শক্তি। আক্রমণভাগে ফলস-নাইন বা 'ডিপ-লায়িং' ফরোয়ার্ড হিসেবে রিয়াল সোসিয়েদাদের মিকেল ওয়ারজাবাল গোল করার ক্ষেত্রে দারুণ ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছেন। দলে আছেন রদ্রির মত সৃজনশীল মিডফিল্ডার। এছাড়া বিশ্বকাপের নতুন সিডিং পদ্ধতির কারণে কাগজে-কলমে সেমিফাইনাল পর্যন্ত স্পেনের পথটা কিছুটা সহজ হতে পারে।


বিজ্ঞাপন


gettyimages-2218118646

স্পেনের দুর্বলতার জায়গা
এই মুহূর্তে স্পেনের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা তাদের দুই ডানা তথা উইঙ্গারদের ফিটনেস। বিশেষ করে নিকো উইলিয়ামসকে নিয়ে উদ্বেগ বেশি; মে মাসে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়ার আগে পুরো মরশুম জুড়েই তিনি কুঁচকির সমস্যায় ভুগেছেন। এছাড়া রক্ষণভাগে বার্সেলোনার ১৯ বছর বয়সী তরুণ ডিফেন্ডার পাউ কুবারসি অসাধারণ প্রতিভাবান হলেও, বিশ্বকাপের মতো মেগা টুর্নামেন্টে শুরুর একাদশে খেলার মতো প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা তাঁর এখনও হয়নি।

নজর থাকবে যাদের ওপর
মিকেল ওয়ারজাবাল (২৯ বছর): ইউরো ২০২৪-এর ফাইনালে বদলি হিসেবে নেমে জয়সূচক গোল করেছিলেন রিয়াল সোসিয়েদাদের এই ফরোয়ার্ড। এরপর থেকে তিনি স্পেনের নিয়মিত স্টার্টার। বুদ্ধিদীপ্ত মুভমেন্ট এবং সতীর্থদের সাথে লিংক-আপ প্লে-র জন্য পরিচিত ওয়ারজাবাল বাছাইপর্বে স্পেনের হয়ে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ৬টি গোল করেছেন।

eb227d5361303574b02f40c9695c8ec9

লামিন ইয়ামাল (১৮ বছর): ইউরোর ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে গোল করার পর এবার তার সামনে বিশ্বকাপের রেকর্ড গড়ার সুযোগ। ফুটবল ইতিহাসে মাত্র ৭ জন ফুটবলার ১৯ বছর বয়সের আগে বিশ্বকাপে গোল করতে পেরেছেন; ইয়ামাল এবার সেই তালিকায় নাম লেখাতে মরিয়া। ইনজুরিতে পড়ার আগে বার্সেলোনার হয়ে এই মরশুমে ৪৫ ম্যাচে ২৪টি গোল ও ১৭টি অ্যাসিস্ট করে তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য ফর্মে।

ফাবিয়ান রুইস (৩০ বছর): পিএসজি-র এই মিডফিল্ডার ইউরো জয়ের অন্যতম নেপথ্য কারিগর ছিলেন। নিখুঁত পাসিংয়ের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য। গত ইউরোতে প্রতিপক্ষের ফাইনাল থার্ডে তিনি ১৪ বার বলের দখল নিয়েছেন, যা টুর্নামেন্টের অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে দ্বিগুণ!

1720447204350_2a481108-f9f4-4c75-a834-6b0a2a956738

মাস্টারমাইন্ড ডাগআউট: লিস দে লা ফুয়েন্তে
২০১৩ সাল থেকেই স্পেনের ফুটবল কাঠামোর সাথে যুক্ত আছেন ৬৪ বছর বয়সী লুইস দে লা ফুয়েন্তে। স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২১ দলকে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন বানানোর পর, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে লুইস এনরিকের বিদায়ের পর তিনি সিনিয়র দলের দায়িত্ব নেন। খেলোয়াড়দের জন্য ড্রেসিংরুমে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা এবং টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা দেখানোর জন্য স্প্যানিশ মিডিয়ায় তিনি দারুণ প্রশংসিত। গত বছরই তিনি ২০২৮ ইউরো পর্যন্ত স্পেনের সাথে নতুন চুক্তি সই করেছেন।

যেভাবে কোয়ালিফাই করলো স্পেন
বাছাইপর্বে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে স্পেন। প্রথম ৫ ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে কোনো গোল না খেয়েই তারা ১৯টি গোল দেয়। তবে বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে তুরস্কের সাথে ২-২ গোলে ড্র করে পয়েন্ট হারিয়েছিল লা রোজারা।

world-cup-winners-spain_3047424

তবে... 
ইউরো ২০২৪-এ স্পেন যেভাবে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, তা ছিল এককথায় অনন্য। তারা টুর্নামেন্টে ৭টি ম্যাচ জিতেছিল (যা একক ইউরোতে যেকোনো দলের জন্য রেকর্ড) এবং সর্বোচ্চ ১৫টি গোল করার পাশাপাশি তাদের ১০ জন ভিন্ন ভিন্ন খেলোয়াড় গোলের খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন।

কিন্তু ইতিহাস বলছে, ইউরো চ্যাম্পিয়নদের জন্য পরবর্তী বিশ্বকাপ জেতাটা এক অলিখিত অভিশাপ! ফুটবলের ইতিহাসে মাত্র দুটি দল ইউরো জেতার দুই বছর পর বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরতে পেরেছিল- ১৯৭২ ও ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি এবং ২০০৮ ও ২০১০ সালের স্বাগতিক স্পেন। এমনকি ১৯৯০ বিশ্বকাপের পর থেকে বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়নরা পরবর্তী বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে মাত্র একটির বেশি ম্যাচ জিততে পেরেছে, এমন নজির আছে মাত্র দুটি!

২০১০ সালের সেই বিশ্বকাপজয়ী দলের সাথে বর্তমান স্প্যানিশ স্কোয়াডের একটি বড় অমিল রয়েছে। ১৬ বছর আগে জোহানেসবার্গের ফাইনালে স্পেনের শুরুর একাদশের সব খেলোয়াড়ই (মাত্র একজন বাদে) খেলতেন রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা বার্সেলোনায়। অথচ ২০২৪ ইউরো ফাইনালের শুরুর একাদশের খেলোয়াড়রা প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন ১০টি ভিন্ন ভিন্ন ক্লাবের!

আরও আশ্চর্যের বিষয়, এবারের বিশ্বকাপের স্প্যানিশ স্কোয়াডে রিয়াল মাদ্রিদের কোনো খেলোয়াড় নেই, যা স্পেনের বিশ্বকাপ ইতিহাসে এবারই প্রথম। তবে কোচ দে লা ফুয়েন্তে ক্লাব বা পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে ভাবেন না, তার স্পষ্ট কথা: "খেলোয়াড় কোন ক্লাবের সেটা আমার কাছে বড় নয়, বড় হলো সে দলের জন্য কতটা দরকারী।"

বিশ্বকাপে স্পেনের অতীত ইতিহাস: 

২০১০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল জয়ের পর থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে স্পেনের কোনো জয়ের রেকর্ড নেই। গত তিনটি বিশ্বকাপে ১১টি ম্যাচ খেলে তারা জিতেছে মাত্র ৩টিতে। এবার কি পারবে দে লা ফুয়েন্তের তরুণ আর্মাডা সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে স্পেনের জার্সিতে দ্বিতীয় তারকা যুক্ত করতে?

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর