সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ঢাকা

রোমাঞ্চ ছেড়ে বাস্তবতার পথে ব্রাজিল: বয়স্ক দল নিয়ে এক অন্য ‘সেলেসাও’

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮ জুন ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম

শেয়ার করুন:

রোমাঞ্চ ছেড়ে বাস্তবতার পথে ব্রাজিল: বয়স্ক দল নিয়ে এক অন্য 'সেলেসাও'

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণার পর ফুটবল মহলে আলোচনা সাধারণত নেইমারের প্রত্যাবর্তন কিংবা ভিনিসিয়াস জুনিয়রের সুপারস্টার হয়ে ওঠা নিয়েই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এবার সবার চোখ আটকে গেছে খেলোয়াড়দের জন্মসালের কলামে।

২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দল পা রাখছে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক স্কোয়াড নিয়ে! কোচ কার্লো আঞ্চেলত্তির বেছে নেওয়া ২৩ সদস্যের দলের গড় বয়স ২৯ বছর ৬ মাস। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে দুঙ্গার সেই অভিজ্ঞ স্কোয়াডের গড় বয়সকেও ছাড়িয়ে গেছে এই দল। যে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল সংস্কৃতি ঐতিহ্যগতভাবেই তরুণদের চপলতা, নির্ভীকতা আর মাঠে তাৎক্ষণিক জাদুরজয়গান গেয়ে এসেছে, সেখানে আনচেলত্তির এই সিদ্ধান্ত বেশ চমকপ্রদ।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন- হেক্সা জয়ে গ্রুপ থেকে ফাইনাল পর্যন্ত যেমন হতে পারে ব্রাজিলের রোডম্যাপ

আরও পড়ুন- ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার যেমন হতে পারে ফাইনাল খেলার রোডম্যাপ

তবে বয়স কেবল মুদ্রার একটা পিঠ। একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে আরেকটি প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে উঠবে- ২০০২ বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারের ব্রাজিল দলটি শারীরিক গঠনে সবচেয়ে লম্বা, শক্তিশালী এবং ঘরোয়া লিগের খেলোয়াড়দের উপস্থিতিতে ভরপুর। সব মিলিয়ে এটা পরিষ্কার যে, আনচেলত্তির হাত ধরে তৈরি হওয়া এই ব্রাজিল দলটি মাঠের রোমান্টিকতা নয়, বরং নির্ভরযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। তারা এবার মাঠে নামছে এক নিখুঁত 'টুর্নামেন্ট মেশিন' হিসেবে।

brazil_round_js_20260607_132923628


বিজ্ঞাপন


স্কোয়াডের খুঁটিনাটি ও আঞ্চেলত্তির দর্শন

এই ২৩ জনের মধ্যে ১৫ জন খেলোয়াড়ই গত কাতার বিশ্বকাপের স্কোয়াডে ছিলেন। ৩৪ বছর বয়সে দলে ফিরেছেন নেইমার, যিনি গত এক বছর আনচেলত্তির পরিকল্পনায় প্রায় অনুপস্থিতই ছিলেন। অন্যদিকে ৩৮ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ওয়েভারটনকে দলে রাখা হয়েছে অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারী করতে (যার নাম ঘোষণার পর তিনি নাকি খুশিতে ক্ষণিকের জন্য জ্ঞান হারিয়েছিলেন!)।

আনচেলত্তির ভাবনার আরেকটি বড় ক্লু মেলে দলটির শারীরিক গঠনে। ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের গড় উচ্চতা প্রায় ১.৮২ মিটার (৬ ফুট), যা তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ। আধুনিক ফুটবল এখন শারীরিক শ্রেষ্ঠত্ব, দ্রুত প্রতি-আক্রমণ এবং সেট-পিস জয় করার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। শুধু পায়ের টেকনিক্যাল জাদু দিয়ে যে ব্রাজিল প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিত, সেই দিন এখন অতীত।

ঘরোয়া লিগের জোরালো হাওয়া

সবচেয়ে কৌতূহল উদ্দীপক বিষয় হলো, স্কোয়াডের প্রায় ৩০ শতাংশ অর্থাৎ ৭ জন খেলোয়াড়ই খেলছেন ব্রাজিলের ঘরোয়া লিগে। গত দুই দশকের মধ্যে এটাই ঘরোয়া লিগের খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ অনুপাত। ফ্ল্যামেঙ্গো, বোটাফোগো বা সান্তোসের মতো ক্লাবগুলোর আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ার কারণেই ইউরোপ মাতানো অনেক তারকাকে তারা দেশে ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। অবশ্য মূল মেরুদণ্ডটা এখনও ইউরোপীয়; প্রিমিয়ার লিগের ৮ জনসহ মোট ১৭ জন খেলছেন ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে। ফলে ইউরোপীয় ঘরানার নিখুঁত কৌশলের সাথে লাতিন ছন্দের এক দারুণ মিশেল দেখা যাবে এই দলে।

নেইমার বা ভিনিসিয়ুসকে হাইলাইট করা হলেও আঞ্চেলত্তির এই দল কোনো নির্দিষ্ট দুই তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়। রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে আনচেলত্তি সবসময়ই ম্যাচ-উইনার এবং ট্যাকটিক্যাল খেলোয়াড়দের মধ্যে এক দুর্দান্ত ভারসাম্য তৈরি করে এসেছেন, ব্রাজিলের স্কোয়াডেও তার প্রতিফলন স্পষ্ট।

AAA-NEY-VINIJR.jpg

মাঝমাঠের দখল ও ক্ষিপ্র আক্রমণ

আসন্ন টুর্নামেন্টে আনচেলত্তি হয়তো বল পজেশন ধরে রাখার চেয়ে অনেক বেশি ডিরেক্ট বা সরাসরি কাউন্টার-অ্যাটাকিং ফুটবল খেলাবেন। লক্ষ্য থাকবে একটাই- নিজেদের রক্ষণ জমাট রেখে বল কেড়ে নিয়েই ভিনিসিয়ুসের অতিমানবীয় গতিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের অগোছালো ডিফেন্সে হানা দেওয়া।

মাঝমাঠের চালিকাশক্তি (ব্রুনো গিমারেস): নিউক্যাসলের এই তারকা এখন ইউরোপের অন্যতম স্বয়ংসম্পূর্ণ মিডফিল্ডার। ম্যাচের টেম্পো নিয়ন্ত্রণ করা, বল ফরোয়ার্ড করা এবং বলের দখল ছাড়া পুরো মাঠ জুড়ে দৌড়ানোর সামর্থ্য তার রয়েছে। ভিনিসিয়ুস যদি প্রতিপক্ষের ভয়ের কারণ হন, তবে গিমারেস হলেন এই দলের সবচেয়ে অপরিহার্য ইঞ্জিন।

bruno-guimara-es

সৃজনশীলতার উৎস (লুকাস পাকেতা): গিমারেসের পাশে থেকে মাঝমাঠ ও আক্রমণের যোগসূত্র হিসেবে খেলবেন পাকেতা। তার পাসিং ও ড্রিবলিংয়ের অনিশ্চয়তা ব্রাজিলের আক্রমণকে বিপজ্জনক করে তুলবে।

ডিফেন্সে যথারীতি নেতৃত্ব দেবেন মারকুইনহোস। আর গোলপোস্টের নিচে থাকছেন লিভারপুলের বিশ্বস্ত দেয়াল অ্যালিসন বেকার। একসময় ব্রাজিলের গোলরক্ষকদের ফরোয়ার্ডদের ছায়ায় ঢাকা পড়ে থাকতে হতো, কিন্তু অ্যালিসন নিজেকে ইতিহাসের অন্যতম সেরাদের কাতারে নিয়ে গেছেন, যিনি নকআউট পর্বের ক্লোজ ম্যাচগুলো একাই জিতিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

যার ওপর থাকবে বাড়তি নজর: ১৯ বছরের রায়ান

স্কোয়াডের বয়স্ক প্রোফাইলের ঠিক বিপরীতে এক বিস্ময় ১৯ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড রায়ান। ভাস্কো দা গামার সাবেক এই ফুটবলার অত্যন্ত লম্বা, গতিশীল এবং নির্ভীক। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ভবিষ্যৎ ভাবা হচ্ছে তাকে। শুরুর একাদশে সুযোগ পাওয়া কঠিন হলেও, বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে বদলি হিসেবে নেমেও যে তিনি বিশ্বকে চমকে দিতে পারেন, সেই আভাস আনচেলত্তি দিয়ে রেখেছেন।

ব্রাজিলের ফুটবল মানেই ছিল সুন্দর ফুটবল বা 'জোগো বোনিতো'। কিন্তু টানা ২৪ বছর বিশ্বকাপের ট্রফি না পাওয়া এই দেশটি এবার ট্রফির খোঁজে সেই চিরচেনা রোমাঞ্চ বিসর্জন দিতেও রাজি। সুন্দর ফুটবলের চেয়ে ম্যাচের ওপর 'নিয়ন্ত্রণ' ও 'ফলাফল'কে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন আনচেলত্তি। এই কৌশল কি পারবে হেক্সা মিশন সফল করতে? 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর