২০০২ সালের সেই অবিস্মরণীয় রাতটি ফুটবল বিশ্ব কখনো ভুলবে না। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচেই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল সেনেগাল। শুধু তাই নয়, ডেনমার্ক এবং উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলকে পেছনে ফেলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা। এরপর শেষ ১৬-তে সুইডেনকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে তুরস্কের কাছে সামান্য ব্যবধানে হেরে থামে ‘তেরাঙ্গার সিংহ’দের সেই রূপকথা।
সেই ঘটনার প্রায় এক সিকি শতাব্দী পর সেনেগাল এবার এসেছে তাদের টানা তৃতীয় বিশ্বকাপে। কাগজে-কলমে অফিশিয়াল তকমা না থাকলেও, অনেকেই তাদের এই মুহূর্তে আফ্রিকার সেরা এবং এবারের বিশ্বকাপের ট্রফি জয়ের অন্যতম ‘ডার্ক হর্স’ মনে করছেন।
বিজ্ঞাপন
বাছাইপর্বে অপরাজিত থাকা সেনেগাল গত জুনে ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে- তারাই প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে ‘থ্রি লায়ন্স’দের হারিয়েছে। সাম্প্রতিক আফকন ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে পেনাল্টি বিতর্কের জেরে সাময়িকভাবে মাঠ ছেড়ে যাওয়ার ঘটনাটি বাদ দিলে, দলটির ব্যক্তিগত প্রতিভা এবং দলীয় শক্তির গভীরতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
সেই গভীরতা ও সামর্থ্যের মিশেল নিয়েই এবারের বিশ্বকাপ আসরে সোনালি স্বপ্নের খোঁজে সেনেগাল। চলতি মাসের শুরুতে ২৮ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষণার সময় কোচ পাপে থিয়াও বলেন, "আমাদের বড় স্বপ্ন আছে এবং আমরা দারুণ কিছু অর্জন করতে চাই।"
সাদিও মানের ‘লাস্ট ড্যান্স’
বিজ্ঞাপন
৩৪ বছর বয়সী অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড এবং অধিনায়ক সাদিও মানের এটাই শেষ বিশ্বকাপ। এই টুর্নামেন্টের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। বয়স হয়তো তার সেই আগের অতিমানবীয় গতি কিছুটা কেড়ে নিয়েছে, তবে তার বিশ্বমানের টাচ, দূরদর্শিতা, অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এখনো অনন্য।
গত জানুয়ারিতে সেনেগালকে আফকনের ফাইনালে তোলার মূল কারিগর ছিলেন মানে। সেমিফাইনালে মিশরের বিপক্ষে তার করা অসাধারণ গোলেই ১-০ ব্যবধানে জিতেছিল দল। ফাইনালে যখন বিতর্কিত পেনাল্টির প্রতিবাদে কোচ ও সতীর্থরা মাঠ ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন, তখন মানে নিজেকে সংযত রাখেন। তিনি মাঠে থেকে খেলা শেষ করার জন্য সতীর্থদের ডেকে ফিরিয়ে আনেন, যা বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ায়।
সৌদি ক্লাব আল-নাসরে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পাশে খেলে এই মৌসুমে ১০টি গোল ও ৬টি অ্যাসিস্ট করেছেন মানে। সংখ্যাটা তার নামের পাশে কিছুটা সাদামাটা হলেও, আল-নাসরকে লিগ শিরোপা জেতাতে তার ভূমিকা ছিল দারুণ।
ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে থাকার সময় ইনজুরির কারণে গত বিশ্বকাপটি মিস করেছিলেন মানে। তাই এবার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা রাঙাতে তিনি মরিয়া। দেশের হয়ে ১২৬ ম্যাচে ৫৩ গোল করা এই অল-টাইম টপ স্কোরার চাইবেন নিজের ঝুলিতে আরও কিছু গোল যোগ করতে।
কোচ থিয়াও-এর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন
২০২৪ সালের শেষের দিকে দীর্ঘদিনের কোচ আলিউ সিসেকে সরিয়ে পাপে থিয়াওকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার অধীনে দল অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করেছে, ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে এবং আফকন শিরোপাও জিতেছে।
তবে আফকন ফাইনালে মরক্কো যখন শেষ মুহূর্তে বিতর্কিত পেনাল্টি পায়, তখন খেলোয়াড়দের মাঠ ছেড়ে আসার নির্দেশ দিয়ে থিয়াও নিজের অপরিপক্বতার পরিচয় দেন। যদিও ইব্রাহিম দিয়াজ সেই পেনাল্টি মিস করেন এবং অতিরিক্ত সময়ে সেনেগাল জিতে যায়, কিন্তু এই বিশৃঙ্খলার কারণে আফ্রিকান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন সেনেগালের চ্যাম্পিয়ন্স খেতাব কেড়ে নেয়। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে থিয়াও কতটা মাথা ঠান্ডা রাখতে পারেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তারকায় ঠাসা স্কোয়াড
ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলো যারা নিয়মিত অনুসরণ করেন, তাদের কাছে সেনেগালের স্কোয়াড বেশ পরিচিত। তারকাদের মধ্যে পরিচিত মুখ-
নিকোলাস জ্যাকসন: চেলসি থেকে ধারে বায়ার্ন মিউনিখে খেলা এই স্ট্রাইকার শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গতিশীল। ফিনিশিংয়ে মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেললেও গোল করার পজিশনে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি দারুণ।

ইসমাইলা সার: ক্রিস্টাল প্যালেসের হয়ে এই উইঙ্গার দুর্দান্ত ফর্মে আছেন, দলটিকে এফএ কাপ ও ইউরোপা লিগ জেতাতে অবদান রেখেছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়েও তিনি বড় ভূমিকা রাখেন।
পাপে মাতার সার: টটেনহ্যামে এই মৌসুমটা ভালো না কাটলেও, মাঝমাঠের অল-রাউন্ডার হিসেবে তিনি অত্যন্ত ডাইনামিক।
অন্যান্য তারকা: মাঝমাঠে সান্ডারল্যান্ডের তরুণ তুর্কি হাবিব দিয়ারা, অভিজ্ঞ ইদ্রিসা গানা গেয়ি ও লামিন কামারা এবং উইংয়ে এভারটনের ইলিমান এনদিয়ায়ে দলের বড় ভরসা। রক্ষণভাগে শান্ত ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব দিতে আছেন চেলসি ও নাপোলির সাবেক ৩৫ বছর বয়সী তারকা কালিদু কুলিবালি।
এছাড়াও স্কোয়াডে আছেন বায়ার্নের ১৮ বছর বয়সী মিডফিল্ডার বারা এনদিয়ায়ে এবং পিএসজির ইব্রাহিম এমবায়ে। দলটির একমাত্র দুর্বলতা হতে পারে মূল তারকাদের বয়স এবং ক্রিয়েটিভ খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতার অভাব। এছাড়া তারা পড়েছেন এবারের আসরের অন্যতম কঠিন গ্রুপে।
কেমন হলো সেনেগালের গ্রুপ?
গ্রুপ 'আই'-তে সেনেগালের সঙ্গী ফ্রান্স, নরওয়ে এবং ইরাক।
২০০২ সালের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করার লক্ষ্য নিয়ে সেনেগাল তাদের প্রথম ম্যাচেই মুখোমুখি হবে ফ্রান্সের। ফরাসীরা নিশ্চয়ই এবার আর এই আফ্রিকান শক্তিকে হালকাভাবে নেবে না। দ্বিতীয় ম্যাচে তাদের লড়তে হবে নরওয়ের ‘গোলমেশিন’ আর্লিং হালান্ডদের বিরুদ্ধে। তবে বাছাইপর্বে সেনেগালের রক্ষণভাগ যেভাবে দেয়াল তুলে দিয়েছিল, তা কুলিবালিদের আত্মবিশ্বাস জোগাবে। আর শেষ ম্যাচে মহাদেশীয় প্লে-অফ খেলে আসা ইরাককে সহজেই হারাতে পারবে বলে বিশ্বাস করে সেনেগাল।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল মরক্কো। আফ্রিকার এই দলটি সেমি-ফাইনালে ওঠে চমকে দিয়েছিল বিশ্বকে। অসাধারণ এই সাফল্যের পথে দলটি হারিয়েছিল বেলজিয়াম, পর্তুগালের মত তারকায় ঠাঁসা দলকে, রুখে দিয়েছিল স্পেনকেও। এবারও মরক্কোর পক্ষে বাজি ধরছেন অনেকেই। একই সঙ্গে অনেকেই ভাবছেন, সেনেগালও এবারের আসরে এমনই রূপকথার জন্ম দিতে পারে।
বিশ্বকাপে সেনেগালের গ্রুপ পর্বের সময়সূচি (বাংলাদেশ সময়):
১৬ জুন: ফ্রান্স বনাম সেনেগাল (নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র) – রাত ১:০০ টা (১৭ জুন রাত)
২২ জুন: নরওয়ে বনাম সেনেগাল (নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র) – ভোর ৬:০০ টা (২৩ জুন সকাল)
২৬ জুন: সেনেগাল বনাম ইরাক (টরোন্টো, কানাডা) – রাত ১:০০ টা (২৭ জুন রাত)
এক নজরে সেনেগালের বিশ্বকাপ স্কোয়াড:
গোলরক্ষক: এদুয়ার্দ মেন্ডি, মোরি দিয়াও, ইয়েভান দিউফ।
ডিফেন্ডার: কালিদু কুলিবালি, আবদুলায়ে সেক, মুসা নিয়াখাতে, ইসমাইল জ্যাকবস, মামাদু সার, অ্যান্টোইন মেন্ডি, ইলায় কামারা, এল হাদজি মালিক দিউফ, ক্রেপিন দিয়াত্তা, মুস্তাফা ম্বো।
মিডফিল্ডার: ইদ্রিসা গানা গেয়ি, পাপে মাতার সার, পাথে সিস, পাপে গেয়ি, লামিন কামারা, হাবিব দিয়ারা, বারা সাপোকো এনদিয়ায়ে।
ফরওয়ার্ড: সাদিও মানে, বাম্বা ডিয়েং, নিকোলাস জ্যাকসন, ইলিমান এনদিয়ায়ে, ইসমাইলা সার, শেরিফ এনদিয়ায়ে, শেখ সাবালি, ইব্রাহিম এমবায়ে, আসানে দিয়াও।
আরএ



































































































