বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ঢাকা

দ্য মিরাকেল অফ বার্ন

জুতা তৈরির এক প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিয়েছিল বিশ্বকাপের ইতিহাস

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪ জুন ২০২৬, ০৪:২০ পিএম

শেয়ার করুন:

জুতা তৈরির এক প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিয়েছিল বিশ্বকাপের ইতিহাস

সামনেই ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। বিশ্ব ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ আছে, যা কেবল মাঠের কৌশলে নয়, বরং প্রযুক্তির এক নীরব বিপ্লবে ভাগ্য নির্ধারিত করে দিয়েছিল। ফুটবলারদের পায়ের জাদু তো বটেই, কিন্তু কখনো কি শুনেছেন এক জোড়া জুতো বদলে দিয়েছে গোটা বিশ্বকাপের ইতিহাস? ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে ঘটেছিল ফুটবল ইতিহাসের এমনই এক রূপকথা, যা আজ বিশ্বজুড়ে 'দ্য মিরাকেল অফ বার্ন' বা 'বার্নের অলৌকিক ঘটনা' নামে পরিচিত।

১৯৫৪ সালের ৪ জুলাই, বার্নের ওয়াঙ্কডর্ফ স্টেডিয়ামে ফুটবল বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও অবিশ্বাস্য অঘটনগুলোর একটি।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন- শিরোপা দৌড়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের অবস্থান জানাল সুপারকম্পিউটার

আরও পড়ুন- স্বর্ণপদকধারী সাঁতারু, এবার ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে লড়বেন স্পেনের হয়ে

ম্যাচ শুরুর আগে ফাইনালের ফলাফল যেন সবার জানাই ছিল। সেই সময়ের হাঙ্গেরি দলটিকে বলা হতো 'ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স'। কিংবদন্তি ফেরেঙ্ক পুসকাসের নেতৃত্বে হাঙ্গেরি টানা চার বছর ধরে কোনো ম্যাচ হারেনি (টানা ৩১ ম্যাচ অপরাজেয়)। এই বিশ্বকাপেরই গ্রুপ পর্বে তারা পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত করেছিল।

ফাইনালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ম্যাচ শুরুর মাত্র ৮ মিনিটের মাথায় পুসকাস এবং সিবোরের গোলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় হাঙ্গেরি। সবাই যখন ধরে নিয়েছে জার্মানি আবার এক হালি গোল খেতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে ২-২ সমতা ফেরায় জার্মানি। এরপর শুরু হয় আসল নাটক, যার নেপথ্য নায়ক ছিলেন মাঠের বাইরের একজন মানুষ।


বিজ্ঞাপন


52870909_1006

দৃশ্যপটে আডিডাসের প্রতিষ্ঠাতা ও এক বৈপ্লবিক প্রযুক্তি
প্রথমার্ধ যখন ২-২ সমতায় শেষ হলো, তখন বার্নের আকাশে জমল কালো মেঘ। শুরু হলো প্রচণ্ড বৃষ্টি। আর এই বৃষ্টিই ছিল পশ্চিম জার্মানির জন্য এক আশীর্বাদ।

জার্মানি দলের সাথে কিট ম্যানেজার হিসেবে সুইজারল্যান্ডে এসেছিলেন অ্যাডলফ ড্যাসলার- যিনি বিশ্ববিখ্যাত স্পোর্টস ব্র্যান্ড 'আডিডাস' এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি জার্মানি দলের জন্য একদম নতুন ও গোপন একটি প্রযুক্তি তৈরি করে এনেছিলেন, যার নাম 'স্ক্রু-ইন স্টাডস'।

তৎকালীন সময়ে ফুটবলাররা যে বুট জুতো পরতেন, সেগুলোর নিচের স্টাড (ছিপি) জুতোর সাথে স্থায়ীভাবে চামড়া বা কাঠ দিয়ে জোড়া থাকত। ফলে কাদা মাঠে সেই জুতো পরে পিছলে পড়ে যাওয়া ছিল সাধারণ ঘটনা। কিন্তু অ্যাডলফ ড্যাসলারের আবিষ্কৃত বুটের নিচের স্টাডগুলো স্ক্রু-র মতো ঘুরিয়ে খুলে ফেলা যেত এবং মাঠের অবস্থা বুঝে ছোট বা বড় সাইজের স্টাড লাগানো যেত।

"প্রথমার্ধের পর যখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো, আদি ড্যাসলার দ্রুত ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের বুটের স্টাডগুলো বদলে দীর্ঘ ও ধারালো স্টাড লাগিয়ে দিলেন। ওটাই ছিল আমাদের আসল অস্ত্র" — পরবর্তীতে বলেন পশ্চিম জার্মানির অধিনায়ক ফ্রিটজ ওয়াল্টার।

skysports-world-cup_4319216

দ্বিতীয়ার্ধে বৃষ্টি যত বাড়ল, মাঠ ততটাই কর্দমাক্ত আর পিছল হয়ে উঠল। হাঙ্গেরির খেলোয়াড়রা তাদের ঐতিহ্যবাহী ভারী জুতো পরে ভেজা মাঠে বারবার পিছলে পড়তে লাগলেন, বলের নিয়ন্ত্রণ হারাতে লাগলেন। অন্যদিকে, আডিডাসের নতুন প্রযুক্তির জুতো পরে জার্মান খেলোয়াড়রা কাদা মাটিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চিতার গতিতে দৌড়াতে লাগলেন। ভেজা মাঠে তাদের গ্রিপ বা ভারসাম্য ছিল অসাধারণ।

ম্যাচের ৮৪তম মিনিটে হাঙ্গেরির ক্লান্ত ডিফেন্সের সুযোগ নিয়ে জার্মানির হেলমুট রান তাঁর বিখ্যাত শটে গোল করে জার্মানিকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই তৈরি হয় ইতিহাস। অপরাজেয় হাঙ্গেরিকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় পশ্চিম জার্মানি।

AP5407040111

এই জয়টি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ জয় ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ আর গ্লানি বয়ে বেড়ানো জার্মানির মানুষের কাছে এই জয়টি ছিল এক নতুন জীবন পাওয়ার মতো। অর্থনীতিবিদ ও ঐতিহাসিকদের মতে, 'মিরাকেল অফ বার্ন' যুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানির আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছিল এবং তাদের অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের অন্যতম মানসিক ভিত্তি ছিল এই জয়।

এক জোড়া জুতোর প্রযুক্তি কীভাবে একটি ফুটবল ম্যাচের ভাগ্য এবং একটি দেশের ইতিহাস বদলে দিতে পারে, ১৯৫৪ সালের সেই বৃষ্টিভেজা বিকেল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আর এই ম্যাচের পর থেকেই ফুটবল বিশ্বে শুরু হয় স্পোর্টস গিয়ার ও প্রযুক্তির এক নতুন যুগ, যার সূচনা করেছিলেন অ্যাডলফ ড্যাসলার।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর