বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ আবারও প্রস্তুত নতুন এক অধ্যায়ের জন্য। উত্তেজনা, প্রত্যাশা আর কোটি মানুষের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। এবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন দেশের যৌথ আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো গড়াচ্ছে এই মহাযজ্ঞ। রেকর্ড ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে বিশ্বকাপ পৌঁছে যাচ্ছে এক নতুন উচ্চতায়, যেখানে প্রতিটি ম্যাচই হয়ে উঠতে পারে অপ্রত্যাশিত গল্পের জন্মভূমি।
বিশ্বকাপ মানেই শুধু শিরোপার লড়াই নয়; এটি এমন এক মঞ্চ, যেখানে প্রতিটি আসরেই জন্ম নেয় নতুন বিস্ময়, নতুন বিতর্ক আর অবিশ্বাস্য সব অঘটন। শক্তির বিচারে এগিয়ে থাকা দলকে হারিয়ে দেয় অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোনো দেশ, আবার কখনো বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা হোঁচট খেয়ে বিদায় নেয় অকালেই। ফুটবলের ইতিহাসে তাই বিশ্বকাপকে বলা হয় অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় প্রতীক।
বিজ্ঞাপন
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্ট প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিশ্ব ফুটবলকে দিয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত। তবে তার মধ্যে কিছু ম্যাচ আজও বিশেষভাবে আলোচিত যেখানে ফলাফল শুধু একটি স্কোরলাইন নয়, বরং ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া একেকটি অধ্যায়। ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে জার্মানির ৭-১ গোলের বিধ্বংসী জয় যেমন ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, তেমনি আরও বহু ম্যাচ রয়েছে যা প্রমাণ করে বিশ্বকাপে কিছুই আগে থেকে লেখা থাকে না।
আসন্ন বিশ্বকাপের নতুন যাত্রা শুরুর প্রেক্ষাপটে ফিরে দেখা যাক এমনই কিছু অবিশ্বাস্য অঘটনের গল্প, যা আজও ফুটবল বিশ্বের স্মৃতিতে গেঁথে আছে বিস্ময় ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইংল্যান্ড, ১৯৫০ বিশ্বকাপ: ‘মিরাকল অন টার্ফ’
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনের তালিকা করলে এই ম্যাচটির নাম সবার ওপরে থাকবে। ১৯৫০ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ছিল অন্যতম ফেবারিট দল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে তখন খুব একটা গুরুত্বই দেওয়া হতো না। ম্যাচের আগে টানা সাত আন্তর্জাতিক ম্যাচে পরাজিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। গোল ব্যবধানের হিসাব করলে তা দাঁড়ায় ৪৫-২।
বিজ্ঞাপন

এমন অবস্থায় শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নেমে কেউই মার্কিনদের কোনো সম্ভাবনা দেখেনি। কিন্তু ফুটবল যে হিসাব-নিকাশ মানে না, সেটাই প্রমাণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ম্যাচের ৩৮ মিনিটে জো গাটজেনসের করা একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় যুক্তরাষ্ট্র। ফুটবল ইতিহাসে ম্যাচটি আজও ‘মিরাকল অন টার্ফ’ নামে পরিচিত।
উত্তর কোরিয়া বনাম ইতালি, ১৯৬৬ বিশ্বকাপ: এশিয়ার বিস্ময়
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিল উত্তর কোরিয়া। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম অংশগ্রহণেই ইতিহাস গড়ে দলটি। গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে হারের পর দ্বিতীয় ম্যাচে চিলির সঙ্গে ড্র করে তারা। ফলে নকআউটে যেতে হলে শেষ ম্যাচে শক্তিশালী ইতালির বিপক্ষে জয় ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। সেই অসম্ভব কাজটিই করে দেখায় উত্তর কোরিয়া।

একটি ঐতিহাসিক জয় দিয়ে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় করে দেয় এশিয়ার দেশটি। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় কোয়ার্টার ফাইনালেও জায়গা করে নেয় উত্তর কোরিয়া, যা এখনো পর্যন্ত বিশ্বকাপে তাদের সর্বোচ্চ অর্জন।
আলজেরিয়া বনাম পশ্চিম জার্মানি, ১৯৮২ বিশ্বকাপ: আফ্রিকার গর্জন
বিশ্বকাপে নতুন কোনো দলের অংশগ্রহণ মানেই চমকের সম্ভাবনা। ১৯৮২ সালে সেই চমক উপহার দিয়েছিল আলজেরিয়া। টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই তারা মুখোমুখি হয়েছিল তৎকালীন অন্যতম শক্তিশালী দল পশ্চিম জার্মানির। বিশ্বকাপ শুরুর আগে জার্মানরা ছিল শিরোপার অন্যতম দাবিদার। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সব হিসাব পাল্টে দেয় আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।

ম্যাচের ৫৪ মিনিটে রাবাহ মাদজারের গোলে এগিয়ে যায় আলজেরিয়া। এরপর ৬৭ মিনিটে কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগে সমতা ফেরালেও মাত্র এক মিনিট পর লখদার বেলোমির গোল আবারও এগিয়ে দেয় আলজেরিয়াকে। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দেয় আফ্রিকার দেশটি। যদিও প্রথম ম্যাচে হারলেও পশ্চিম জার্মানি পরে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
ক্যামেরুন বনাম আর্জেন্টিনা, ১৯৯০ বিশ্বকাপ: চ্যাম্পিয়নদের কাঁদানো শুরু
১৯৮৬ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ১৯৯০ আসরে খেলতে নেমেছিল আর্জেন্টিনা। দলে ছিলেন কিংবদন্তি দিয়াগো ম্যারাডোনা। অন্যদিকে ক্যামেরুন তখনো বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি নয়। বিশ্বকাপে তাদের অভিজ্ঞতাও ছিল সীমিত। তবুও উদ্বোধনী ম্যাচেই ঘটে যায় বিস্ময়। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭ মিনিটে ফ্রাঁসোয়া ওমান-বিয়িকের গোল আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দেয়। সেই একমাত্র গোলেই ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় ক্যামেরুন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি অন্যতম স্মরণীয় উদ্বোধনী ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত হয়।

জার্মানি বনাম ব্রাজিল, ২০১৪ বিশ্বকাপ: মিনেইরাওয়ের কান্না
ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ রয়েছে, যেগুলো কেবল একটি ফলাফল নয়, বরং একটি যুগের প্রতীক হয়ে যায়। ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ছিল তেমনই একটি ম্যাচ। নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলছিল ব্রাজিল। কোটি সমর্থকের স্বপ্ন ছিল ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের। কিন্তু সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে মাঠে নেমে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পরাজয়গুলোর একটির সাক্ষী হয় সেলেসাওরা।

প্রথমার্ধেই পাঁচ গোল হজম করে ব্রাজিল। পুরো ম্যাচ শেষে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৭-১। থমাস মুলার, মিরোস্লাভ ক্লোসা, টনি ক্রুস, সামি খেদিরাদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে স্বাগতিকরা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটিকে আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি বলে মনে করা হয়।
মেক্সিকো বনাম জার্মানি, ২০১৮ বিশ্বকাপ: চ্যাম্পিয়নদের পতনের সূচনা
২০১৪ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে রাশিয়া বিশ্বকাপে অংশ নেয় জার্মানি। শিরোপা ধরে রাখার অন্যতম দাবিদারও ছিল তারা। কিন্তু গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই তাদের প্রতিপক্ষ ছিল মেক্সিকো। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে মেক্সিকানরা। দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাকে বারবার সমস্যায় পড়ে জার্মান রক্ষণভাগ।

ম্যাচের ৩৪ মিনিটে হিরভিং ‘চাকি’ লোজানোর গোলে এগিয়ে যায় মেক্সিকো। এরপর বহু চেষ্টা করেও সমতা ফেরাতে পারেনি জার্মানি। ১-০ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ শুরু করে জোয়াকিম লোর শিষ্যরা। পরবর্তীতে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছেও ২-০ ব্যবধানে হেরে যায় জার্মানি। ফলে টানা দ্বিতীয়বারের মতো নয়, বরং প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ইতিহাসে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় তাদের।
২০২৬ বিশ্বকাপে কি অপেক্ষা করছে নতুন কোনো অঘটন?
বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, প্রতিটি আসরই জন্ম দিয়েছে নতুন কোনো বিস্ময়ের। ১৯৫০ সালে ইংল্যান্ডকে হারানো যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৬৬ সালে ইতালিকে বিদায় করা উত্তর কোরিয়া, ১৯৮২ সালে পশ্চিম জার্মানিকে হারানো আলজেরিয়া কিংবা ২০১৮ সালে জার্মানিকে কাঁদানো মেক্সিকো সব গল্পই প্রমাণ করে ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে রেকর্ড ৪৮টি দল। ফলে নতুন দেশ, নতুন মুখ এবং নতুন স্বপ্নের সঙ্গে বাড়ছে অঘটনের সম্ভাবনাও। কে জানে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হয়তো বিশ্বকাপ ইতিহাসে যোগ হতে যাচ্ছে আরও একটি অবিশ্বাস্য গল্প, যা বছরের পর বছর ধরে স্মরণ করবে ফুটবল বিশ্ব।


















