ক্যারিবীয় সাগরের ছোট্ট দ্বীপ কুরাসাও। আয়তন, জনসংখ্যা কিংবা অবকাঠামোর বিচারে বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিদের সঙ্গে তুলনা করলে দেশটি অনেকটাই ক্ষুদ্র। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করেছে কুরাসাও। সীমিত সম্পদ, ছোট জনসংখ্যা এবং দীর্ঘদিনের সংগ্রাম পেরিয়ে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে তারা। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তাই কুরাসাও এখন শুধুই একটি দ্বীপ নয়, বরং বড় স্বপ্ন দেখার প্রতীক।
ইতিহাস
কুরাসাওয়ের ফুটবল ইতিহাস মূলত নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলিস যুগের সঙ্গে জড়িয়ে। ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলিস ভেঙে যাওয়ার পর কুরাসাও পৃথক ফুটবল পরিচয় লাভ করে। এরপর দেশটির ফুটবল ফেডারেশন নতুনভাবে দল গঠনের কাজ শুরু করে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে শুরুটা সহজ ছিল না। র্যাঙ্কিংয়ের নিচের দিকে অবস্থান, সীমিত অবকাঠামো এবং অভিজ্ঞতার অভাব ছিল বড় বাধা।
তবে ধীরে ধীরে পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে কুরাসাও এগিয়ে যেতে থাকে। ইউরোপে বেড়ে ওঠা কুরাসাও বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করার কৌশল দলটির মান বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই ক্যারিবীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দলে পরিণত হয় তারা।
বিশ্বকাপের মূল পর্বে এখনো জায়গা করে নিতে না পারলেও বাছাইপর্বে ধারাবাহিক উন্নতি দেখিয়ে কুরাসাও প্রমাণ করেছে, ছোট দেশ হয়েও বড় স্বপ্ন দেখা যায়।
সীমিত অবকাঠামো, বড় স্বপ্ন
কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা মাত্র দেড় লাখের কিছু বেশি। ফলে খেলোয়াড় বাছাইয়ের ক্ষেত্রও স্বাভাবিকভাবেই সীমিত। দেশটির ফুটবল অবকাঠামোও ইউরোপ কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার বড় দেশগুলোর মতো নয়। আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বড় স্টেডিয়াম কিংবা বিশাল একাডেমি নেটওয়ার্কের ঘাটতি রয়েছে।
তবে এই সীমাবদ্ধতাকে দুর্বলতা হতে দেয়নি কুরাসাও। স্থানীয় প্রতিভা তৈরির পাশাপাশি নেদারল্যান্ডসে বসবাসকারী কুরাসাও বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিয়ে শক্তিশালী স্কোয়াড গঠনের পরিকল্পনা সফল হয়েছে। ইউরোপিয়ান ফুটবলের অভিজ্ঞতা এবং ক্যারিবীয় ফুটবলের স্বতঃস্ফূর্ততা মিলিয়ে দলটি ভিন্ন এক পরিচয় তৈরি করেছে।
শক্তির জায়গা
কুরাসাওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের শারীরিক সক্ষমতা এবং দ্রুতগতির আক্রমণ। দলটি সাধারণত কাউন্টার অ্যাটাকভিত্তিক ফুটবল খেলতে পছন্দ করে। মাঝমাঠে বল দখল ধরে রাখার পাশাপাশি উইং ব্যবহার করে দ্রুত আক্রমণে ওঠার দক্ষতা তাদের অন্যতম অস্ত্র।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দলটির আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। জাতীয় দলের অনেক ফুটবলার ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন। ফলে বড় ম্যাচের চাপ সামলানোর মানসিকতা তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কনকাকাফ অঞ্চলের শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার সামর্থ্য দেখিয়েছে কুরাসাও। এ কারণেই বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তাদেরকে আর সহজ প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হয় না।
নজর থাকবে যাদের ওপর
বিশ্বকাপে কুরাসাওর স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব অনেকটাই থাকবে কয়েকজন অভিজ্ঞ ও ইউরোপিয়ান ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়ের কাঁধে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম লিয়ান্দ্রো বাকুনা। ইংল্যান্ড ও ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলার অভিজ্ঞতা থাকা এই মিডফিল্ডার দলের অধিনায়ক এবং মাঝমাঠের প্রাণভোমরা। তার নেতৃত্ব, পাসিং এবং দূরপাল্লার শট কুরাসাওর বড় অস্ত্র।
মাঝমাঠে তার সঙ্গী হতে পারেন ছোট ভাই জুনিনহো বাকুনা। গতি, শক্তি ও আক্রমণভাগে বল এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার কারণে তিনি প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি। দুই ভাইয়ের বোঝাপড়া কুরাসাওর খেলার অন্যতম আকর্ষণ। আক্রমণভাগে নজর থাকবে জার্গেন লোকাডিয়ার ওপর। নেদারল্যান্ডসের সাবেক এই আন্তর্জাতিক ফুটবলার গোল করার পাশাপাশি আক্রমণভাগে অভিজ্ঞতার ছাপ রাখেন। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে তার।
রক্ষণভাগে ভরসার নাম কুয়েকু মারিয়া এবং জুরিচ ক্যারোলিনা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে রক্ষণ সংগঠিত রাখা এবং চাপ সামাল দেওয়ার দায়িত্ব থাকবে তাদের ওপর। আর গোলপোস্টের নিচে থাকবেন অভিজ্ঞ গোলরক্ষক এলোই রুম, যিনি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলের নির্ভরতার প্রতীক। ইউরোপের বিভিন্ন পেশাদার লিগে খেলার অভিজ্ঞতা থাকা এই ফুটবলাররাই বিশ্বকাপের মঞ্চে কুরাসাওর সবচেয়ে বড় আশা। তাদের পারফরম্যান্সের ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে ছোট্ট ক্যারিবীয় দেশটির বড় স্বপ্নের সাফল্য।
কৌতূহল জাগানো কিছু তথ্য
কুরাসাওর বিশ্বকাপ যাত্রা ঘিরে রয়েছে বেশ কয়েকটি ব্যতিক্রমী গল্প। কাতার বিশ্বকাপে যেমন হ্যাজার্ড, মিলিনকোভিচ-সাভিচ ও আইয়ু ভাইদের দেখা গিয়েছিল, এবার আলোচনায় বাকুনা পরিবার। কুরাসাওর জার্সিতে একসঙ্গে খেলবেন দুই ভাই লিয়ান্দ্রো বাকুনা ও জুনিনহো বাকুনা। জাতীয় দলের মাঝমাঠে তাদের অভিজ্ঞতা ও বোঝাপড়া হতে পারে দলের অন্যতম বড় শক্তি।
দুই ভাইয়ের ক্যারিয়ারেও আছে দারুণ এক কাকতালীয় ঘটনা। ২০১৮-১৯ মৌসুমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে লিয়ান্দ্রো খেলেছিলেন কার্ডিফ সিটির হয়ে, আর জুনিনহো ছিলেন হাডার্সফিল্ড টাউনে। মৌসুম শেষে দুই ক্লাবই একসঙ্গে রেলিগেট হয়েছিল।
বিশ্বকাপে কুরাসাওর চ্যালেঞ্জও কম নয়। ‘গ্রুপ অব ডেথ’-এ তাদের প্রতিপক্ষ চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি, দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী দল ইকুয়েডর এবং আফ্রিকার অন্যতম সেরা দল আইভরি কোস্ট। তিন প্রতিপক্ষের সম্মিলিত জনসংখ্যা ১৩ কোটির বেশি, অথচ কুরাসাওর জনসংখ্যা মাত্র দেড় লাখের কাছাকাছি।
তবে ছোট আকারের দেশ হওয়াকে দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন না কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। তার বিশ্বাস, বিশ্বকাপ এমন একটি মঞ্চ যেখানে যেকোনো দল ইতিহাস গড়তে পারে। তাই তার শিষ্যদের লক্ষ্যও একটাই, বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে নতুন এক রূপকথার জন্ম দেওয়া।
ডাগআউটে অভিজ্ঞ ডিক অ্যাডভোকাট
বিশ্বকাপে কুরাসাওর সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হতে পারেন তাদের প্রধান কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। ডাচ এই কোচের ঝুলিতে রয়েছে কয়েক দশকের কোচিং অভিজ্ঞতা। জাতীয় দল থেকে শুরু করে ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের ক্লাব, সব জায়গাতেই কাজ করেছেন তিনি। নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, বেলজিয়াম ও ইরাকের মতো জাতীয় দলের দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
কুরাসাওয়ের মতো ছোট একটি দলকে বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলাই অ্যাডভোকাটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তার পরিকল্পনার মূল ভিত্তি শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, দ্রুত ট্রানজিশন এবং সুযোগ পেলেই আক্রমণে ওঠা। তুলনামূলক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দলকে সংগঠিত রাখার পাশাপাশি সেট-পিস পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
বিশ্বকাপে ‘গ্রুপ অব ডেথ’-এ পড়লেও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছেন অভিজ্ঞ এই কোচ। তার মতে, বড় দলগুলোর বিপক্ষে ভয় নিয়ে নয়, আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামতে হবে। খেলোয়াড়দের মধ্যেও তিনি সেই বিশ্বাস গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন যে, বিশ্বকাপের মঞ্চে যেকোনো ম্যাচেই চমক দেখানো সম্ভব।




