চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। কিন্তু দলটির নামের পাশে যে ঐতিহ্য, গত এক দশক ধরে বিশ্বমঞ্চে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। জার্মানি সর্বশেষ কোনো বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ খেলেছিল সেই ২০১৪ সালের মারাকানার ফাইনালে, যেবার তারা বিশ্বসেরার মুকুট পরেছিল। এরপর কেটে গেছে দুটি বিশ্বকাপ (২০১৮ ও ২০২২); দুবারই গ্রুপ পর্ব থেকে লজ্জাজনক বিদায় নিয়েছে তারা। ফুটবল বিশ্বে জার্মানির সেই ‘হারানো গৌরব’ যেন এক ধূসর স্মৃতি।
তবে ঘরের মাঠে উয়েফা ইউরো ২০২৪-এর আয়োজন জার্মান ফুটবলে কিছুটা হলেও সুবাতাস এনে দিয়েছিল। সেই আসরটি জার্মানদের মনে করিয়ে দিয়েছিল ২০০৬ সালের নিজেদের মাঠের বিশ্বকাপের কথা যেখানে একঝাঁক তরুণ, সতেজ আর সৃজনশীল ফুটবলার নিয়ে এক নতুন জার্মানির জন্ম হয়েছিল। ইউরোতেও সেই চেনা ছন্দের দেখা মিলেছিল, তৈরি হয়েছিল নতুন আশার আলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন স্পেনের কাছে ১১৯ মিনিটের অতিরিক্ত সময়ের গোলে স্বপ্নভঙ্গ হয় তাদের। এরপর গত বছরের নেশনস লিগ এবং ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে স্লোভাকিয়ার কাছে হার আবার দলটিকে বাস্তবতার মাটিতে আছড়ে ফেলেছে।
বিজ্ঞাপন
বিগত দুটি বিশ্বকাপেই জার্মানি তাদের প্রথম ম্যাচ হেরে বসেছিল এবং সেই ধাক্কা আর সামলে উঠতে পারেনি। তাই আগামী ১৪ জুন হিউস্টনে ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাওয়ের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটির দিকে তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব। জার্মানি কি পারবে প্রথম ম্যাচের বাধা পেরোতে?
জার্মানির শক্তির জায়গা
এই জার্মানি দলের সবচেয়ে শক্তিশালী বিভাগ হলো তাদের মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডাররা। জামাল মুসিয়ালা, ফ্লোরিয়ান উইর্টজ এবং তরুণ তুর্কি লেনার্ট কার্ল-এর মতো বিশ্বমানের প্রতিভারা পুরো মাঠে ঘুরে বেড়াতে এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে চুরমার করে সৃজনশীল পাস বাড়াতে ওস্তাদ। এছাড়া শেষ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক অবসর ভেঙে কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ারের আকস্মিক প্রত্যাবর্তন রক্ষণভাগের পেছনের সব দুশ্চিন্তা এক নিমেষে দূর করে দিয়েছে।

জার্মানির দুর্বলতার জায়গা
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো দলের প্রাণভোমরা জামাল মুসিয়ালার ফিটনেস। ক্লাবে ইনজুরির ধাক্কা কাটিয়ে তিনি এখনও শতভাগ ফিট নন। এছাড়া প্রথাগত স্ট্রাইকার পজিশনে খেলার মতো যারা আছেন, তাদের কারোরই ঘরোয়া মরশুম খুব একটা ভালো কাটেনি—কেউ ভুগেছেন ইনজুরিতে, আবার কাউকে ক্লাবে খেলতে হয়েছে নিজের চেনা পজিশনের বাইরে। পাশাপাশি, মাঝমাঠের সেন্ট্রাল পজিশনে 'ডাবল পিভট' (দুই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার) হিসেবে কার সাথে কার জুটি নিখুঁত হবে, সেই সঠিক ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াটাও কোচ নাগেলসম্যানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বিজ্ঞাপন
তবে মাঠের ভেতরের এসব দুর্বলতার চেয়েও বড় মানসিক বাধা হতে পারে টুর্নামেন্টের সূচি। জার্মানি যদি কোনোমতে গ্রুপ পর্ব পারও হয়, রাউন্ড অব ৩২ পার করার পর রাউন্ড অব ১৬-তেই তাদের সামনে শক্তিশালী ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

কেমন হতে পারে জার্মানির কৌশল ও লাইন-আপ?
জার্মানি দলে প্রথাগত সেন্টার-ফরোয়ার্ড বা এক নম্বর স্ট্রাইকার রাখা হবে কি না তা নিয়ে সে দেশে বছরের পর বছর ধরে বিতর্ক চলছে। তবে বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী কোচ নাগেলসম্যান ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে দল সাজাতে যাচ্ছেন। যেখানে আক্রমণভাগের একদম সামনে একক স্ট্রাইকার হিসেবে খেলবেন আর্সেনালের তারকা কাই হাভার্টজ।
মাঝমাঠের পুরো পরিকল্পনা নির্ভর করছে বায়ার্ন মিউনিখের প্লেমেকার জামাল মুসিয়ালার ওপর। গত গ্রীষ্মে ক্লাব বিশ্বকাপে পা ভেঙে যাওয়া এবং গোড়ালি মচকে যাওয়ার পর গত জানুয়ারি থেকে তিনি মাঠে ফিরেছেন। গত ৩১ মে ফিনল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর তিনি প্রথম ৯০ মিনিট খেলার মতো ধকল সামলেছেন। গোলপোস্টের নিচে যথারীতি থাকছেন ২০১৪ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক ম্যানুয়েল নয়ার। নিজের পঞ্চম বিশ্বকাপকে রাঙাতে তিনি অবসর ভেঙে ফিরে সবাইকে চমকে দিয়েছেন।

মাস্টারমাইন্ড ডাগআউট: হুলিয়ান নাগেলসম্যান
আজ থেকে ঠিক ১০ বছর আগে, মাত্র ২৮ বছর বয়সে যখন হুলিয়ান নাগেলসম্যান হোফেনহেইমের কোচের দায়িত্ব নিয়ে তাদের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তুলেছিলেন, তখন পুরো ফুটবল বিশ্ব নড়েচড়ে বসেছিল। এরপর তিনি লাইপজিগকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে তোলেন। তবে বায়ার্ন মিউনিখে তার অধ্যায়টি বরখাস্তের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। বর্তমানে জার্মানির এই কোচের বয়স কিন্তু তার মূল গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ারের চেয়েও ১৬ মাস কম!
বাছাইপর্বের প্রথম ম্যাচে স্লোভাকিয়ার কাছে হেরে (যা জার্মানির বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ইতিহাসে মাত্র চতুর্থ হার) এক বুক চাপ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, নাগেলসম্যানের অধীনে জার্মানি টানা চার ম্যাচ জিতে গ্রুপ সেরা হয়েই বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে রেকর্ড ৮ বার ফাইনাল খেলা জার্মানি কি পারবে তাদের এই নতুন দর্শনে ভর করে অতীতের সব ব্যর্থতা মুছে দিয়ে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বজয় করতে? উত্তর মিলবে আগামী ১৪ জুন থেকেই!




