সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ঢাকা

মদ্রিচের লাস্ট ড্যান্স

ব্রোঞ্জ থেকে সোনার খোঁজে যুক্তরাষ্ট্রে দালিচের সেনারা

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮ জুন ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম

শেয়ার করুন:

ব্রোঞ্জ থেকে সোনার খোঁজে যুক্তরাষ্ট্রে দালিচের সেনারা

বিশ্ব ফুটবলে কিছু দেশ আছে যাদের শক্তি শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায় না। মাঠে নামার পর তারা নিজেদের সামর্থ্যের চেয়েও অনেক বেশি কিছু উপহার দেয়। ক্রোয়েশিয়া ঠিক তেমনই একটি নাম। মাত্র ৪০ লাখের কম জনসংখ্যার দেশটি গত তিন দশকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল ও ধারাবাহিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপে প্রথম অংশগ্রহণের পর থেকেই তারা বারবার প্রমাণ করেছে যে ফুটবলে সাফল্যের জন্য বড় জনসংখ্যা বা বিপুল সম্পদের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন প্রতিভা, মানসিক দৃঢ়তা এবং সঠিক পরিকল্পনা।

ফ্রান্স বিশ্বকাপে অভিষেকেই তৃতীয় স্থান অর্জন করে বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল ক্রোয়াটরা। এরপর ২০১৮ সালে রাশিয়ায় ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠেছিল তারা। যদিও শিরোপা অধরা থেকে যায়, তবুও সেই অর্জন বিশ্ব ফুটবলে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে। চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপে আবারও সাফল্যের ধারা ধরে রেখে তৃতীয় স্থান অর্জন করে দলটি। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়াকে আর কোনো অঘটনের দল বলা যায় না; তারা এখন শিরোপার অন্যতম দাবিদার।


বিজ্ঞাপন


দালিচের হাতে গড়া নতুন স্বপ্ন

ক্রোয়েশিয়ার সাম্প্রতিক সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান যাঁর, তিনি হলেন কোচ জালাতকো দালিচ। ২০১৭ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি দলটিকে এমন এক মানসিকতা শিখিয়েছেন, যেখানে প্রতিটি ম্যাচে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার অদম্য ইচ্ছা দেখা যায়। দালিচের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অভিজ্ঞ ও তরুণ ফুটবলারদের মধ্যে নিখুঁত ভারসাম্য তৈরি করা।

এবারের বিশ্বকাপ স্কোয়াডেও সেই দর্শনের প্রতিফলন দেখা গেছে। একদিকে যেমন আছেন লুকা মদ্রিচ, ইভান পেরিসিচ ও আন্দ্রেই ক্রামারিচের মতো অভিজ্ঞ যোদ্ধারা, অন্যদিকে সুযোগ পেয়েছেন লুকা ভুশকোভিচ ও ইগর মাতানোভিচের মতো উদীয়মান তারকারা। ভবিষ্যৎ ও বর্তমানকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাই স্পষ্ট করেছেন দালিচ।

বাছাইপর্বে দুর্দান্ত আধিপত্য


বিজ্ঞাপন


বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ক্রোয়েশিয়ার পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি ম্যাচে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। আট ম্যাচে সাতটি জয় এবং একটি ড্র নিয়ে অপরাজিত থেকেই মূল পর্বে জায়গা নিশ্চিত করে তারা। শুধু ফলাফলই নয়, আক্রমণভাগের ধারও ছিল অসাধারণ। প্রতিপক্ষের জালে ২৮ বার বল পাঠিয়ে তারা ইউরোপের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণাত্মক দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।

দলের খেলায় ছিল আত্মবিশ্বাস, গতি এবং পরিকল্পনার ছাপ। বেশ কয়েকটি ম্যাচে প্রতিপক্ষকে একেবারেই সুযোগ না দিয়ে একতরফা আধিপত্য দেখিয়েছে ক্রোয়াটরা। সেই পারফরম্যান্সই এখন বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে তাদের আত্মবিশ্বাসের বড় উৎস।

অভিজ্ঞতার ভরসায় গোলবারের নিচে লিভাকোভিচ

কাতার বিশ্বকাপে পেনাল্টি শুটআউটে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন ডমিনিক লিভাকোভিচ। এবারও গোলবারের নিচে দলের প্রধান ভরসা তিনি। বড় ম্যাচে চাপ সামলানোর অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তার। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দুর্দান্ত সেভ করার দক্ষতা তাকে বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষকদের কাতারে নিয়ে গেছে। তার সঙ্গে বিকল্প হিসেবে থাকছেন ডমিনিক কোতারস্কি এবং ইভোর পান্দুর। ফলে গোলকিপিং বিভাগে যথেষ্ট গভীরতা রয়েছে ক্রোয়েশিয়ার।

গভার্দিওলকে ঘিরে শক্তিশালী রক্ষণভাগ

আধুনিক ফুটবলে শক্তিশালী ডিফেন্স ছাড়া বড় সাফল্য পাওয়া কঠিন। ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগের নেতৃত্বে থাকবেন জোশকো গভার্দিওল। ইউরোপের অন্যতম সেরা তরুণ ডিফেন্ডার হিসেবে ইতোমধ্যেই নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি। গতি, ট্যাকলিং এবং বল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তাকে আলাদা করে তুলেছে।

তার সঙ্গে জোসিপ সুতালো, জোসিপ স্টানিসিচ, মারিন পংগ্রাসিচ ও মার্টিন এরলিচের মতো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডাররা আছেন। পাশাপাশি তরুণ লুকা ভুশকোভিচকে ভবিষ্যতের তারকা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে রক্ষণভাগে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের একটি শক্তিশালী সমন্বয় রয়েছে।

মদ্রিচ-কোভাচিচের মাঝমাঠ এখনো দলের প্রাণ

ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের মাঝমাঠ। বয়স ৪০-এর কাছাকাছি পৌঁছালেও লুকা মদ্রিচ এখনো দলের হৃদস্পন্দন। খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত পাস এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা কঠিন। মাতেও কোভাচিচের সঙ্গে তার বোঝাপড়া বহুদিনের। এই জুটি মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করতে এবং আক্রমণ সাজাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তরুণ মার্টিন বাটুরিনা ও পেতার সুচিচ মাঝমাঠে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। তাদের গতি এবং সৃজনশীলতা ক্রোয়েশিয়ার খেলাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।

আক্রমণে অভিজ্ঞতার ঝলক

গোল করার দায়িত্বে সবচেয়ে বেশি ভরসা করা হচ্ছে আন্দ্রেই ক্রামারিচের ওপর। বাছাইপর্বে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দলকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। তার সঙ্গে থাকবেন অভিজ্ঞ উইঙ্গার ইভান পেরিসিচ। বড় ম্যাচে গোল করার পাশাপাশি দলের অন্যদের সুযোগ তৈরি করতেও পারদর্শী তিনি। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ডদের উপস্থিতি যেকোনো দলের জন্য বড় সম্পদ। ক্রোয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও সেটি সত্য।

শক্তি যেখানে

ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের মানসিক দৃঢ়তা। অতীতে বহুবার তারা পিছিয়ে থেকেও ম্যাচে ফিরেছে। নকআউট পর্বে অতিরিক্ত সময় কিংবা টাইব্রেকারে জয়ের অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে তাদের। বড় টুর্নামেন্টে চাপ সামলানোর এই অভিজ্ঞতা অন্য অনেক দলের চেয়ে তাদের এগিয়ে রাখে। এছাড়া দলের মাঝমাঠ বিশ্বমানের। মদ্রিচ ও কোভাচিচের মতো খেলোয়াড়দের উপস্থিতি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে সাহায্য করে। বড় ম্যাচে অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অপরিসীম, আর সেই জায়গায় ক্রোয়েশিয়া যথেষ্ট সমৃদ্ধ।

উদ্বেগের জায়গাও আছে

তবে সবকিছুর পরও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। দলের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারের বয়স এখন অনেক বেশি। দীর্ঘ টুর্নামেন্টে টানা উচ্চগতির ম্যাচ খেলতে হলে তাদের ফিটনেস বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে। এছাড়া ক্রোয়েশিয়ার অনেক ম্যাচই অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর প্রবণতা রয়েছে। বিশ্বকাপের মতো কঠিন প্রতিযোগিতায় এটি খেলোয়াড়দের শারীরিকভাবে ক্লান্ত করে দিতে পারে। তাই মূল সময়েই ম্যাচ শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে হবে তাদের।

মদ্রিচের শেষ বিশ্বকাপ?

ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আবেগঘন গল্প হতে পারে লুকা মদ্রিচের শেষ বিশ্বকাপ যাত্রা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি প্রায় সবকিছুই জিতেছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফি এখনো তার হাতছাড়া। তাই এই টুর্নামেন্টকে ঘিরে তার এবং ক্রোয়েশিয়ার সমর্থকদের প্রত্যাশা অন্যবারের চেয়ে অনেক বেশি। যদি মদ্রিচের নেতৃত্বে ক্রোয়েশিয়া প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিততে পারে, তাহলে সেটি শুধু দেশটির নয়, বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম রূপকথার গল্প হয়ে থাকবে।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর