ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আবেগের নাম। প্রতি চার বছর পর পর যখন বিশ্বকাপ শুরু হয়, তখন দেশ-ভাষা-সীমানা সবকিছু ছাপিয়ে কোটি কোটি মানুষ এক হয়ে যায় একই উন্মাদনায়। মাঠে বলের প্রতিটি ছোঁয়া, প্রতিটি গোলের মুহূর্ত যেন তৈরি করে নতুন ইতিহাস।
এই মহাযজ্ঞকে আরও রঙিন, আরও স্মরণীয় করে তুলতে বিশ্বকাপের সাথে থাকে এক বিশেষ প্রতীক মাসকট। কখনো প্রাণী, কখনো উদ্ভিদ, আবার কখনো মানুষের আদলে তৈরি এই চরিত্রগুলো শুধু বিনোদনের জন্য নয়; এগুলো স্বাগতিক দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের গল্পও বলে।
বিজ্ঞাপন
২০২৬ সালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব, যেখানে নতুন ইতিহাস লেখার অপেক্ষায় রয়েছে আগামী বিশ্বকাপ। তার আগে চলুন ফিরে দেখা যাক কিভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে বিশ্বকাপ মাসকটের রঙিন যাত্রা।
বিশ্বকাপ মাসকটের রঙিন ইতিহাস

১৯৬৬ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ – ‘উইলি’
বিজ্ঞাপন
বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম অফিসিয়াল মাসকট ছিল সিংহ আকৃতির ‘উইলি’। যুক্তরাজ্যের জাতীয় প্রতীক হিসেবে সিংহকে বেছে নেওয়া হয়, যা ব্রিটিশ পরিচয়ের প্রতিফলন।

১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপ – ‘জুয়ানিটো’
সবুজ জার্সি ও সোমব্রেরো পরা একটি ছোট ছেলে, যা মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে।

১৯৭৪ পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপ – ‘টিপ অ্যান্ড ট্যাপ’
দুটি শিশুর চরিত্র, যা ঐক্য, বন্ধুত্ব ও খেলাধুলার চেতনা প্রকাশ করে।

১৯৭৮ আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ – ‘গুয়াসিটো’
ঘোড়সওয়ার সংস্কৃতি ও আর্জেন্টাইন ফুটবল আবেগের প্রতিচ্ছবি হিসেবে তৈরি চরিত্র।

১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপ – ‘নারানজিটো’
একটি কমলা ফলের আদলে তৈরি মাসকট, যা স্পেনের জনপ্রিয় ফল ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরে।

১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপ – ‘পিকুই’
জালাপিনো মরিচের আদলে তৈরি চরিত্র, যা মেক্সিকোর খাদ্য সংস্কৃতির অংশ।

১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপ – ‘সিয়াও’
ত্রিভুজাকৃতি রঙিন চরিত্র, যার নাম ইতালীয় অভিবাদন ‘Ciao’ থেকে নেওয়া।

১৯৯৪ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ – ‘স্ট্রাইকার’
লাল-নীল পোশাক পরা একটি কুকুর, যা যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় পোষা প্রাণীর প্রতীক।

১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপ – ‘ফুটিক্স’
ফ্রান্সের জাতীয় প্রতীক মোরগের আদলে তৈরি নীল রঙের চরিত্র।

২০০২ দক্ষিণ কোরিয়া–জাপান বিশ্বকাপ – ‘অ্যাটো, কাজ ও নিক’
তিনটি ডিজিটাল ভবিষ্যৎধর্মী চরিত্র, যা প্রযুক্তিনির্ভর ফুটবলের ধারণা দেয়।

২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপ – ‘গোলিও ও পাইল’
একটি সিংহ ও একটি কথা বলা ফুটবলের মজার সংমিশ্রণ।

২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ – ‘জাকুমি’
চিতাবাঘের আদলে তৈরি সবুজ চুলের অনন্য মাসকট, যা আফ্রিকার বন্যপ্রাণীকে প্রতিনিধিত্ব করে।

২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপ – ‘ফুলেকো’
বিপন্ন প্রজাতির আরমাডিলো প্রাণীর অনুপ্রেরণায় তৈরি মাসকট, যা পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দেয়।

২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ – ‘জাবিভাকা’
নেকড়ের চরিত্র, যার অর্থ ‘যে গোল করে’। আধুনিক ও স্পোর্টি ডিজাইনে তৈরি।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপ – ‘লা’ইব’
আরবীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা তরুণের আদলে তৈরি মাসকট, যার অর্থ ‘দক্ষ খেলোয়াড়’।

২০২৬ বিশ্বকাপের মাসকট- ক্লাচ, মেপল ও জায়ু
ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবলের আসর, যেখানে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেবে। এই আসরকে কেন্দ্র করে তিনটি অফিসিয়াল মাসকট ঘোষণা করা হয়েছে, যা তিনটি স্বাগতিক দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে।
কানাডার প্রতিনিধি মেপল একটি মুজ বা বৃহদাকার হরিণ। ফিফার মতে, মেপল কানাডার বিভিন্ন প্রদেশ ও অঞ্চল ঘুরে মানুষের সঙ্গে মিশে দেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। অন্যদিকে, মেক্সিকোর প্রতিনিধি জায়ুর জন্ম দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জঙ্গলে। নাচ, খাবার এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে মেক্সিকোর পরিচয় বহন করছে এই জাগুয়ার। ফিফার ভাষায়, সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে আবেগ এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষকে একসূত্রে বাঁধার প্রতীক জায়ু।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি ক্লাচ একটি ঈগল। দেশজুড়ে উড়ে বেড়িয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতি, খেলা এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে কৌতূহল ও আশাবাদের সঙ্গে গ্রহণ করার বার্তা দেয় এই চরিত্র। তিনটি মাসকটই বিশ্বকাপের বৈশ্বিক চেতনা এবং বহুসাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।




