বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, উন্মাদনা আর মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াই। কোটি দর্শকের চোখ থাকবে মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স কিংবা নতুন প্রজন্মের তারকাদের দিকে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপকে শুধু ফুটবলের টুর্নামেন্ট হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। মাঠের ভেতরে যেমন দলগুলোর প্রতিযোগিতা চলবে, তেমনি মাঠের বাইরে দেখা যাবে আরেক ধরনের শক্তির লড়াই। সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী হবে বিশ্বের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি জায়ান্ট, জ্বালানি কোম্পানি এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক প্রভাব। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপ আসলে কেবল একটি ক্রীড়া আসর নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার নতুন মানচিত্রেরও প্রতিচ্ছবি।
স্পন্সরদের তালিকায় লুকিয়ে থাকা বিশ্ব রাজনীতি
বিজ্ঞাপন
বিশ্বকাপের প্রধান অংশীদারদের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জার্মান ক্রীড়া সরঞ্জাম নির্মাতা এডিডাস, মার্কিন প্রতিষ্ঠান কোকা-কোলা ও ভিসা, কাতার এয়ারওয়েজ, দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই-কিয়া, চীনের লেনোভো এবং সৌদি আরবের জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আরামকো, সবাই রয়েছে একই মঞ্চে।
এছাড়া দ্বিতীয় স্তরের স্পন্সরদের মধ্যেও রয়েছে মার্কিন, চীনা ও ইউরোপীয় বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বড় অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো হলেও চীনা করপোরেট উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। ফলে বিশ্বকাপের বিজ্ঞাপন বোর্ড, সম্প্রচার এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোতে এখন শুধু ব্যবসা নয়, বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও দৃশ্যমান।
মাঠে নেই চীন, তবুও আলোচনায়
২০২৬ বিশ্বকাপে চীনের জাতীয় দল নেই। কিন্তু দেশটির বিভিন্ন কোম্পানি বিশ্বকাপের অন্যতম দৃশ্যমান অংশীদার। প্রযুক্তি, সম্প্রচার ও বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্যিক এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা তুঙ্গে। ধারনা করা হচ্ছে, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি ধরে রাখা চীনের সফট-পাওয়ার কৌশলেরও অংশ। তবে ফিফার দৃষ্টিতে বিষয়টি অনেক সহজ। যে প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করবে, সেই প্রতিষ্ঠানের জন্যই বিশ্বকাপের দরজা খোলা।
বিজ্ঞাপন
আরামকো ও সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
বিশ্বকাপ ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত অংশীদারদের একটি হলো সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো। ফিফার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির চুক্তি ২০২৭ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এর আওতায় রয়েছে ২০২৬ পুরুষ বিশ্বকাপ এবং ২০২৭ নারী বিশ্বকাপ। একই সময়ে ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে সৌদি আরব। এর আগে দেশটি নিজেদের ফুটবল লিগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমারসহ একাধিক বিশ্ব তারকাকে নিয়ে এসেছে।
ফলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অঙ্গনে সৌদি আরবের প্রভাব বিস্তারের একটি বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অবশ্য সমালোচকদের অভিযোগ, মানবাধিকার ইস্যুসহ বিভিন্ন বিতর্ক থেকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরাতে খেলাধুলাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও সৌদি আরব ও ফিফা এমন অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে।
ফিফা ও ইনফান্তিনোকে ঘিরে বিতর্ক
এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রায়ই উঠে আসে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নাম। বিশ্ব ফুটবলের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ফিফার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বকাপ আয়োজনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। ক্রীড়া রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করা অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বিশ্বকাপ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব বহন করছে।
পরিবেশ নিয়ে দ্বৈত বার্তা?
২০২৬ বিশ্বকাপে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের কথা বলছে ফিফা। তবে একই সঙ্গে বিশ্বের বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে পরিবেশকর্মী ও কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক নারী ফুটবলার প্রকাশ্যে আরামকো চুক্তির সমালোচনা করেছেন। তাদের দাবি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বার্তার সঙ্গে এমন অংশীদারিত্ব সাংঘর্ষিক। ফিফা অবশ্য এ বিষয়ে খুব বেশি প্রকাশ্য মন্তব্য করেনি।
ট্রাম্প ফ্যাক্টর ও অভিবাসন বিতর্ক
বিশ্বকাপের আরেকটি আলোচিত দিক হচ্ছে এর প্রধান আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ প্রক্রিয়া নিয়ে আগেই বিতর্ক ছিল। বিশ্বকাপ সামনে রেখে কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি, কর্মকর্তা ও কর্মীদের ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার খবরও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে। যদিও আয়োজকদের বিশ্বাস, বিশ্বকাপের বিশাল পরিসর এবং বৈশ্বিক গুরুত্ব শেষ পর্যন্ত সব পক্ষকেই একই মঞ্চে নিয়ে আসবে।
ফুটবলের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে বিশ্বকাপ?
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়। এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, পরিবেশ, কূটনীতি এবং করপোরেট শক্তির মিলিত এক বৈশ্বিক প্রদর্শনী। ২০৩০ বিশ্বকাপ ছড়িয়ে যাবে তিন মহাদেশে। ২০৩৪ সালে পুরো আয়োজন হবে সৌদি আরবে। প্রতিটি নতুন আসরের সঙ্গে বাড়ছে বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব। তাই প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বকাপের এই বিস্তার শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে?
শেষ পর্যন্ত জিতে যায় ফুটবলই
তবে এত আলোচনা, বিতর্ক আর বিশ্লেষণের পরও একটি বাস্তবতা বদলায় না। দর্শক যখন মাঠে প্রিয় দলের গোল উদযাপন করে, তখন স্পন্সরশিপ চুক্তি, ভূরাজনীতি কিংবা করপোরেট প্রতিযোগিতা অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। বিশ্বকাপকে ঘিরে অর্থ ও ক্ষমতার নানা হিসাব থাকলেও কোটি মানুষের কাছে এর আসল আকর্ষণ এখনও সেই পুরোনো। একটি বল, ২২ জন ফুটবলার এবং গোলের পর উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়া একটি মুহূর্ত। সেখানেই ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি। আর সেই কারণেই বিশ্বকাপের আসল গল্প এখনও মাঠেই লেখা হয়।



























































































