বিশ্বকাপ ফুটবল একসময় বাংলাদেশের মানুষের কাছে ছিল শুধুই একটি ক্রীড়া আসর নয়, বরং আবেগ, উৎসব আর পরিচয়ের অংশ। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার অনেক আগেই দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ত ফুটবল জ্বর। ছাদে ছাদে উড়ত বিভিন্ন দেশের পতাকা, বাজারে বাড়ত জার্সির চাহিদা, আর চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই চলত প্রিয় দল নিয়ে তুমুল আলোচনা। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই দৃশ্যমান উন্মাদনা কিছুটা কমেছে বলে মনে করছেন অনেক ফুটবলপ্রেমী। তবুও নতুন বিশ্বকাপ সামনে রেখে আবারও প্রাণ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে দেশের ফুটবল সংস্কৃতি।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি দল হলো আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। তবে শুধু এই দুই দলের মধ্যেই সমর্থন সীমাবদ্ধ ছিল না। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে জাপানেরও ছিল উল্লেখযোগ্য সমর্থকগোষ্ঠী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্তুগাল দলের জনপ্রিয়তাও অনেক বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্বকাপ ঘিরে বন্ধুদের মধ্যে শুরু হতো এক ধরনের আনন্দঘন প্রতিযোগিতা। কে আগে পতাকা টানাবে, কে নতুন জার্সি সংগ্রহ করবে কিংবা কার দল শেষ পর্যন্ত ভালো করবে, এসব নিয়েই চলত আলোচনা।
আর্জেন্টিনা সমর্থকদের জন্য গত কয়েক বছর ছিল স্মরণীয়। দীর্ঘ সময় বিশ্বকাপ শিরোপার বাইরে থাকার পর দলটি ধীরে ধীরে নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তোলে। ২০১৪ সালে ফাইনালে পৌঁছেও ট্রফি জিততে না পারার হতাশা এবং পরবর্তী বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর দলটি নতুন পরিকল্পনায় এগোয়।
এরপর একে একে তারা জিতে নেয় কোপা আমেরিকা ২০২১ এবং ফিনালিসসিমা ২০২২। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বহু বছরের অপেক্ষার ইতি টানে দলটি। অধিনায়ক লিওনেল মেসির নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জয়ের মুহূর্ত আর্জেন্টিনা সমর্থকদের জন্য হয়ে ওঠে স্বপ্নপূরণের গল্প।

বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে ব্রাজিল সমর্থকদের অপেক্ষা এখনও শেষ হয়নি। ২০২২ বিশ্বকাপে পঞ্চম শিরোপা জয়ের পর থেকে দলটি প্রতিবারই অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ষষ্ঠ শিরোপা এখনও তাদের নাগালের বাইরে।
বিশ্বকাপ এলেই ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ ট্রফির স্বপ্ন নতুন করে জাগে ব্রাজিল ভক্তদের মধ্যে। তাই আগামী আসরেও তাদের প্রত্যাশা থাকবে আগের মতোই আকাশছোঁয়া।
একসময় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে বিতর্ক ছিল বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণ। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি সমর্থকদের কথার লড়াইও জমে উঠত সমানভাবে। তবে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের পর সেই তীব্রতা কিছুটা কমেছে বলে মনে করেন অনেকেই।
কারণ, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শিরোপা জেতার ফলে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি এসেছে। অন্যদিকে ব্রাজিল সমর্থকেরা এখনও নতুন সাফল্যের আশায় দিন গুনছেন।
আগামী বিশ্বকাপ সামনে রেখে ফুটবলপ্রেমীদের মনে ইতোমধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। পর্তুগাল কি প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারবে? ফ্রান্স কি আবারও শীর্ষে ফিরবে? ব্রাজিল কি শেষ পর্যন্ত ‘হেক্সা’ অর্জন করবে? নাকি আর্জেন্টিনা আরও একটি শিরোপা যোগ করে নিজেদের আধিপত্য আরও শক্তিশালী করবে? শেষ পর্যন্ত সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়ে। তবে বিশ্বকাপের ক্ষণগণনা শুরু হলেই যে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা আবারও পুরোনো আবেগে ফিরবে, সে সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, বিশ্বকাপ যত কাছে আসবে, বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহও তত বাড়বে। আর হয়তো আবারও দেশের অলিগলি, পাড়া-মহল্লা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরে আসবে সেই চেনা ফুটবল উন্মাদনা।




