ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব মানেই শুধু পয়েন্টের হিসাব-নিকাশ নয়; এখানে তৈরি হয় নতুন গল্প, ভাঙে পুরোনো রেকর্ড, জন্ম নেয় নতুন নায়ক। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এফ’ এমনই এক মঞ্চ, যেখানে ঐতিহ্য, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনার চারটি ভিন্ন গল্প একসঙ্গে মিলিত হয়েছে। নেদারল্যান্ডস, জাপান, সুইডেন এবং তিউনিসিয়াকে নিয়ে গঠিত এই গ্রুপকে ইতোমধ্যেই টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণীয় গ্রুপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় নাম নিঃসন্দেহে নেদারল্যান্ডস। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল হলেও এখনো বিশ্বকাপ ট্রফি ছোঁয়া হয়নি তাদের। ১৯৭৪, ১৯৭৮ ও ২০১০ সালে ফাইনালে উঠেও শিরোপা হাতছাড়া করতে হয়েছে ডাচদের। তবুও বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে তাদের অবদান অসাধারণ। ‘টোটাল ফুটবল’-এর জনক হিসেবে পরিচিত এই দল বহু কিংবদন্তি ফুটবলারের জন্ম দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বর্তমান স্কোয়াডে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে আবারও বড় স্বপ্ন দেখছে অরেঞ্জ বাহিনী। অধিনায়ক ভারজিল ফন ডাইকের নেতৃত্বে নেদারল্যান্ডসের লক্ষ্য একটাই, অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জয়। তবে গ্রুপ পর্বেই তাদের সামনে রয়েছে কঠিন কয়েকটি চ্যালেঞ্জ।
সেই চ্যালেঞ্জের অন্যতম নাম জাপান। গত দুই দশকে বিশ্ব ফুটবলে সবচেয়ে দ্রুত উন্নতি করা দেশগুলোর একটি হলো এশিয়ার এই পরাশক্তি। একসময় বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য, কিন্তু এখন তারা বড় দলগুলোর জন্যও ভয়ংকর প্রতিপক্ষ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেন, জার্মানি ও ক্রোয়েশিয়ার মতো শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে জাপানের পারফরম্যান্স বিশ্বকে নতুন বার্তা দিয়েছে। টেকফুসা কুবো, কাওরু মিতোমা ও দাইচি কামাদাদের মতো প্রতিভাবান ফুটবলারদের নিয়ে সামুরাই ব্লুরা এবার আরও বড় স্বপ্ন দেখছে। তাদের লক্ষ্য শুধু গ্রুপ পর্ব পার হওয়া নয়; বরং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেওয়া।
অন্যদিকে, সুইডেনও এই গ্রুপে বড় ধরনের চমক দেখানোর সামর্থ্য রাখে। জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের অবসরের পর অনেকেই মনে করেছিলেন সুইডিশ ফুটবলের শক্তি কমে যাবে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের নিয়ে তারা আবারও নিজেদের শক্ত অবস্থান প্রমাণ করেছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে ভিক্টর গিয়োকেরেস বর্তমানে দলের সবচেয়ে বড় ভরসা। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে খুব বেশি আলোচনায় না থাকলেও প্লে-অফের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পোল্যান্ডকে হারিয়ে মূল পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে সুইডেন। শৃঙ্খলাপূর্ণ ফুটবল ও দ্রুত আক্রমণভাগের কারণে তারা যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্যই বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
গ্রুপের চতুর্থ দল তিউনিসিয়া। আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বকারী এই দলটি হয়তো অন্য তিন দলের মতো আলোচিত নয়, কিন্তু তাদের অবহেলা করার সুযোগ নেই। এটি তাদের সপ্তম বিশ্বকাপ অভিযান। তবে আগের ছয়বারের অংশগ্রহণে কখনোই গ্রুপ পর্ব অতিক্রম করতে পারেনি তারা।
তিউনিসিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সংগঠিত রক্ষণভাগ এবং দলগত ফুটবল। তারকাখচিত স্কোয়াড না থাকলেও কঠোর পরিশ্রম ও কৌশলগত শৃঙ্খলার কারণে তারা প্রায়ই বড় দলগুলোর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এবার তাদের প্রধান লক্ষ্য ইতিহাস সৃষ্টি করে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে পৌঁছানো।
সব মিলিয়ে গ্রুপ ‘এফ’ শুধুই একটি সাধারণ গ্রুপ নয়; এটি চারটি ভিন্ন স্বপ্নের সংঘর্ষ। একদিকে নেদারল্যান্ডসের বহুদিনের অপূর্ণতা ঘোচানোর চেষ্টা, অন্যদিকে জাপানের নতুন ইতিহাস লেখার আকাঙ্ক্ষা। সুইডেন চাইছে নিজেদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে, আর তিউনিসিয়া খুঁজছে বিশ্বকাপের মঞ্চে নতুন অধ্যায় রচনার সুযোগ।
ফুটবলপ্রেমীদের জন্য তাই এই গ্রুপের প্রতিটি ম্যাচ হতে পারে উত্তেজনা, নাটকীয়তা এবং অনিশ্চয়তায় ভরপুর। শেষ পর্যন্ত কারা জায়গা করে নেবে নকআউট পর্বে, আর কারা থেমে যাবে গ্রুপ পর্বেই—সেই উত্তর মিলবে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের সবুজ গালিচায়।




