অন্য যেকোনো খেলার যেকোনো জার্সি নম্বরের চেয়ে ফুটবলের ‘১০ নম্বর’ জার্সির আবেদন সম্পূর্ণ আলাদা। এই একটি সংখ্যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অনন্য আভিজাত্য, পরম মর্যাদা আর সীমাহীন সমীহ। আদি কাল থেকেই তরুণ বা একাডেমি পর্যায়ের ফুটবলারদের কাছে এই ১০ নম্বর জার্সিটিই থাকে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত; দলের সেরা খেলোয়াড়টি নিজেকে এই জার্সির যোগ্য প্রমাণ করার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করেন।
কিন্তু কীভাবে একটি সাধারণ সংখ্যা ফুটবল বিশ্বে এতটা সম্মোহনী রূপ নিল? এর পেছনে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস এবং এই জার্সি গায়ে জড়ানো কিছু অতিমানবীয় কিংবদন্তির গল্প।
বিজ্ঞাপন
১০ নম্বর জার্সির এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ- পেলে এবং দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো সর্বকালের সেরা ফুটবলাররা আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের দেশের হয়ে এই নম্বরটি পরেই বিশ্ব জয় করেছিলেন। বিশ্বজুড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিশুরা বড় হয়েছে এই দুই জাদুকরকে আইডল মেনে।

তাদের পায়ের নিখুঁত কাজ, জাদুকরী পাসিং এবং ড্রিবলিংয়ের পাশাপাশি পিঠের ওপর থাকা ওই ‘১০’ সংখ্যাটির প্রেমে পড়েছে কোটি তরুণ। শিশুরা তাদের প্রিয় তারকাদের এতটাই অনুকরণ করতে চেয়েছে যে, ফুটবল মাঠে তাদের পরিচয় হয়ে উঠেছে এই একটি নম্বর।
ইতিহাসের পাতায় একটু পেছনে তাকালে দেখা যাবে, পেলে বা ম্যারাডোনার ১০ নম্বর জার্সি পাওয়ার পেছনে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম কাজ করত। শুরুর দিকে ফুটবলে ১ থেকে ১১ পর্যন্ত জার্সি নম্বর দেওয়া হতো খেলোয়াড়দের মাঠের পজিশন বা অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে।
বিজ্ঞাপন

ঐতিহ্যগতভাবে, গোলরক্ষকদের দেওয়া হতো ১ নম্বর এবং আক্রমণভাগের মূল খেলোয়াড় বা ফরোয়ার্ডদের দেওয়া হতো ১০ ও ১১ নম্বর। পরবর্তীতে দুই উইঙ্গার (যারা সাধারণত ৭ ও ১১ নম্বর পরতেন) কিছুটা নিচে নেমে মিডফিল্ডের দায়িত্ব নেন। ফলে আক্রমণভাগের একদম কেন্দ্রে ১০ নম্বরের আধিপত্য তৈরি হয়।
সাধারণত যেকোনো দলই চায় তাদের সবচেয়ে সৃজনশীল, অল-রাউন্ডার এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতার খেলোয়াড়টিকে ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলাতে। আর এই কারণেই মাঠের মূল ‘প্লে-মেকার’ বা আক্রমণভাগের প্রধান ভরসা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পেয়ে যেতেন ১০ নম্বর জার্সিটি। যুগ যুগ ধরে এই ধারাটিই ফুটবলের অলিখিত নিয়ম হয়ে টিকে গেছে। যদিও আধুনিক ফুটবলে এখন আর পজিশন অনুযায়ী নম্বর দেওয়ার কঠোর বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও ফুটবলের আইকনদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এই ঐতিহ্য আজো অম্লান।

বিশ্বমঞ্চ কাঁপানো ‘১০ নম্বর’ তারকারা
বিশ্বকাপের মতো মহা-মঞ্চে ১০ নম্বর জার্সি পরে নামা সব সময়ই এক বিশাল সম্মানের বিষয়। ফুটবল ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় এক অবিস্মরণীয় তালিকা। লিওনেল মেসি, নেইমার, জিনেদিন জিদান, রোনালদিনিও, কাকা, রবার্তো বাজ্জো, মাইকেল ওয়েন, ওয়েইন রুনি, ওয়েসলি স্নাইডার, করিম বেনজেমা, লুকাস পোডলস্কি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ল্যান্ডন ডনোভানের মতো বিশ্বখ্যাত তারকারা নিজ নিজ দেশের হয়ে এই বিখ্যাত জার্সি পরে মাঠ কাঁপিয়েছেন। তাঁরা সবাই ফুটবলের সেই সুদীর্ঘ ঐতিহ্যেরই একেকজন যোগ্য উত্তরসূরি।

বছরের পর বছর ধরে ১০ নম্বর জার্সির ভেতরের এই রহস্যময় চরিত্রটি যেন নিজস্ব এক প্রাণ পেয়েছে। আধুনিক ফুটবলে এখন আর এটি কেবল একটি জার্সি নম্বর নয়, বরং ফুটবল বিশ্লেষক ও পন্ডিতদের কাছে ‘১০ নম্বর রোল’ বা ‘১০ নম্বর ভূমিকা’ একটি বিশেষ কৌশলগত পরিভাষা হিসেবে রূপ নিয়েছে। মাঠের মাঝমাঠ আর আক্রমণভাগের সংযোগ সেতু হিসেবে যিনি খেলেন, দল গোছানোর মূল দায়িত্বটা থাকে তার কাঁধেই।
স্বাভাবিকভাবেই, এই জার্সির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোটি ভক্তের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা এবং এক প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপ। তবে ফুটবলের ইতিহাসের মহানায়কেরা এই চাপকে ভয় পাননি, বরং একে পুঁজি করেই তাঁরা নিজেদের নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ১০ নম্বর জার্সি তাই শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি ফুটবল মাঠের নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা আর শ্রেষ্ঠত্বের এক অবিনশ্বর প্রতীক।
আরএ



























































































