শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ঢাকা

বিশ্বমঞ্চে ‘বুড়ো হাড়ের ভেল্কি’ আর আধুনিক ফুটবলের নতুন ব্যাকরণ

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০ জুন ২০২৬, ১০:৪৪ এএম

শেয়ার করুন:

বিশ্বমঞ্চে ‘বুড়ো হাড়ের ভেল্কি’ আর আধুনিক ফুটবলের নতুন ব্যাকরণ

পেশাদার ফুটবলারদের বয়স যখন চল্লিশের কোঠায় পৌঁছায়, তখন তাঁদের ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা সাধারণত ‘অতীত কাল’ বা অবসরের গল্পেই সীমাবদ্ধ থাকে। বিগত ২২টি বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে মাঠ মাতানো একমাত্র আউটফিল্ড (গোলরক্ষক বাদে) খেলোয়াড় ছিলেন ক্যামেরুনের কিংবদন্তি রজার মিলা। ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে কোমর দুলিয়ে গোল উদযাপনে বিশ্বকে মাতানো মিলা ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপেও খেলেছিলেন ৪২ বছর বয়সে।

তবে ২০২৬ সালের এই মহোৎসবে এসে রজার মিলা অবশেষে তাঁর একাকীত্বের অবসান ঘটাতে যাচ্ছেন। এবারের বিশ্বকাপে ৪১ বছর বয়সে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠের জাদুকর লুকা মদ্রিচ ৪০ বছর বয়সে নামছেন তাঁর পঞ্চম বিশ্বকাপে। কাতার দলে ৪২ বছর বয়সেও দেখা যেতে পারে স্ট্রাইকার সেবাস্টিয়ান সোরিয়াকে। আর এই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হওয়া নামটি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ৪০ বছর বয়সী অধিনায়ক এডিন জেকো, যার হাত ধরে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করেছে দেশটি।


বিজ্ঞাপন


একই বিশ্বকাপে চল্লিশোর্ধ্ব এতজন খেলোয়াড়ের উপস্থিতি কি কেবলই এক কাকতালীয় ব্যাপার? তাঁরা কি কেবলই কিছু ব্যতিক্রমী জিন ও ইস্পাতকঠিন মানসিকতার অধিকারী, নাকি স্পোর্টস সায়েন্স, উন্নত ডায়েট ও আধুনিক ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের আশীর্বাদ?

এডিন জেকোর ফিনিক্স পাখির মতো প্রত্যাবর্তন

জার্মান ক্লাব শালকে ০৪-কে দুর্দান্ত খেলে আবারও বুন্দেসলিগায় ফিরিয়ে আনার পর এডিন জেকো এখন ফুরফুরে মেজাজে। কিন্তু গত ডিসেম্বরের চিত্রটা এমন ছিল না। উলফসবার্গ, ম্যানচেস্টার সিটি, রোমা ও ইন্টার মিলানের হয়ে খেলা জেকো ২০২৩ থেকে ২৫ সাল পর্যন্ত ফেনারবাচে মাতিয়ে যোগ দিয়েছিলেন ইতালিয়ান ক্লাব ফিওরেন্টিনায়। কিন্তু সেখানে মানিয়ে নিতে না পেরে বেঞ্চে বসে কাটাতে হচ্ছিল সময়।

জেকো বলেন, “যখন দলের ফলাফল ভালো হয় না, আর আপনিও খেলার সুযোগ পান না, তখন মাথায় অনেক আজেবাজে চিন্তা ভর করে। ভেবেছিলাম ৪০ বছরেই হয়তো ক্যারিয়ার শেষ।” কিন্তু জানুয়ারি উইন্ডোতে প্যারিস এফসির মোটা অঙ্কের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে তিনি আবেগ বেছে নেন। যোগ দেন জার্মানির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব শালকেতে। দর্শকদের ভালোবাসা তাঁকে নতুন শক্তি দেয়।


বিজ্ঞাপন


জেকোর মাথায় তখন ঘুরছিল দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন। উয়েফা প্লে-অফের সেমিফাইনালে ওয়েলসের বিপক্ষে সমতাসূচক গোল করে দলকে টাইব্রেকারে জেতান। ফাইনালে ইতালির বিপক্ষেও তার অ্যাসিস্টে সমতায় ফেরে বসনিয়া, এবং আবারও টাইব্রেকার ভাগ্যে নিশ্চিত হয় বিশ্বকাপ।

বিশ্বকাপে এবার জেকো খেলবেন এমন একঝাঁক তরুণের সাথে, যারা তাকে আইডল মেনে বড় হয়েছে। দলের ১৮ বছর বয়সী তরুণ কেরিম আলাজবেগোভিকের সাথে জেকোর বয়সের ব্যবধান ২১ বছর ৬ মাস! জেকো হেসে বলেন, “ওদের পাশে দাঁড়ালে মনে হয়, ‘আরে ভাই, আমি তো তোর চেয়ে ২২ বছরের বড়!’ এটা পাগলামি মনে হলেও তৃপ্তি দেয়।”

চল্লিশেও ফিট থাকার রহস্য নিয়ে জেকো বলেন, “সকালে ঘুম থেকে উঠলে সারা শরীরে ব্যথা করে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে কয়েক মিনিট সময় লাগে। এটা আসলে শরীর আমাকে আপডেট দেয় যে সব ঠিক আছে। ২০ বছর বয়সের চেয়ে এখন অনেক বেশি খাটতে হয়। তবে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাটাই আসল।”

মাঠে নিজের খেলার ধরনেও পরিবর্তন এনেছেন জেকো। এখন আর আগের মতো ২৫-৩০ বছরের যুবকদের সাথে গতিতে দৌড়ান না তিনি। বরং বুদ্ধিদীপ্ত পজিশনিং ও অফ-দ্য-বল মুভমেন্ট দিয়ে বাজিমাত করেন। “একটা দৌড় কম দিয়ে যদি একটা গোল বেশি করা যায়, সেটাই লাভ,” বলেন এই বসনিয়ান স্ট্রাইকার।

রোনালদো-মদ্রিচের অবসেসশন ও স্পোর্টস সায়েন্সের ম্যাজিক

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ফুটবলের প্রতি নিবেদন নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। দেশের হয়ে ২৫০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং ক্যারিয়ারে ১,০০০ পেশাদার গোলের মাইলফলকের পেছনে ছুটছেন ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা। পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ বলেন, “ক্রিশ্চিয়ানো প্রতিদিন নিজেকে গতকালের চেয়ে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এই খেলোয়াড়দের ডায়েট, রিকভারি এবং প্রতিপক্ষকে বিশ্লেষণের তাড়না এক ধরনের পাগলামির পর্যায়ে পড়ে।”

অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে এসি মিলানে যোগ দেওয়া লুকা মদ্রিচ গত সেপ্টেম্বরে ৪০ বছরে পা দিয়েই বোলনিয়ার বিপক্ষে গোল করে বসেন। রিয়াল মাদ্রিদের পারফরম্যান্স ম্যানেজার আন্তোনিও পিন্টুস বলেন, “লুকা তাঁর ডায়েট, ট্রেনিং এবং রিকভারি নিয়ে অসম্ভব সচেতন। কোনো কিছুতেই তৃপ্ত না হওয়ার মানসিকতাই তাঁকে এত বছর ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে টিকিয়ে রেখেছে।”

কী বলছে বিজ্ঞান ও গবেষণা?

বিজ্ঞান কি এই দীর্ঘায়ুকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে দেখছে? পর্তুগালের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট অব পোর্টালগ্রির অধ্যাপক লুইস ব্রাঙ্কিনহো এবং তাঁর দল ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলিয়ান লিগের ৫,২০৩টি ম্যাচ বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণা প্রকাশ করেছেন। সেখানে দেখা গেছে, একজন ফুটবলার ২৫.৭ বছর বয়সে সর্বোচ্চ গতি, ২৪.৮ বছর বয়সে সর্বোচ্চ স্ট্যামিনা এবং ২৬ বছর বয়সে সর্বোচ্চ বিস্ফোরক ক্ষমতা (explosiveness) অর্জন করেন। ২৭ বা ২৮ বছরের পর পেশির শক্তি কমতে শুরু করে।

অধ্যাপক ব্রাঙ্কিনহো ইএসপিএন-কে বলেন, “রোনালদো বা মদ্রিচেরা স্পষ্টতই প্রকৃতির নিয়ম ভাঙা ব্যতিক্রম। তাঁদের গতি ও চপলতা কমলেও, তাঁরা খেলার পজিশন বদলে এবং বডি স্ট্যাবিলিটি ধরে রেখে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন।”

জুভেন্টাসের পারফরম্যান্স ডিরেক্টর ড্যারেন বার্গেস অবশ্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। বাস্কেটবল কিংবদন্তি লেব্রন জেমসের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, জিনগত সুবিধা, আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স এবং ম্যাচের ধকল সামলানোর উন্নত প্রযুক্তির কারণেই এটি সম্ভব হচ্ছে।

তবে ইংলিশ ফুটবলার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান মাহেতা মোলাঙ্গো একটি ভিন্ন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, জুড বেলিংহাম বা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রেরা ক্যারিয়ারের শুরুতে যে পরিমাণ ম্যাচ (৮০টির কাছাকাছি) খেলছেন, তা রোনালদো বা মদ্রিচেরা তরুণ বয়সে খেলেননি। বেলিংহাম এই বয়সেই ডেভিড বেকহামের চেয়ে ৪ গুণ বেশি ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। ফলে অতিরিক্ত ম্যাচ খেলার ক্লান্তির কারণে আগামী প্রজন্মের খেলোয়াড়রা ৪০ বছর পর্যন্ত টিকতে পারবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

বিশ্বমঞ্চে অপেক্ষার পালা

আগামী শুক্রবার টরন্টোতে স্বাগতিক কানাডার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় চল্লিশোর্ধ্ব আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামবেন এডিন জেকো। আর ১৭ জুন মাঠে নামবে রোনালদোর পর্তুগাল (প্রতিপক্ষ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো) এবং মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়া (প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড)।

২০৩০ বিশ্বকাপে কি এমন দৃশ্য আবার দেখা যাবে? অধ্যাপক ব্রাঙ্কিনহোর সাফ জবাব, “ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগের কোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড়কে ২০৩০ বিশ্বকাপে ৪০ বছর বয়সে দেখা যাবে না। ঠাসা সূচির কারণে এলিট ফুটবলে এটা অসম্ভব।”

জেকোকে যখন ২০৩০ বিশ্বকাপ নিয়ে প্রশ্ন করা হলো, তিনি হেসেই খুন। “নাহ, একদমই না! ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে ক্লাব ও দেশের হয়ে এই বিশ্বকাপে খেলতে পারাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।”

বুড়ো হাড়ের এই ভেল্কি দেখার জন্য ফুটবল বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছে। উদীপ্ত তারুণ্যের গতি বনাম চল্লিশের অভিজ্ঞতার এই লড়াই ২০২৬ বিশ্বকাপকে দেবে এক অনন্য মাত্রা।

আরএ/এসটি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর