ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব বিশ্বকাপ আসছে, আর তার সঙ্গে নিউইয়র্ক অঞ্চলে আসছে লাখ লাখ ফুটবলপ্রেমী। কিন্তু শুধু মাঠের উত্তেজনা নয়, হোটেল, রেস্তোরাঁ আর রাতের জীবনেও নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে যৌনকর্মীদের মধ্যে বুকিংয়ের বন্যা বইছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক হয়ে উঠেছে মানব পাচারের ঝুঁকি নিয়ে। এমনটায় জানায় নিউইয়র্ক পোস্টের এক বিশেষ প্রতিবেদনে।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ১৩ জুন থেকে শুরু হয়ে ১৯ জুলাইয়ের ফাইনাল পর্যন্ত আটটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। আয়োজকরা আশা করছেন, প্রায় ১২ লাখ ফুটবল ভক্ত এ অঞ্চলে আসবেন। এই পর্যটকদের ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে অঞ্চলটিতে প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। এতে ২৬ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু এই স্বপ্নের পাশাপাশি বাস্তবে হোটেল বুকিংয়ের গতি কিছুটা ধীর বলেও কিছু প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে ভিন্নতা এসেছে যৌনকর্মীদের ব্যবসায়। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে ফুটবল বিশ্বকাপ সামনে রেখে ‘চাহিদা’র তুঙ্গে রয়েছে যৌনকর্মীদের ব্যবসা।
যৌনকর্মীদের ‘চাহিদা’ তুঙ্গে
বিশ্বকাপের এই ঢেউ সবচেয়ে সরাসরি অনুভব করছেন রাতের শহরের কর্মীরা। ব্রুকলিনভিত্তিক একজন ৩১ বছর বয়সী যৌনকর্মী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) নিউইয়র্ক পোস্টকে জানিয়েছেন, তার কিঙ্ক-কেন্দ্রিক সেবা বিশেষ করে ফুট ওয়রশিপের জন্য একদিনের চার্জ ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত। বিশ্বকাপের ম্যাচের সূচির সঙ্গে মিলিয়ে তার কাছে সেশন রিকোয়েস্টের বন্যা চলছে।
মে মাসে তার অনলাইন প্রোফাইলে এনগেজমেন্ট তিনগুণ বেড়েছে। সাধারণত প্রতি মাসে মাত্র একটি কাপলের অনুরোধ আসে, কিন্তু গত মাসে এসেছে ২৫টি। তিনি বলেন, ‘টাকাই সবকিছু। সঠিক দাম পেলে এবং সেবাটি আমার পছন্দ হলে অবশ্যই করব। বিশ্বকাপে আসা টুরিস্টরা যদি সঠিক অঙ্কের টাকা দেয়, তাহলে এককালীন সেবাও দিতে আপত্তি নেই।’
নিউ জার্সির আরেক যৌনকর্মী ‘স্পাইস ভি’ জানিয়েছেন, তিনি ইতিমধ্যে কয়েকটি ৩ হাজার ডলারের ডিপোজিট পেয়েছেন। জুন মাস তার সিডিউল প্রায় পূর্ণ। লন্ডনসহ ইউরোপ থেকে এবং আমেরিকার কলোরাডো থেকে ক্লায়েন্ট আসছেন। তিনি বলেন, ‘ক্লায়েন্ট আসার পর সবসময় উপলব্ধ থাকার উচ্চ প্রত্যাশা রয়েছে। আমি খুবই আশাবাদী।’
বিজ্ঞাপন
স্পাইস ভি জানান, এরই মধ্যে ইউরোপ থেকে দুজন ক্লায়েন্ট নিশ্চিত হয়েছেন। ম্যাচের বিরতিতে তার সময় নিশ্চিত করার জন্য ইতিমধ্যেই ৩,০০০ ডলার অগ্রিম জমা দিয়েছেন। যাদের একজন লন্ডনের বাসিন্দা। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো থেকেও একজন বিশ্বকাপ দর্শক তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
এই বৃদ্ধির পেছনে শুধু একক পুরুষ নয়, দম্পতিদের আগ্রহও উল্লেখযোগ্য। অনেকে তিনজনের সম্পর্ক (থ্রি-ওয়ে) খুঁজছেন। এটি দেখায়, বিশ্বকাপ শুধু খেলা দেখতে নয়, নতুন অভিজ্ঞতা ও বিনোদনের জন্যও পর্যটকরা প্রস্তুত।
অর্থনৈতিক চিত্র: সুযোগ ও বাস্তবতা
বিশ্বকাপকে ঘিরে অঞ্চলটির অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য আসবে বলে আশা। হোটেল, রেস্তোরাঁ, শপিং মল, ট্যাক্সি ও ট্যুরিজম সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলো সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। পর্যটকদের ব্যয়ের একটি বড় অংশ স্থানীয় ব্যবসায় ঢুকবে, যা কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং ট্যাক্স রাজস্ব বৃদ্ধি করবে। আয়োজকদের প্রতিবেদন অনুসারে, ১.৭ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি ব্যয় হতে পারে।
তবে কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোটেল বুকিং এখনও প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে বুকিং কম। উচ্চমূল্য, আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জটিলতা ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এর কারণ হতে পারে। তারপরও সামগ্রিকভাবে ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। মেটল্যান্ডস এলাকায় হোটেল ও লজিস্টিকস সেক্টর বিশেষভাবে উপকৃত হবে।
অন্ধকার দিক: মানব পাচারের ঝুঁকি
বড় আকারের কোনো ইভেন্ট মানব পাচারকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। নিউ জার্সি স্টেট পুলিশ ১,২০০ ট্রুপার মোতায়েন করবে বিভিন্ন ইভেন্টে। মন্টভিল পুলিশ চিফ অ্যান্ড্রু ক্যাগিয়ানো বলেছেন, ‘বড় ইভেন্টে দৃশ্যমান হুমকির পাশাপাশি মানব পাচারও বেড়ে যায়।’ ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের ফিনসেন সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বকাপের সময় সেক্স ও লেবার ট্রাফিকিং বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে।
নিউ জার্সির অ্যাটর্নি জেনারেল জেনিফার ড্যাভেনপোর্ট জানিয়েছেন, এটি তাদের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বড় পরীক্ষা। এনজে কোয়ালিশন অ্যাগেইনস্ট হিউম্যান ট্রাফিকিং ‘ইটস এ পেনাল্টি’র সঙ্গে যৌথভাবে সচেতনতা কর্মসূচি চালাচ্ছে। পাবলিক সচেতনতা, ভিকটিম সাপোর্ট এবং সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা চলছে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
বিশ্বকাপ শেষ হলেও এর প্রভাব থেকে যাবে। সফল আয়োজন নিউইয়র্ক-নিউ জার্সিকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আরও শক্তিশালী করবে। নতুন অবকাঠামো, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন সম্ভব। কিন্তু যদি নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকে, তাহলে সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যৌনকর্মীদের এই অস্থায়ী উত্থানও প্রশ্ন তুলছে; এই চাহিদা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে এবং অবৈধ পাচার রোধ করা হবে। এই সময়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং সহায়তা সেবা জোরদার করা জরুরি।
সূত্র- নিউইয়র্ক পোস্ট




