মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০২৪, ঢাকা

ইউক্রেন যুদ্ধ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বড় সংকটে বিশ্ব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২০ ডিসেম্বর ২০২২, ০৭:২৭ এএম

শেয়ার করুন:

ইউক্রেন যুদ্ধ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বড় সংকটে বিশ্ব

ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসন ৯ মাসের বেশি সময় ধরে চলছে। ত্বরিত সামরিক অভিযানে ইউক্রেনের সরকারকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে যে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু হয়েছিল, সেটা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার সামরিক ও সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ যুদ্ধের মাধ্যমেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে বিশ্ব।

আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ব্যাপক। যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। নয় মাস ধরে চলমান এ যুদ্ধ আগে থেকেই সংকটে থাকা বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ে গেছে ভিন্ন এক বাস্তবতায়; দেখা দিয়েছে মন্দার শঙ্কা। বলা হচ্ছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সীমান্তের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রভাব ফেলেছে সবার ওপর।


বিজ্ঞাপন


পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ জ্বালানি সংকট, মুদ্রাস্ফীতিসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। করোনাভাইরাস মহামারিতে থমকে যাওয়া বিশ্বকে আবার সংকটের মুখে ফেলেছে ইউক্রেন যুদ্ধ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মন্দা যে আসন্ন তা প্রমাণের জন্য খুব বেশি পেছনে তাকানোর প্রয়োজন নেই। সম্প্রতি হাউজিং মার্কেটে ধস নেমেছে, উল্টে গেছে বন্ড মার্কেটের বক্ররেখা। আর ফেডারেল রিজার্ভের অনুমান, ২০২৩ সালে বাড়বে বেকারত্বের হার। যার সবই মন্দার দিকে ইঙ্গিত করে। আলোচনায় তেমন না থাকলেও, সম্ভাব্য মন্দার পেছনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে তেলের বাজার।

 crisis

বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা নিরূপণের জন্য সুপরিচিত সংস্থা– যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাভিত্তিক নেড ডেভিস রিসার্চ। তাদের গবেষণা মডেল অনুসারে, আগামী বছরে মন্দার ঝুঁকি এখন ৯৮.১ শতাংশ। ২০২০ সালে করোনা মহামারিজনিত মন্দা এবং ২০০০-’০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর যা সর্বোচ্চ।


বিজ্ঞাপন


তবে বড় শঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে। পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, দেশটির ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার বাড়াতে থাকায় মন্দার গ্রাসেই পড়তে যাচ্ছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অর্থনীতিটি। আর মার্কিন তরী ডুবলে, তারা বাকি বিশ্বকে সঙ্গে নিয়ে ডুববে বলেই শঙ্কা বিশ্লেষকদের।

এছাড়াও ইউরোপের বৃহত্তম তিন অর্থনীতি – জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্য আগামী বছর দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কবলে পড়বে বলে শঙ্কা রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া থেকে জ্বালানি সরবরাহে ধস নামাকেই এর মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক রোয়েল বিটসমা বলেছেন, ‘এ শতকের শুরুতে অসংখ্য সংকট শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন কঠিন পরিস্থিতি আমরা আর কখনো দেখিনি।’

করোনায় বিপর্যস্ত ২০২০ সাল শেষে বিশ্ব যখন ২০২১ সালে পা দিল তখন বাড়তে থাকল জিনিসপত্রের দাম, দেখা দিল মুদ্রাস্ফীতি। অর্থনীতিবিদরা বললেন, এই মুদ্রাস্ফীতি সাময়িক সময়ের জন্য। দ্রুতই এটি কমে যাবে। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা করার পর বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়। 

বিশ্বের অনেক দেশ এখন মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও সেই অনুযায়ী বেতন না বাড়ায় এখন খরচের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ব্যাংকগুলো ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে সুদের হার বাড়িয়েছে। এতে করে বিশ্বব্যাপী বেড়েছে মন্দার শঙ্কা। কারণ সুদের হার বাড়ানোর কারণে মানুষ ব্যাংক থেকে ঋণ কম নেবে। এতে করে ধীর হয়ে আসবে অর্থনৈতিক কার্যক্রম। 

 crisis

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনোমিক কোঅপারেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) জানিয়েছে, বিশ্বের ২০টি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এ বছরের শেষ পর্যন্ত খুচরা পণ্যের দাম ৮ ভাগ বৃদ্ধি পাবে। পরের বছরের শুরুতে তা ৫.৫ ভাগে নেমে আসতে পারে। ওইসিডি বিশ্বের সব দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন সাধারণ মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসে।

জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব যেন সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে সে চেষ্টা চালাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশ। এজন্য ৬৭৪ বিলিয়ন ইউরোর সহায়তা প্যাকেজ হাতে নিয়েছে তারা। এরমধ্যে জার্মানি নিজ নাগরিকদের জন্য খরচ করবে ২৬৪ বিলিয়ন ইউরো। কারণ রাশিয়ার জ্বালানির ওপর অতি নির্ভরশীল জার্মানিই সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে।

জানা গেছে, জার্মানিতে এখন প্রতি দুইজনের মধ্যে একজন ভেবে-চিন্তে খরচ করছেন। তারা প্রয়োজনীয় পণ্যটি আগে বেছে নিচ্ছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে জার্মানি, ইতালি মন্দায় পড়বে। যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিও নিম্নমুখী।

যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এখনো আশা করছে ২০২৩ সালে ২.৭ ভাগ হারে অর্থনৈতিক পরিধি বাড়বে। ওইসিডির মতে এটি হতে পারে ২.২ ভাগ। এছাড়া প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২৬৮ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে বন্যার কারণে শুধুমাত্র পাকিস্তানই ৩০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

তবে সম্ভাবনা যদি সত্যিও হয় তারপরও মানুষের দুর্দশা হয়তো এখনই কমবে না। মন্দা মোকাবেলায় প্রত্যেক দেশের সরকার ও সাধারণ মানুষকেও সতর্ক হতে হবে।

একে

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর