মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০২৪, ঢাকা

বিএম ডিপোর ভয়াবহ আগুন কেড়ে নেয় অর্ধশত প্রাণ

খলিলুর রহমান
প্রকাশিত: ১৯ ডিসেম্বর ২০২২, ০৫:৩৪ পিএম

শেয়ার করুন:

বিএম ডিপোর ভয়াবহ আগুন কেড়ে নেয় অর্ধশত প্রাণ

শেষ হতে চলেছে ২০২২ সাল। নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্যে অতিবাহিত হয়েছে বছরটি। তবে এ বছর সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকাণ্ড সবার মনে নাড়া দিয়েছিল। ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ড ৫১ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। শুধু তাই নয়, বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের ৮৬ ঘণ্টা পর পুরোপুরিভাবে আগুন নিভাতে সক্ষম হয়েছিলেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।

যেভাবে আগুনের সূত্রপাত


বিজ্ঞাপন


৪ জুন রাত ৯টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় বিএম কনটেইনার ডিপোতে প্রথমে আগুন ও পরে বিস্ফোরণ ঘটে। কনটেইনারে থাকা রাসায়নিক পদার্থের কারণে দফায় দফায় বিস্ফোরণে বাড়ে আগুনের ভয়াবহতা। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরের এলাকাও কেঁপে ওঠে। ওই রাতেই ঘটনাস্থল থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয় দুই শতাধিক হতাহতকে।

পরে চট্টগ্রাম অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি করা হয। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি ওই কনটেইনারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মালিকপক্ষ এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরগুলো দায় এড়াতে পারে না। সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে আগুন লাগার ৮৬ ঘণ্টা পর বিভিন্ন বাহিনীর চেষ্টায় নেভানো হয়। ওই ঘটনায় ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ। অগ্নিকাণ্ডের এক মাস পরও সেখান থেকে পোড়া হাড়গোড় উদ্ধার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে।

01

এছাড়া অগ্নিকাণ্ডের পর বিভিন্ন সংস্থার পরিদর্শনে ওই ডিপোতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড থাকার বিষয়টি উঠে আসে। বিএম ডিপোর মালিক স্মার্ট গ্রুপের সহযোগী আল রাজী কেমিকেল কমপ্লেক্স থেকে এসব রাসায়নিক বিদেশে রফতানির জন্য সেখানে রাখা ছিল।


বিজ্ঞাপন


কী ঘটেছিল সীতাকুণ্ডে?

বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের দুই কোম্পানির যৌথ বিনিয়োগে বেসরকারি এই ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোটি গড়ে তোলা হয় ২০১১ সালে। এর মালিকানায় আছেন বাংলাদেশের স্মার্ট গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান এবং তার ছোট ভাই চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের নেতা মুজিবুর রহমান।

ডিপোতে রাখা হাইড্রোজেন পার অক্সাইডই যে আগুনকে ভয়ংকর রূপ দিয়েছে, সে কথা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা শুরু থেকেই বলেছেন।

চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে ওই কন্টেইনার ডিপোতে আগুনের শুরুতে ফায়ার সার্ভিসের কুমিরা ও সীতাকুণ্ডের দুটি ইউনিট তা নেভানোর চেষ্টা করে। কিন্তু একের পর এক বিস্ফোরণ শুরু হলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিকট বিস্ফোরণের ধাক্কায় বহুদূর পর্যন্ত কেঁপে ওঠে, পাশের গ্রামের ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা।

ডিপো কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে ৪৪০০ এর মতো কন্টেইনার ছিল। এর মধ্যে অন্তত ৪০০ কন্টেইনার ধ্বংস হয়েছে বলে সে সময় তথ্য দিয়েছিলেন উদ্ধারকর্মীরা।

02

যারা নিহত হয়েছেন তাদের মধ্যে ৯ জনই ফায়ার সার্ভিসের কর্মী।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা

অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় বেসরকারি এ টার্মিনালের আটজনকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ। ডিপোতে অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে।

আসামিরা হলেন- বিএম কন্টেইনার ডিপোর ডিজিএম (অপারেশন) নুরুল আকতার, ম্যানেজার (অ্যাডমিন) খালেদুর রহমান, সহকারী অ্যাডমিন অফিসার আব্বাস উল্লাহ, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ নাসির উদ্দিন, সহকারী ব্যবস্থাপক (ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো) আবদুল আজিজ, কন্টেইনার ফ্রেইট স্টেশনের ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম, একই বিভাগের নজরুল ইসলাম ও জিএম (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) নাজমুল আকতার খান।

ডিপোর মালিকানায় যারা

চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে ২৪ একর জায়গা নিয়ে ২০১১ সালের মে মাসে বিএম কন্টেইনার ডিপোটি গড়ে উঠে। যৌথ মালিকানা হলেও ডিপোর বেশিরভাগ শেয়ারের মালিক মূলত স্মার্ট গ্রুপ। এই ডিপোতে আমদানি ও রফতানি পণ্যের কন্টেইনার ব্যবস্থাপনা ও খালি কন্টেইনার সংরক্ষণের কাজ হয়ে থাকে।

রফতানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার এখানে আসার পর বিদেশে পাঠানোর জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয়। আমদানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার ডিপোতে এনে বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে সংশ্লিষ্ট মালিকদের কাছে পাঠানো হয়।

03

দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান। বিএম ডিপোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তাফিজুর। আর তার ছোট ভাই মুজিবুর রহমান সেটির পরিচালক। এর ৩৫ লাখ শেয়ারের মধ্যে এক লাখ ৩৮ হাজার শেয়ার মুস্তাফিজুর রহমানের নামে, পরিচালক মুজিবের নামে আছে ১৫ হাজার শেয়ার। নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সালে স্মার্ট গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠান স্মার্ট জিন্সের নামে ১৮ লাখ ৩৬ হাজার শেয়ার হস্তান্তর করে। স্মার্ট গ্রুপের পার্টনার নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠান প্রংক পার্টিসিপেটের নামে আছে ১৫ লাখ ১১ হাজার শেয়ার।

দুর্ঘটনার দিন ডিপোটিতে থাকা বেশিরভাগ কন্টেইনারই তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের। এছাড়া মুজিবুর রহমানের মালিকানাধীন আল-রাজী কেমিকেল কমপ্লেক্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি হাইড্রোজেন পার অক্সাইড সেখানে রফতানির জন্য রাখা ছিল।

ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী স্মার্ট গ্রুপের মোট ১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে দৈনিক পূর্বদেশ নামে চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক পত্রিকার মালিকও তারা। যেটির সম্পাদক মুজিবুর রহমান নিজেই।

05

গ্রুপটির অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হল- স্মার্ট জিন্স, স্মার্ট জ্যাকেট লিমিটেড, সেহান স্পেলাইজড টেক্সটাইলস মিলস, বিএম এনার্জি লিমিটেড, বিএম এনার্জি লিমিটেড-ইউনিট ২, ডেনিম মিলস লিমিটেড, গ্লোব টেক্সাইলস মিলস, সিটি হোম প্রপার্টিস, স্মার্ট শেয়ার ও সিকিউরিটিজ এবং স্মার্ট বায়ো ইনসেপশন লিমিটেড।

হাইড্রোজেন পার অক্সাইড

অগ্নিকাণ্ডের পরদিন সেখানে গিয়ে পোড়া ও জ্বলন্ত কনটেইনারের আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেল নীল রঙের বেশকিছু জেরিকেন। ফেটে বা গলে যাওয়া সেসব জেরিকেনের গায়ে লেখা ছিল হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড। তাপ পেলে যে সেগুলো বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে- সে সতর্কবাণীও লেখা ছিল গায়ে। ডিপোতে মোট ৩৭টি কন্টেইনারে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড ছিল। প্রতি কন্টেইনারে ছিল ৬৮০টি করে জেরিকেন। প্রতি জেরিকেনে ৩০ লিটার করে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড ছিল। ৩৭টি কন্টেইনারের মধ্যে ২৫টি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আর বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ডিপোটিতে রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থ রাখার অনুমতি ছিল না। শুধু হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের কারণে বিস্ফোরণ হয়নি। সেখানে অন্য কোনো দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি থাকতে পারে বলে ধারণা তাদের। রাসায়নিক রাখার বিষয়ে ডিপো কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের ছাড়পত্র পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে নেয়নি বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি।

কেআর/জেএম

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর