মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০২৪, ঢাকা

গ্যাস কূপ খননের নতুন রেকর্ড

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ০১ জানুয়ারি ২০২৩, ১১:৪৫ এএম

শেয়ার করুন:

গ্যাস কূপ খননের নতুন রেকর্ড

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর হঠাৎ করেই চরম জ্বালানি সংকটে পড়ে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ। বাংলাদেশকেও পড়তে হয়েছে সেই সংকটে। আর এরপর থেকেই গ্যাস অনুসন্ধানে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ফলস্বরূপ ২০২২ সালে রেকর্ড সংখ্যক কূপ খনন করেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। আরও গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননের দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি বেশকিছু পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, দেশিয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে পেট্রোবাংলা চলতি বছরে মোট ৯টি কূপ খননের কার্যক্রম গ্রহণ করে। এর মধ্যে ৩টি অনুসন্ধান কূপ টবগী-১, শ্রীকাইল নর্থ-১ ও শরীয়তপুর-১; ১টি উন্নয়ন কূপ ভোলা নর্থ-২ এবং ৫টি ওয়ার্কওভার কূপ সিলেট-৮, কৈলাশটিলা-৭, সালদা-২, সেমুতাং-৬ ও বিয়ানিবাজার-১।


বিজ্ঞাপন


টবগী-১ অনুসন্ধান কূপের খনন কাজ এরইমধ্যে শেষ হয়েছে এবং এ কূপ থেকে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলিত হচ্ছে। ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট টবগী-১ অনুসন্ধান কূপ খননের কাজ শুরু করে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম। ২৯ সেপ্টেম্বর ৩ হাজার ৫২৪ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খনন কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর সেখানে সম্ভাব্য মজুত ও উৎপাদনের হার নিরূপণে কারিগরি পরীক্ষা হয়। ভূতাত্তিক তত্ত্ব অনুযায়ী এখানে গ্যাসের সম্ভাব্য মজুদ প্রায় ২৩৯ বিলিয়ন ঘনফুট। দৈনিক গড় ২০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস উৎপাদন বিবেচনায় কূপ থেকে ৩০-৩১ বছর গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব বলে খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে জানানো হয়।

power

২৪ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা জেলার শ্রীকাইল নর্থ-১ এ অনুসন্ধান কূপের খনন শুরু হয়। খনন শেষ হলে ১০-১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতে পারে বলে আশা করছে পেট্রোবাংলা।

প্রতিষ্ঠানটি জানায়, কূপের গভীরতা হবে ৩৫০০ মিটার। খনন কাজে বাপেক্সের নিজস্ব রিগ বিজয়-১২ ব্যবহার করা হচ্ছে। কূপ খনন শেষে বাণিজ্যিকভাবে দৈনিক ১০-১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতে পারে বলে আশা করা যায়। এ কূপ থেকে গ্যাস পাওয়া গেলে প্রসেস প্লান্ট স্থাপনের প্রয়োজন হবে না, গ্যাস গ্যাদারিং পাইপ লাইন নির্মাণ করে তা নিকটবর্তী প্রসেস প্লান্টের (৫-৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রসেস প্লান্ট, যেখানে আরও ২০ মিলিয়ন গ্যাস প্রসেসের সক্ষমতা রয়েছে) মাধ্যমে প্রসেস করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।


বিজ্ঞাপন


শ্রীকাইল নর্থ-১ ও শরীয়তপুর-১ কূপ ২টির খনন নিজস্ব রিগ দিয়ে করছে বাপেক্সে। অপরদিকে টবগী-১ কূপটি বাপেক্সের ঠিকাদার হিসেবে গ্যাজপ্রম তাদের রিগ দ্বারা খনন করে। এছাড়া ভোলা নর্থ-২ উন্নয়ন কূপের খননের সব প্রস্তুতি এরইমধ্যে শেষ হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই খননকাজ আরম্ভ করা হবে বলে জানিয়েছে বাপেক্স। এ কূপটিও বাপেক্সের ঠিকাদার হিসেবে গ্যাজপ্রম তাদের রিগ দিয়ে খনন করবে।

এদিকে এ বছরের ৫টি ওয়ার্কওভার কূপের সবকটির খননকাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে সেমুতাং-৬ (চাপ কম থাকায় ওয়ার্কওভার শেষে এ কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হয়নি) ব্যতীত অপর ৪টি (সিলেট-৮, কৈলাশটিলা-৭, সালদা-২ ও বিয়ানিবাজার-১) ওয়ার্কওভার সফল হয়েছে। বিয়ানিবাজার-১ কূপের ওয়ার্কওভার সম্প্রতি শেষ হয়েছে এবং উক্ত কূপ থেকে দৈনিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলিত হচ্ছে। যা গত ২৮ নভেম্বর থেকে জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে। গ্যাসের সাথে প্রতিদিন ১২০-১৩০ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যাবে এখান থেকে।

এছাড়া এ বছর ওয়ার্কওভার কার্যক্রমের আওতায় শেভরন বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের ৬টি কূপের টিউবিং চেঞ্জ প্রোগ্রাম (টিসিবি) কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। ফলে এ ৬টি কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধি পায়। কূপ খননের এ ধারা অব্যাহত রেখে পেট্রোবাংলা ২০২৫ সালের মধ্যে দৈনিক ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবে বলে জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

power

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ভোলা গ্যাস ফিল্ডের টবগি-১ খনন দারুণভাবে সফল। ৩ হাজার ৫১৯ মিটার খনন শেষ হয়েছে। শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র থেকে টবগী-১ কূপ এলাকাটি ৩ দশমিক ১৭ কিলোমিটার দূরে। মজুদ বিবেচনায় ৩০-৩১ বছর উত্তোলন করা সম্ভব হবে। প্রতি ইউনিটের মূল্য ১১ টাকা করে ধরলে এর মূল্য ৮ হাজার কোটি টাকা দাঁড়াবে। তবে এই গ্যাস ব্যবহারে দুই বছর সময় লাগতে পারে।

একই দিনে প্রতিমন্ত্রী জানান, জুন ২০২৩ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে আরও দুটি কূপ ইলিশা-১ ও ভোলা নর্থ-২ খনন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে ৩টি কূপ হতে দৈনিক ৪৬-৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হতে পারে। এর জন্য প্রসেস প্ল্যান্ট বসাতে অন্তত দেড় বছর লাগবে। এখন স্বল্প পরিসরে গ্যাস আনা হবে। পরে স্থায়ীভাবে ভোলা-বরিশাল হয়ে পাইপলাইন করা হবে। আগামী ৩-৪ বছরের মধ্যে ৭০০-৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যোগ করা সম্ভব। তবে চলমান গ্যাস সংকটে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ঠিক রাখতে ভোলার কূপ থেকে গ্যাস সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস (সিএনজি) আকারে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আগামী জানুয়ারি থেকেই সিএনজি আকারে গ্যাস আনা শুরু হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার এক যুগে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করেছে। সামনের দিনগুলোতে দেশের অর্থনীতি ও শিল্পায়নকে আরও গতিশীল করতে আমাদের বাড়তি গ্যাস প্রয়োজন। সেই চাহিদা পূরণে আমরা দেশিয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও উৎপাদনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। ২০২৫ সালের মধ্যে আরও ৪৬টি নতুন অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার কূপ খনন করব। আশা করছি, এসব কূপ থেকে দৈনিক ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, ২০২২ সালে রেকর্ড পরিমাণ কাজ হয়েছে। সিলেটে ওয়ার্কওভার কূপে গ্যাস পেয়েছি। বিয়ানিবাজারেও পেয়েছি যেখান থেকে ৮-১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। টবগীতে ২০ মিলিয়নের বেশি গ্যাস পেয়েছি। এই সবগুলোই এই বছরের সাফল্য। এছাড়া আরও তিনটা রানিং প্রজেক্ট প্রায় শেষপর্যায়ে। ভোলা নর্থ কূপের ৩৫০০ মিটারের মধ্যে প্রায় তিন হাজার মিটার খনন হয়ে গেছে। শরিয়তপুরেও ১২০০ মিটার খনন হয়ে গেছে। এই বছরে যা কাজ হয়েছে গত ১০ বছরেও তা হয় নাই।

টিএই/এএস

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর