পরিবারকে গ্রামে পাঠানোর চিন্তা চাকরিজীবীদের

প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট ২০২২, ১১:০৮ পিএম
পরিবারকে গ্রামে পাঠানোর চিন্তা চাকরিজীবীদের

খুলনার জিয়াউল কবির। ঢাকায় একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করেন। গত ১২ বছর ধরে ঢাকায় থাকলেও আর থাকা হবে কিনা তা নিয়ে তার যতো চিন্তা। বাড়ছে উদ্বেগ আর শঙ্কাও। সেই শঙ্কাটা দিনকে দিন প্রকট হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। অবশ্য সেই কারণটাও জানালেন। তিনি  বললেন, যে হারে ঢাকা শহরে লিভিং কস্ট (জীবনযাপন ব্যয়) বাড়ছে আর মনে হয় থাকা হবে যাবে না। ভাবছি চলতি বছরে পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিব। তাছাড়া উপায় দেখছি না।  

শনিবার দুপুরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে বিআরটিসি বাসযোগে গুলশান আসার পথে কথা হচ্ছিল তার সাথে । দেশে হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে তিনি এমন করে ভাবতে শুরু করেছেন বলেও জানালেন। 

বৃহস্পতিবার রাতেও তিনি এমন করে ভাবেননি। কিন্তু শুক্রবার রাতে তেলের দাম বাড়ার খবরে তার মাথায় বাড়তি ভাড়া, সংসারের ব্যয় মেটানো, মেয়ের স্কুল, প্রাইভেট, যাতায়াত ছাড়াও অন্যান্য খরচ জোগাতে হিমসিম খেতে হবে। এসব রসায়ন ভাবতেই নাকি তার মাথা ধরে আসছে বারবার। এ কারণে তিনি ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ৭ বছরের ছোট মেয়ে ও স্ত্রীকে খুলনায় পাঠাবেন। তারপর ঢাকার আশপাশে কোনো স্বল্প ব্যয়ের ছাত্র বা কর্মজীবীদের মেসে উঠে যাবেন বলেও জানালেন তিনি। 

শুধু  জিয়াউল কবির নন, তার মতো মধ্যবিত্তের আয়ে যাদের জীবন চলছে এই ঢাকায় এখন অধিকাংশ জনই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তারা বলছেন, হয়ত এই মুহুর্তে তা বাস্তবায়ন অসম্ভব কিন্তু বছর শেষ হলেই তার বাস্তবায়ন তারা ঘটাতে চান। 

কারণ হিসেবে কেউ কেউ জানালেন, তাদের ছেলেমেয়েদের অনেকে রাজধানীর বিভিন্ন নামী দামী স্কুলে পড়াশোনা করছে। বছরও এখন শেষ হয়নি। তাই পড়াশোনায় ব্যাঘাত যেন না ঘটে তাই তারা এখন পরিবারের সদস্যদের গ্রামে পাঠানোর চিন্তা আপাতত করতে পারছেন না। 

২০২০ সালে করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। তার সাথে যোগ হয়েছিল গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি। এবার সেই তালিকায় যোগ হলো জ্বালানি তেল। করোনার কারণে অনেক পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তিরা তাদের চাকরি হারিয়েছেন। ফলে তাদের অনেকেই এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। এরই মাঝে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি তাদের উপর এখন খড়ার ঘা হবে বলে মনে করছেন অনেকে। এই কারণেও অনেকে আর কুলায় উঠতে না পেরে পরিবার পরিবারজনকে গ্রাম বা মফস্বল শহরে পাঠানোর কথা চিন্তা করতে শুরু করেছেন। 

করোনার সময় চাকরি হারিয়ে অনেকে যেমন বেকার হয়েছেন তেমনি আবার কারও কারও বাড়তি বেতনও কমেছে। তাদের অনেকে বড় বাসা ছেড়ে অর্ধেক ভাড়ার বাসা নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সেই বাসায় অনেককে ছাড়তে হবে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।  

তেলের দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়বে নিত্য নৈমিত্যিক বাজার পণ্যে। ব্যয় বাড়লেও আয় বাড়বে না।  গুলশান এলাকায় কথা হচ্ছিল শাহজাহান মিয়ার সাথে। তিনি বললেন, আমাদের অবস্থা এখন ধারালো ছুরির উপর বসে থাকার তো। আমরা না পারছি শহর ছাড়তে, না পারছি গ্রামে গিয়ে থাকতে। কারণ আমাদের তো বাড়তি আয়ের কোন পথ নেই। এ কারণে ভাবছি পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে নিজে কোন মেসে থাকব। তাছাড়া কোন বিকল্প পথ দেখছি না। 

এসময় তার পাশেই থাকা বাসের জন্য অপেক্ষমান হায়দার বাদশা নামের একজন বলেন, আমাদের অবস্থা তো নাভিশ্বাস। গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়লো। এবার বাড়লো তেলের দাম। আমরা যাব কই। সবাই তো দাম বাড়াচ্ছে কিন্তু আমাদের তো আয় বাড়ছে না। তাহলে ব্যয় কমানোর জন্য অন্য কিছু চিন্তা শুরু করতে হবে। 

জয়নাল আবেদীন। থাকেন ধানমন্ডি এলাকায়। সকালে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে। সেই সময় তার সাথ কথা হয়। তিনি জানালেন, প্রতি মাসে তিনি বেতন পান ৩৫ হাজার টাকা। এ থেকে বাসা ভাড়া, দুই ছেলের পড়াশোনা, প্রাইভেট ও স্কুলের বেতন দেন। এছাড়াও তাদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার জন্য বাড়তি ১ থেকে দেড় হাজার টাকা গুনতেন তিনি। কিন্তু এখন সেটিও সম্ভব হবে না। তিনি আরও জানালেন, তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহী জেলায়। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় এখন তিনিও অন্যদের তো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পরিবারকে গ্রামে পাঠাবেন। তিনি মনে করেন, পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে খরচ কমানো ছাড়া আর কোন বিকল্প পথ তার জানা নেই। 

গত ছয় মাসে দুই দফা বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম। এছাড়াও কয়েক বছরে দফায় দফায় বেড়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের দামও। এর ফলে তার প্রভাব পড়েছে খোলা ও পাইকারী বাজারে। বিশেষ করে নিত্য পণ্যের দাম এখন আকাশ ছোঁয়া বলে জানালেন বেসরকারি চাররিজীবী সুমন ইসলাম। তিনি বলেন, আমরা তো ভাল নেই। গরীবকে পিষে মারার সকল আয়োজন চলছে। এখন শুধু বাকি আছে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে তেল, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার পালা। তাহলে তো পোয়াবারো সরকারের।

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন হারে তেলের দাম কখনো বাড়েনি। এর ফলে আগামীকাল থেকে সকল কিছুর দাম বাড়ছে।  

এমআইকে/একেবি  

 

টাইমলাইন