বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

সংসার চালানোর ‘নতুন ছক’ কষছে মানুষ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট ২০২২, ১১:০৭ এএম

শেয়ার করুন:

সংসার চালানোর ‘নতুন ছক’ কষছে মানুষ

দীর্ঘদিন ধরেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। ভোজ্যতেল, চাল, ডাল আটা থেকে শুরু করে এমন কোনো পণ্য নেই যার দাম বাড়েনি। ফলে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মানুষকে। পণ্যের এমন লাগামহীন দামের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেল।

গতরাতে অস্বাভাবিক হারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় নতুন করে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে মানুষের কপালে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ সামনের দিনে সংসার কিভাবে চালাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তেলের দাম বাড়ায় প্রভাব অন্যান্য পণ্যেও পড়বে এমন আশঙ্কা থেকে সংসার চালাতে নতুন ছক কষছেন মানুষ।


বিজ্ঞাপন


শুক্রবার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর ফেসবুকে এক স্ট্যাটাস দিয়ে উদ্বেগের কথা জানান দেশের প্রথম সারির একটি বেসরকারি টেলিভিশনে কর্মরত আনোয়ার হোসেন। তিনি লিখেছেন, 'অধিকাংশই দেখছি গাড়ি নিয়ে শঙ্কিত। কিন্তু এবছর যে অনাবৃষ্টির। তাই বর্ষা মৌসুমে ধান চাষে সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পূর্বাভাস আগামী দুই মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হবে না। তেলের এত মূল্যবৃদ্ধিতে সেচযন্ত্র দিয়ে ধান চাষ চালিয়ে যেতে পারবে তো কৃষক? সামনের আমন মৌসুমে পর্যাপ্ত উৎপাদন করা যাবে তো? সম্প্রতি সারের দামও বেড়েছে। সবমিলিয়ে নানান শঙ্কা তৈরি হচ্ছে মনে।'

আরও পড়ুন: তেল নিয়ে হিসাব মিলছে না বিশেষজ্ঞদেরও!

এত গেল আনোয়ার হোসেনের চিন্তার কথা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় গণপরিবহনে ভাড়া বাড়বে। তাই কিভাবে কর্মস্থলে যাওয়া আসা করবেন তা নিয়ে নিজের পরিকল্পনা অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করতে গিয়ে আহমেদ বাপ্পী লিখেছেন, আপনারা নিজ নিজ গন্তব্যে হেঁটে হেঁটে যাওয়ার অভ্যাস করুন, খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে রওনা দিবেন।


বিজ্ঞাপন


আর তেলের দাম বাড়ার ঘোষণার পরপরই সংসারে বিলাসজাত পণ্য ব্যবহার বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন শফিকুল ইসলাম সবুজ।

আর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার খবর শোনার পর চিন্তায় পড়েছেন চাকরিজীবী সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ায় সংসার চালাতে নতুন হিসাব করছি। এখন মাছ-মাংস কেনা কমিয়ে দেবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এছাড়া আগে যে পথ রিকশায় যেতাম, এখন সে পথ হেঁটে যাবো বলে পরিকল্পনা করেছি।

গত নভেম্বরে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে এক লাফে ১৫ টাকা বাড়িয়েছিল সরকার। তখন দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮০ টাকা লিটার। ডিজেলের দাম বাড়ানোর পর বাসভাড়া বাড়ানো হয় প্রায় ২৭ শতাংশ, যা তেলের দাম বাড়ানোর হারের চেয়ে অনেক বেশি। একইভাবে তখন লঞ্চভাড়া বাড়ানো হয় ৩৫ শতাংশ। গতরাতে সেই তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ ভাগ। ফলে নতুন করে বাস, লঞ্চ ও ট্রাকভাড়া বাড়বে। কিন্তু সেই ভাড়া কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা মুশকিল।

আরও পড়ুন: বাস সংকটে রিকশা-অটোরিকশা চালকদের পোয়াবারো

অন্যদিকে প্রাইভেটকারের মালিক ও মোটরসাইকেলের চালকদের খরচও বাড়বে। ব্যয় বাড়বে কৃষি খাতে, যা বাড়িয়ে দেবে পণ্যের দাম। একইভাবে বাজারে দ্রব্যমূল্যের ওপর প্রভাব পড়বে। এমনিতেই চাল, ডাল, তেল, চিনি, সাবানসহ সব ধরণের নিত্যপণ্যের দাম বেশ চড়া। গত মে মাসের পর ডলারের দাম ৮৬ থেকে ১০৮ টাকায় উঠে যাওয়ায় আমদানি করা সব পণ্যের দাম বাড়ছে। এমন অবস্থায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে বড় সংকটে ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেছেন, অতিমাত্রায় যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো, তার প্রভাবে নিত্যপণ্যসহ পরিবহনের ভাড়া বাড়বে অনেক। যা কল্পনার বাইরে। সাধারণ মানুষের টিকে থাকা কঠিন হবে।'

কোথায় কেমন প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা আছে

ব্যক্তিগত গাড়ি সিএনজিতে চলার সুযোগ থাকলেও মোটরসাইকেল চালাতে হয় অকটেন বা পেট্রোলে। আর ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে বাস, ট্রাক, কভার্ডভ্যানের ভাড়ায়। লঞ্চসহ নৌযানের ভাড়াও বাড়বে। আর এর পরোক্ষ প্রভাব পড়বে বহু খাতে।

যেমন- ট্রাক কিংবা নৌযানের ভাড়া বেড়ে গেলে শাক-সবজি থেকে শুরু করে যেসব পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে বাজারে আসে এর সব কিছুরই দাম বাড়বে। ফলে সবাইকেই মাসিক খরচের হিসাব নতুন করে সাজাতে হবে।

অন্যদিকে ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা জেনারেটর চালানোর খরচ বেড়ে যাবে। দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক শিল্পেও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে।

আর মাছ ধরা ট্রলারগুলোর ডিজেলে চলে। ফলে এইখাতেও খরচা বাড়বে। কৃষিক্ষেত্রে সেচ পাম্প ও পাওয়ার টিলারে ডিজেলে ব্যবহার হয় বলে কৃষকেরও ব্যয় বাড়বে। অবশ্য কৃষকের জন্য ডিজেলে ভর্তুকি চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এম শামসুল আলম বলেছেন, দাম বাড়িয়ে আইএমএফের শর্তপূরণের জন্য ঘাটতি সমন্বয় করতে গিয়ে জনগণের ওপরের যে আঘাত হানা হয়েছে, তা সিডর–আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়কে হার মানায়।

auto-3

শামসুল আলম বলেন, দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করেও ঘাটতি সমন্বয় করা যেত। সরকার সেই পথে হাঁটেনি। জ্বালানি তেলের দাম গণশুনানি করে বাড়ালে তা সহনীয় থাকত। 

এদিকে তেলের দাম বাড়ার কারণে দ্রুত ভাড়া সমন্বয়ের দাবি করেছেন বাস মালিকরা। তারা লস দিয়ে একদিনও গাড়ি চালাতে রাজি নন। ইতিমধ্যে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় পরিবহন চালানো বন্ধ রাখা হয়েছে। রাজধানীতে অন্যদিনের তুলনায় শনিবার অনেক কম গাড়ি সড়কে দেখা গেছে।

এদিকে ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালে জনজীবনে যে প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে সরকারও চিন্তাভাবনা করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। তিনি বলেছেন, 'সবচেয়ে বেশি তেল ব্যবহার হয় পরিবহন খাতে। খুব বেশি পরিবর্তন হবে না বলে আমরা হিসাব করে দেখেছি। এজন্য আমরা বিআরটিএ, বিআইডব্লিউটিএ, পরিবহন মালিক সমিতি, ট্রাক মালিক সমিতি সবার সঙ্গে বসে আলোচনা করে ঠিক করার চিন্তা করছি।'

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, 'আমরা দেখতে পাচ্ছি ডিজেলের দাম বাড়লে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়ে ১ টাকা থেকে ২ টাকা। বিষয়টা যদি ওই রকমভাবে সমাধান করা যায়, অবশ্যই অ্যাডজাস্টমেন্ট করা উচিত।'

বিইউ/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর