মানুষের দম্ভ যেখানে আকাশের সীমানা ছুঁতে চায়, ঠিক সেখানেই মহাকালের মহান স্থপতি তাঁর অমোঘ লেখনি দিয়ে রচনা করেন এমন এক ইতিহাস; যার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষের পক্ষে পূর্বানুমান করা সম্ভব হয় না।
বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জিয়া উদ্যান বা চন্দ্রিমা উদ্যানের বুক থেকে শহীদ জিয়ার স্মৃতি মুছে ফেলার গভীর চক্রান্ত আর কুটিল নীলকশার বাস্তবায়নের নানা কৌশল চালিয়েছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার।
বিজ্ঞাপন
ক্ষমতার দম্ভে মত্ত হয়ে তারা বারবার গর্জন করেছিল ওই সমাধি সরিয়ে ফেলার, তারা হয়তো ভুলে গিয়েছিল যে, পৃথিবীর কোনো ম্যাপ বা নকশা দিয়ে মানুষের হৃদয়ে থাকা ভালোবাসার মানচিত্র বদলানো যায় না। যে মাটির গভীরে কোটি মানুষের ভালোবাসা মিশে থাকে, সেই মাটি অপার্থিব শক্তিতে বলীয়ান।
শহীদ জিয়ার সেই মাজারের পাশেই পরম মমতায় চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন তাঁরই আজীবনের সুখ-দুঃখের সাথী, এ দেশের কোটি মানুষের প্রিয় 'মা’ - বেগম খালেদা জিয়া। এটি কেবল দুটি কবরের পাশাপাশি অবস্থান নয়; এটি ঐতিহাসিক এবং আধ্যাত্মিক বিজয়।
আরও পড়ুন
খালেদা জিয়া: দেশপ্রেম যাঁর শিরোভূষণ
অথচ ঐতিহাসিক এই স্থানটির নাম পরিবর্তন করা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার যে প্রতিহিংসা পরায়ণ রাজনীতির প্রকাশ ঘটিয়েছিল; তা নিঃসন্দেহে সরকার প্রধানের সংকীর্ণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।
বিজ্ঞাপন
১৯৯৬-২০০১ শাসননামলের একেবারে শেষ দিকে জিয়া উদ্যানের নাম পরিবর্তন করে 'চন্দ্রিমা উদ্যান' রাখা হয়েছিল। আবার ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর চন্দ্রিমা উদ্যানের নাম পুনরায় 'জিয়া উদ্যান' করা হয়। ২০০৯ সালে ফের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ২০১০ সালে উচ্চ আদালতের একটি রায়ের প্রেক্ষাপট টেনে এনে আবার নামকরণ করা হয় 'চন্দ্রিমা উদ্যান।'

সাধারণত উল্লেখযোগ্য কোনো স্থানের নামকরণের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব, জাতীয় অবদান ও ব্যক্তিত্ব, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রেরণা এবং স্মৃতি রক্ষা ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য বিবেচনায় আনা হয়। এই সবকিছুর বিচার বিশ্লেষণ এবং প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে নিঃসন্দেহে এটির নাম 'জিয়া উদ্যান' যথার্থ বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাড়ে পনেরো বছর অবহেলা-অযত্নে ছিল স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এই সমাধিস্থল। ঘুটঘুটে অন্ধকার করে রাখা হতো; সরাসরি যাওয়ার কোনো রাস্তা ছিল না; সাধারণ মানুষকে কবরের কাছে গিয়ে প্রার্থনার সুযোগ দেওয়া হতো না খুব একটা। এক কথায় একজন মৃত মানুষের সাথেও যত ধরনের বিদ্বেষ, অবহেলা এবং ক্ষমতার দাম্ভিকতার প্রকাশ ঘটানো যায়; তার পুরোটাই করেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রজ্ঞাপন জারি করে উদ্যানটির নাম চন্দ্রিমা থেকে বদল করে ফের জিয়া উদ্যান করা হয় এবং এটাই বর্তমানে স্থানটির দাফতরিক নাম।
আওয়ামী লীগ সরকার কেবল এই নাম পরিবর্তনের নোংরামির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তারা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নাম নিশানা পর্যন্ত মুছে দিতে চেয়েছিল।
সেই ২০১৪ সাল থেকে শুরু হয়েছিল শহীদ জিয়ার সমাধি সরিয়ে দেওয়ার তৎপরতা। তৎকালীন সময়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় লুই আই কানের মূল নকশা সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। উদ্দেশ্য ছিল সেই নকশা অনুসরণের মধ্যে দিয়ে সমাধি সরিয়ে দেওয়ার পেছনে একটি শক্ত যুক্তি উপস্থাপন করা।
আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল মূল নকশা অনুযায়ী সংসদ ভবন এলাকাকে সাজাতে হলে সেখান থেকে জিয়াউর রহমানের মাজারসহ অন্যান্য স্থাপনা সরিয়ে ফেলতে হবে। এবং ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে লুই আই কানের ৮ হাজার নকশা ও নথি বাংলাদেশে আনা হয়। এরপর মাজার সরানোর আলোচনা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। তৎকালীন সময়ে পত্রপত্রিকায় এ সম্পর্কে প্রকাশিত হয় একাধিক সংবাদ। ওই সময় গণপূর্ত মন্ত্রী বলেছিলেন, মূল নকশার বাইরে কোনো স্থাপনা সংসদ এলাকায় থাকবে না। আবার বিভিন্ন সংসদ অধিবেশনে এবং দলীয় সভায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছিলেন, লুই আই কানের নকশায় মাজারের কোনো জায়গা নেই এবং জিয়াউর রহমানের লাশ সেখানে আছে কি না তা নিয়েও তিনি সংসদে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

যদিও শেষপর্যন্ত শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তার কথা চিন্তা করে ঝুঁকি নিতে সাহস করেননি হাসিনা সরকার। তারা বুঝেছিলেন; এই সমাধি সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিলে জনরোষে তাদের বিদায় ঘণ্টা বেজে যাবে।
যাই হোক, লেখার শেষাংশে এসে কৃতজ্ঞতা চিত্তে বলতে হয় সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা সত্যিই অবিশ্বাস্য। বিস্ময়কর। এক নক্ষত্রকে মুছে ফেলতে গিয়ে আজ সেখানে দুই নক্ষত্রের উদয় হলো। যাঁরা জীবনভর একে অপরের পাশে ছিলেন, গণতন্ত্রের জন্য লড়েছেন; আজ মৃত্যুর হিমশীতল নীরবতায় তাঁরা আবার একে অপরের পাশে।
আরও পড়ুন
অস্তমিত এক আপসহীন সূর্য
স্রষ্টার এই বিচার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়; অহংকার একদিন ভেঙে চুরমার হয়, কিন্তু যারা ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সব জুলুম সয়ে যায়; শেষ হাসিটা প্রকৃতি তাদের জন্যই তুলে রাখে। যেখানে মানুষের হিসাব মেলানো সম্ভব নয়, সেখানে আকাশের মালিক নিজের হাতে বিচার সম্পন্ন করেন।
দুই বীরের এই পাশাপাশি অবস্থান -
বিজয়ের মহাকাব্য হয়ে টিকে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।
লেখক: কলামিস্ট ও বিশ্লেষক




















































































































































