রোববার, ১৭ মে, ২০২৬, ঢাকা

দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিএনপির ৭ বিদ্রোহীর চমক

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩৩ পিএম

শেয়ার করুন:

দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিএনপির ৭ বিদ্রোহীর চমক

‘ধানের শীষ’ প্রতীক না পেয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপির সাত ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী এবার চমক দেখিয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের প্রত্যেকেই মনোনয়ন না পাওয়ার পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হন এবং দল থেকে বহিষ্কৃত হন। কিন্তু নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে তারা এগিয়ে থেকে জয় নিশ্চিত করেছেন। এই আসনগুলোতে দলীয় কাঠামো, মনোনয়ন নীতি এবং জোট সমীকরণের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠলেও বাস্তবতার কাছে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে। ফলে দলীয় ও জোট প্রার্থীদের পাশাপাশি তারাও সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন।

বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা হলেন— ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা (হাঁস), কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল (হাঁস), টাঙ্গাইল-৩ আসনে লুৎফর রহমান খান আজাদ (মোটর সাইকেল), চাঁদপুর-৪ আসনে আব্দুল হান্নান (চিংড়ি), কুমিল্লা-৭ আসনে আতিকুল আলম শাওন (কলস), ময়মনসিংহ-১ আসনে সালমান ওমর রুবেল (ঘোড়া) এবং দিনাজপুর-৫ আসনে রেজওয়ানুল হক (তালা)।


বিজ্ঞাপন


দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মনোনয়ন না পাওয়ায় সারা দেশে অর্ধশতাধিক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। শরিক দলগুলোর জন্য ছেড়ে দেওয়া ১৬টি আসনের মধ্যে অন্তত ১২টিতে বিদ্রোহী প্রার্থীরা মাঠে ছিলেন। এতে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির ভোটব্যাংক বিভক্ত হয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক আসনে জোট-সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয়ের পেছনে এই ভোট বিভাজন বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২

এই আসনটি জোটের প্রার্থী হিসেবে জমিয়তের সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে ছেড়ে দেয় বিএনপি। এতে দলের সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা মনোনয়ন পাননি। দীর্ঘদিন জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করা হয়। তবে নির্বাচনি প্রচারে তিনি ব্যাপক জনসংযোগ চালান এবং স্থানীয় সমর্থকদের সংগঠিত করেন। ফলাফলে দেখা যায়, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা তাকে বিজয়ের পথে এগিয়ে দেয়।

কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী)


বিজ্ঞাপন


প্রথমে মনোনয়ন পেলেও শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ দেওয়া হয় ১২ দলীয় জোটভুক্ত বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদাকে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। তাকে বহিষ্কার করা হলেও স্থানীয়ভাবে তার দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল দৃঢ়। নির্বাচনে সেই ভিত্তির প্রতিফলন ঘটে এবং তিনি বিজয়ী হন।

টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল)

এই আসনে দলীয় মনোনয়ন পান কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ওবায়দুল হক নাসির। সাবেক মন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদ মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কের কারণে তিনি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলেন। শেষ পর্যন্ত বেসরকারি ফলাফলে এগিয়ে থেকে জয় নিশ্চিত করেন।

চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ)

রাজস্ব ও ব্যাংকিংবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক এমপি লায়ন হারুনুর রশীদ মনোনয়ন পান। উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হান্নান মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন এবং বহিষ্কৃত হন। এই আসনটি দীর্ঘদিন বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় পর্যায়ে তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা ভোটে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা)

এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ পান। এতে স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতিকুল আলম শাওন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েন। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ায় তিনি বহিষ্কৃত হন। কিন্তু ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, স্থানীয় সমর্থন তাকে বিজয় এনে দেয়।

ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া)

ধানের শীষ পান বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে সালমান ওমর রুবেল স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। বহিষ্কার সত্ত্বেও তিনি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলেন এবং শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করেন।

দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর-ফুলবাড়ী)

এই আসনে দলীয় প্রার্থী ছিলেন ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামান। মনোনয়ন না পেয়ে রেজওয়ানুল হক বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাকেও বহিষ্কার করা হয়। তবে স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয়তার কারণে তিনি ভোটে এগিয়ে থেকে জয় পান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় এসব নেতাকে বহিষ্কার করা হলেও, নির্বাচনের ফলাফলে তাদের স্থানীয় প্রভাব ও সাংগঠনিক শক্তির প্রতিফলন ঘটেছে। এ ফলাফল বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেবে। বিশেষ করে মনোনয়ন বণ্টন, জোট সমন্বয় এবং তৃণমূলের মতামত মূল্যায়নের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে। নির্বাচনের এই ফলাফল বলছে— দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয়ভাবে শক্ত অবস্থান ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও জয় পাওয়া সম্ভব।

এএইচ/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর