মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই, ২০২৪, ঢাকা

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ৩৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১ জুন ২০২৩, ০৩:৩৪ পিএম

শেয়ার করুন:

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ৩৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা প্রস্তাব

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ৩৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (০১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে এ প্রস্তাব পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। যা গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে ২৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।

এ সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করব বলে আমরা অঙ্গীকার করেছিলাম। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ সক্ষমতা সম্প্রসারণের ফলে ইতোমধ্যে দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠী বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২০০৯ সালের ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট হতে বর্তমানে ২৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভবিষ্যতে বর্ধিত বিদ্যুৎ চাহিদার বিষয় বিবেচনায় রেখে আমরা উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এছাড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার বহুমুখীকরণের জন্য গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি কয়লা, তরল জ্বালানি, ডুয়েল-ফুয়েল, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন


তিনি আরও বলেন, পটুয়াখালি জেলার পায়রা কক্সবাজার জেলার মহেশখালী ও মাতারবাড়ি এলাকায় নির্মিত পাওয়ার হাবসমূহে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কয়লাভিত্তিক রামপাল ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল প্রজেক্ট (১ম ইউনিট) ও পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্পে ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। মাতারবাড়ি (২x৬০০ মেগাওয়াট) আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের কাজ চলছে। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে জীবাশ্ম এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক মোট ১২ হাজার ৯৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন আছে এবং ২ হাজার ৪১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ১৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি প্রক্রিয়াধীন আছে। এছাড়া, সরকার মোট ১০ হাজার ৪৪৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও ৩৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার পাশাপাশি আমরা আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমেও বিদ্যুৎ সংগ্রহ করছি। ২০৪১ সালের মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ হতে প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমানে আন্তঃদেশীয় গ্রিড সংযোগের মাধ্যমে ভারত হতে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। এছাড়াও ভারতের ঝাড়খণ্ডে নির্মিত ২ ইউনিটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট হতে ৭৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। নেপালের সাথে সহযোগিতার ভিত্তিতে নির্মিতব্য জল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ভুটান হতে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে বাংলাদেশ, ভুটান এবং ভারতের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত পর্যায়ে স্বাক্ষরের অপেক্ষায় আছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি হতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এছাড়া, ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ আমরা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হতে সংগ্রহ করতে চাই। এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে অফগ্রিড এলাকায় ৬০ লাখ সোলার সিস্টেম স্থাপন করে জনগণকে বিদ্যুৎ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। সারাদেশে মোট ৮টি সোলার পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্দেশ্যে ডিজেলচালিত পাম্প এর স্থলে সৌরচালিত পাম্প স্থাপন করা হচ্ছে। সেচকাজে ইতোমধ্যে ২ হাজার ৫৭০টি এরূপ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যার সম্মিলিত ক্যাপাসিটি ৪৯.১৬ মেগাওয়াট। বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি হতে মোট ৮৯৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। সর্বোপরি, রূপপুরে দেশের প্রথম ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, উৎপাদিত বিদ্যুৎ জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গত ১৪ বছরে ৬ হাজার ৬৪৪ সার্কিট কি. মি. সঞ্চালন লাইন স্থাপন করেছি। এর ফলে, সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ বর্তমানে ১৪ হাজার ৬৪৪ কিলোমিটার এ উন্নীত হয়েছে। এছাড়াও, বিতরণ লাইনের পরিমাণ ৩ লাখ ৬৯ হাজার কিলোমিটার হতে ৬ লাখ ৬৯ হাজার কিলোমিটারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে, বিদ্যুতের সিস্টেম লস ১৪ শতাংশ হতে হ্রাস পেয়ে ৭.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। আমাদের লক্ষ্য হল- ২০৩০ সালের মধ্যে সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ ২৮ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করা। এছাড়া গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঠিক তথ্য সংরক্ষণ ও অপচয় রোধের উদ্দেশ্যে বিগত ৫ বছরে প্রায় ৫৩ লাখ প্রি-পেইড স্মার্ট মিটার স্থাপন করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


তিনি আরও বলেন, ২০০৯ সালের তুলনায় জ্বালানি তেলের মজুদ ক্ষমতা ৮.৯৪ লক্ষ মেট্রিক টন থেকে বৃদ্ধি করে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৩.৬০ লক্ষ মেট্রিক টন করা হয়েছে। এছাড়া, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জ্বালানি তেলের মজুদ ক্ষমতা ৩০ দিনের পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে ৬০ দিনে উন্নীত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সম্প্রতি ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন উদ্বোধন করা হয়েছে যার মাধ্যমে আমদানিকৃত জ্বালানি তেল (ডিজেল) দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় এবং সৈয়দপুরের ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ভারতের শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল হতে বাংলাদেশের পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপনের কাজ চলছে। এর মাধ্যমে ১০ লাখ মে. টন ডিজেল স্বল্পসময়ে বাংলাদেশে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অতিসম্প্রতি ভোলা জেলার ইলিশা গ্যাস ক্ষেত্রে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার হয়েছে। গ্যাসের উৎপাদন বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের প্রাক্কালে ছিল দৈনিক ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট, যা বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে। তেল ও গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দেশের একমাত্র তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্স এর সক্ষমতা বাড়ানোর ফলে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ৯৮৪ মিলিয়ন ঘনফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৪ এর মধ্যে আরও ৪৬টি কূপ খনন করা হবে। আশা করছি, এ সকল কূপ খনন শেষে দৈনিক অতিরিক্ত ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। সমুদ্র অঞ্চলেও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ চলমান আছে। এ কাজে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় বিধায় বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। জ্বালানির বর্ধিত চাহিদা মেটানোর জন্য তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি ও স্পট মার্কেট থেকে ক্রয় করা হচ্ছে। এছাড়া, কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে দৈনিক ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি Land-Based LNG Terminal নির্মাণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, গ্যাস উৎপাদন ও আমদানির সাথে সাথে সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ২০০৯ সাল হতে এ পর্যন্ত ১ হাজার ১৫৮ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের উত্তরাঞ্চলে ১৫০ কিলোমিটার এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় ৬৪ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে পায়রা ও ভোলা হতে গ্যাস সঞ্চালনের জন্য আরও ৪২৫ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি এর অপচয় রোধকল্পে গ্রাহক আঙ্গিনায় প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি জ্বালানি হিসেবে কয়লাও অত্যন্ত মূল্যবান। দেশে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত ৫টি কয়লা ক্ষেত্রের মজুদকৃত কয়লার পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ৮২৩ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে কেবল বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা হয়। খনিটির বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা বার্ষিক ৮ লক্ষ মে.টন। দেশের কয়লা ক্ষেত্রসমূহ হতে কয়লা সংগ্রহের কারিগিরি ও অন্যান্য সম্ভাবনা যাচাই এর কাজ চলছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদানের প্রস্তাব করছি। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে ২৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।

টিএই/এএস

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর