শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ঢাকা

বাজেট ২০২৬-২৭: বড় করছাড়ে স্বস্তি, কিছু খাতে বাড়তে পারে করের চাপ

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

বাজেট ২০২৬-২৭: বড় করছাড়ে স্বস্তি, কিছু খাতে বাড়তে পারে করের চাপ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বড় করছাড়ে স্বস্তি মিললেও কিছু খাতে বাড়তে পারে করের চাপ। ছবি: নোটবুকএলএম
  • দেশীয় ওষুধশিল্পের বিকাশে ব্যাপক কর ও শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব
  • উৎপাদন ব্যয় কমাতে কাঁচামাল আমদানিতে বড় সুবিধা
  • ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তি শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে কর অব্যাহতি
  • বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ
  • নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি কর সুবিধার পরিকল্পনা
  • স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য নতুন প্রণোদনা
  • সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি দিতে বাড়ছে করমুক্ত আয়সীমা
  • বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে গুনতে হতে পারে অতিরিক্ত কর
  • রড ও স্টিল খাতে কর বৃদ্ধি নির্মাণ ব্যয়ে প্রভাব ফেলতে পারে

ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাপক কর ও শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণের উচ্চ লক্ষ্য পূরণে কিছু পণ্য ও খাতে নতুন কর আরোপ এবং বিদ্যমান করহার বৃদ্ধির প্রস্তাবও থাকছে। ফলে এবারের বাজেটে একদিকে যেমন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তির বার্তা রয়েছে, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে ভোক্তাদের অতিরিক্ত ব্যয়ও গুনতে হতে পারে।


বিজ্ঞাপন


ওষুধ ও শিল্প খাতে বড় কর ছাড়
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে দেশীয় শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে ওষুধ, প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস, কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে উল্লেখযোগ্য কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

ওষুধশিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেশীয়ভাবে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) উৎপাদন বাড়াতে ৫১ ধরনের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্যানসারের ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত নয়টি কাঁচামাল এবং অন্যান্য ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত ৬৮টি উপকরণের ওপর কর রেয়াত দেওয়া হবে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান অগ্রিম করও তুলে নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন: বাজেটের লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার: আবু আহমেদ

শিল্প খাতে কাঁচামাল সহজলভ্য ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে গ্লাস, টেক্সটাইল এবং অন্যান্য উৎপাদনশিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণের শুল্ক কমানো হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদনকারীদের জন্য বিদ্যমান কর অব্যাহতির সুবিধা আরও ১০ বছর বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।


বিজ্ঞাপন


ডিজিটাল লেনদেন ও ইলেকট্রনিকস খাতে সুবিধা
ক্যাশলেস অর্থনীতিকে উৎসাহিত করতে পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন আমদানির শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি এ খাতে অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের পরিকল্পনাও করা হয়েছে।

দেশীয় ইলেকট্রনিকস শিল্পের বিকাশে মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম ও সিসিটিভি ক্যামেরা উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর কর অব্যাহতির সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। একইভাবে সেমিকন্ডাক্টর ও পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও দীর্ঘমেয়াদি কর সুবিধা বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

বৈদ্যুতিক গাড়ি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রণোদনা
পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর করহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ইভি আমদানিতে প্রায় ৯৩ শতাংশ করভার থাকলেও নতুন কাঠামোয় তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। পাশাপাশি হাইব্রিড গাড়ির কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের চিন্তাভাবনা রয়েছে।

আরও পড়ুন: বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষের ওপর চাপ বাড়বে, ব্যয়বহুল হবে জীবনযাত্রা

অন্যদিকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত আয়কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের আশা, এতে সবুজ জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়বে।

স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য সুখবর
ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে স্টার্টআপ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান, ফ্রিল্যান্সার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্যও কর সুবিধা রাখা হচ্ছে। বিদেশ থেকে অর্জিত আয়কে প্রবাসী আয়ের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের জন্য কর অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদও বাড়ানো হতে পারে।

করদাতাদের জন্য স্বস্তির ব্যবস্থা
ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বর্তমান সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি, মুক্তিযোদ্ধা এবং বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের জন্যও করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়তে পারে।
কর ব্যবস্থাকে সহজ করতে বছরব্যাপী রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ চালু করা হতে পারে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য কর রেয়াতের ব্যবস্থাও থাকছে। একই সঙ্গে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।

যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে
রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে কিছু পণ্যের ওপর নতুন কর ও শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। উচ্চমূল্যের হিমায়িত মাছ, কাজুবাদাম ও পাঙাশ ফিলেট আমদানিতে কর বাড়তে পারে। ফলে এসব পণ্যের বাজারদরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তামাকজাত পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে। সিগারেট উৎপাদনের কাঁচামাল, নিকোটিন পাউচ এবং অন্যান্য তামাকপণ্যের ওপর বাড়তি কর আরোপের ফলে বাজারে সিগারেটের দাম বাড়তে পারে। অ্যালকোহলজাত পণ্যের ওপরও নতুন ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।

বিলাসী ভোগ ও নির্মাণ খাতে বাড়তি চাপ
৩৫০০ সিসির বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতাসম্পন্ন বিলাসবহুল গাড়ির অগ্রিম আয়কর কয়েক গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি রড ও স্টিলজাত কিছু পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে কর বৃদ্ধির কারণে নির্মাণ খাতেও ব্যয় বাড়তে পারে।

রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে প্রায় ৬৯ হাজার ৭৮২ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরে এনবিআরকে প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনই হবে রাজস্ব প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্যবসাবান্ধব বাজেট চান সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, অর্থনীতিকে সচল রাখতে বাজেটের শুল্ক-কর নীতি অবশ্যই ব্যবসাবান্ধব হতে হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে তাদের স্বস্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে কর ছাড় এবং কর পরিশোধ প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ের বড় লক্ষ্য সামনে রেখে অনেক সময় বিভিন্ন খাতে করহার বাড়ানো বা কমানো হয়। আবার ছোট ছোট খাতে উৎসে কর আরোপ করে করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা হয়। এ ক্ষেত্রে কর প্রশাসনে আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন।

সংস্কারেই বাড়তে পারে রাজস্ব
অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধু করহার বৃদ্ধি নয়, বরং কর ব্যবস্থাকে সহজ, ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করতে পারলে রাজস্ব আদায় আরও বাড়বে। ব্যবসা পরিচালনার প্রতিবন্ধকতা কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি যেমন উপকৃত হবে, তেমনি সরকারের রাজস্ব আয়ও টেকসইভাবে বৃদ্ধি পাবে।

এমআর/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর