- বড় নয়, বাস্তবমুখী বাজেট প্রয়োজন
- কাগজে নয়, বাস্তবে ফল দিতে হবে বাজেটকে
- অযৌক্তিক ব্যয় কমানোর সুপারিশ
- বিনিয়োগবান্ধব করনীতি প্রণয়নের আহ্বান
- সাধারণ মানুষের কাছে চাল-ডালের দামই বড় সূচক
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আজ জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যেমন রয়েছে, তেমনি অর্থনীতিবিদদের রয়েছে নানা সতর্কতা ও পরামর্শ।
বিজ্ঞাপন
তাদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় কেবল বড় অঙ্কের বাজেট বা উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; বরং এমন একটি বাজেট প্রয়োজন, যা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং জনগণের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত কয়েক বছরে জাতীয় বাজেটের আকার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। কিন্তু বাজেটের আকার বৃদ্ধির সঙ্গে বাস্তবায়নের সক্ষমতা, রাজস্ব সংগ্রহ এবং জনসেবার মান একই হারে বাড়েনি। অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং সম্পদের অপচয়ের কারণে প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে সাধারণ মানুষ। ফলে এবারের বাজেটে নতুন প্রকল্প ঘোষণার চেয়ে বিদ্যমান কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং ব্যয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
তারা বলছেন, বাজেটকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তাই বাজেটে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈষম্য কমানোর বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় নিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ নতুন অর্থবছরে সরকারের জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতিতে তারা একটি বাস্তবমুখী, বাস্তবায়নযোগ্য এবং জনকল্যাণমুখী বাজেটের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন, যা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তিও শক্তিশালী করবে।
বিজ্ঞাপন

এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন সরকারকে বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। পরাবাস্তব বাজেট করলে হবে না। সরকারকে প্রথম বছরেই কঠোর বাজেট করতে হবে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নির্দয় হতেই হবে। অযৌক্তিক ব্যয় কমানোর পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের স্বল্পমেয়াদি রূপরেখা ঘোষণার ওপর জোর দেন তিনি। তার মতে, বৈশ্বিক ও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যার কারণে সরকারের উচিত দ্রুত সময়ের মধ্যে তিন থেকে চার মাসের জন্য একটি সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক রূপরেখা দেওয়া। একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি তিন বছর মেয়াদি মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো প্রণয়ন করা যেতে পারে। এছাড়া দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ তৈরির জন্য একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠনেরও এখন উপযুক্ত সময় বলে মনে করেন তিনি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থমন্ত্রীকে সংসদে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি দেওয়া উচিত। সেখানে বর্তমান সরকার কী ধরনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে এবং বর্তমানে কী ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক চাপ মোকাবিলা করছে, তা স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর ফলে বাংলাদেশের সামনে অন্তত তিন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রথমত, তরল জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যসংকট। দ্বিতীয়ত, গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি। এমন পরিস্থিতিতে বাজেটের জন্য অপেক্ষা না করে সরকারকে এখনই অর্থসংস্থান এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। তেল আমদানি বাড়ানো, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং প্রয়োজনে কর ও আবগারি শুল্ক কমিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ হ্রাসের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তির কারণে কম দামে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি ও বৈদেশিক নীতি ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়ে উঠছে।
ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. রাজিয়া মাহবুবা আক্তার বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ নিম্নআয়ের মানুষের কাছে বাজেটের হিসাব, করনীতি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা নির্ধারিত হয় চাল, ডাল, তেল, সবজি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদরের মাধ্যমে। বাজেট ঘোষণার পর যদি দ্রব্যমূল্য কমে, তারা স্বস্তি পায়। আর দাম বাড়লে তাদের জীবনযাত্রার সংকট আরও গভীর হয়। তাই সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের সফলতা কাগজে-কলমের সংখ্যায় নয়, বরং বাজারের দামে প্রতিফলিত হয়।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক ড. সেলিম জাহান বলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট একটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটকালের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হচ্ছে। একদিকে ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট যুদ্ধাবস্থা জ্বালানি ও বৈদেশিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে রয়েছে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, বিপুল ঋণের বোঝা, ভর্তুকির চাপ এবং সম্পদের সীমাবদ্ধতা।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাজেটের মূল দর্শন। সরকার কোন অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করছে, সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, জনজীবনের প্রত্যাশা। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, আয় এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তৃতীয়ত, সামষ্টিক অর্থনীতির বিদ্যমান সংকটগুলো সমাধানে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও সম্পদ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
ড. সেলিম জাহান বলেন, কোনো দেশের বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি ক্ষমতাসীন সরকারের উন্নয়ন দর্শন ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের আনুষ্ঠানিক দলিল। তাই বাজেটে সরকারের উন্নয়ন চিন্তা, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপরেখা পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে মানবকল্যাণ থাকবে, নাকি কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি, সেটি স্পষ্ট হওয়া জরুরি। একইভাবে এটি দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখবে, নাকি কেবল উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করবে, সেই প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর থাকা প্রয়োজন। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনমান উন্নয়ন।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষক ফয়সাল ইসলাম বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে কর ব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য, যুক্তিসঙ্গত এবং ব্যবসাবান্ধব করার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, আয়কর আইনের ধারা ১৬৩-এর অধীনে ন্যূনতম করের বিধান অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে শাস্তিমূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর ব্যবস্থায় ন্যায়সংগত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এই বিধান পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি উৎসে কর্তিত করকে স্পষ্টভাবে অগ্রিম কর হিসেবে ঘোষণা এবং চূড়ান্ত করের সঙ্গে সম্পূর্ণ সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দেন। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক ও অন্যান্য সরবরাহকারীদের জন্য উৎসে করের হার ২ শতাংশ এবং বিজ্ঞাপন সংস্থা, গণমাধ্যম ও সেবাখাতের জন্য ১ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করেন।
এছাড়া টার্নওভারভিত্তিক ন্যূনতম করহার ০.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, লোকসানকালীন সময়ে প্রদত্ত ন্যূনতম কর ভবিষ্যৎ লাভের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি, একই আয়ের ওপর একাধিকবার কর আরোপের ঝুঁকি কমানো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য কর রেয়াতের ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেন তিনি।
ফয়সাল ইসলাম বলেন, রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একটি টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলাও সমান জরুরি। বর্তমান কর কাঠামোর কিছু বিধান দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই রাজস্ব আহরণ ও বিনিয়োগ উৎসাহের মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা জানান, বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু বড় আকারের বাজেট প্রণয়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং সেই বাজেট কতটা বাস্তবসম্মত, কতটা বাস্তবায়নযোগ্য এবং কতটা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাপ, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার এই সময়ে একটি বাস্তবমুখী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাজেটই দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
এএইচ/এএস













































