বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ঢাকা

২০২৬-২৭ বাজেট: ঘাটতি অর্থায়নে বিদেশি ঋণ ও ব্যাংক খাতই ভরসা

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ১০ জুন ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম

শেয়ার করুন:

২০২৬-২৭ বাজেট: ঘাটতি অর্থায়নে বিদেশি ঋণ ও ব্যাংক খাতই ভরসা
২০২৬-২৭ বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নে বিদেশি ঋণ ও ব্যাংক খাতই ভরসা। ছবি: এআই
  • ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ও ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা
  • বৈদেশিক উৎস থেকে ১.১৬ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য
  • ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ১.২০ লাখ কোটি টাকা ঋণ সংগ্রহের পরিকল্পনা
  • ঘাটতি জিডিপির ৩.৬ শতাংশের মধ্যে রাখার চেষ্টা
  • মে পর্যন্ত বৈদেশিক অর্থায়ন এসেছে মাত্র ২৬,৭০০ কোটি টাকা
  • আইএমএফের ১.৫৩ বিলিয়ন ডলারের দুই কিস্তি এখনও পাওয়া যায়নি
  • এডিবি, জাপান, এআইআইবি ও ওপেক ফান্ডের কাছ থেকে বাজেট সহায়তার আশ্বাস
  • অব্যবহৃত প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের উদ্যোগ

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ঋণ ও ব্যাংকিং খাতের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করতে যাচ্ছে সরকার। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি অর্থায়নের জন্য বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


বৃহস্পতিবার (১১ জুন) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। মোট ঘাটতির ৪৬ শতাংশ বৈদেশিক উৎস থেকে এবং বাকি ৫৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র থেকেও ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৮৪ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৬৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়। তবে গত মে পর্যন্ত বৈদেশিক অর্থায়ন পাওয়া গেছে মাত্র ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন সরকারের অধীনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে স্থগিত থাকা বৈদেশিক ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে গতি আসবে। একই সঙ্গে নতুন এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নও বৈদেশিক অর্থছাড় বাড়াতে সহায়ক হবে।


বিজ্ঞাপন


ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ১ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ঋণ এবং ১ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা নিশ্চিত হয়েছে। মোট ২ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার অর্থায়ন নিশ্চিত হলেও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও অর্জিত হয়নি। একই সময়ে আইএমএফের শর্ত পূরণ না হওয়ায় ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের দুটি কিস্তি পাওয়া যায়নি। বিশ্বব্যাংক থেকেও এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, বাজেট ঘাটতি কমাতে হলে প্রথমত সরকারের পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে যাতে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে সরকারের ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাতগুলোর একটি হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধ। এই চাপ কমাতে হলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

বর্তমানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১ বিলিয়ন ডলার, জাপান থেকে ৩১৫ মিলিয়ন ডলার, এআইআইবি থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ওপেক ফান্ড থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তার আশ্বাস পেয়েছে সরকার। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পের অব্যবহৃত প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, সরকার পরিবর্তনের পর অনেক প্রকল্প পরিচালক বদল, প্রকল্প সংশোধন এবং নতুন সরকারি ক্রয়নীতির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ অনুযায়ী অর্থ ব্যয় না হওয়ায় উন্নয়ন সহযোগীরাও অর্থ ছাড়ে ধীরগতি দেখিয়েছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার হয়েছে ৩২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, যা আগের দুই অর্থবছরের তুলনায় কম।

অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং খাতের ওপরও নির্ভরতা বাড়ছে। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। পরে রাজস্ব ঘাটতির কারণে সংশোধিত বাজেটে তা আরও বাড়ানো হয়।

আবু আহমেদের মতে, বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অলস অর্থ রয়েছে। ফলে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোই বেশি জরুরি। সরকারকে এমন নীতি নিতে হবে যাতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন এবং অর্থনীতির গতি বাড়ে।

অন্যদিকে অর্থনীতি বিশ্লেষক ও গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ব্যাংক ঋণের বড় একটি অংশ সরকার নিয়ে গেলে অর্থনীতিতে অবশ্যই চাপ পড়বে। এ খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। অর্থনীতিতে এটিকে ক্রাউডিং আউট এফেক্ট বলা হয়। সরকার যখন ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তখন ব্যাংকগুলোর তহবিলের একটি অংশ সরকারি খাতে চলে যায়। এতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমতে পারে এবং সুদের হারের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।

টিএই/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর