মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

মধ্যবিত্তের জন্য স্বস্তির বাজেট চান নগরবাসী

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

মধ্যবিত্তের জন্য স্বস্তির বাজেট চান নগরবাসী
স্বস্তির বাজেট চায় মধ্যবিত্ত। ছবি: ঢাকা মেইল

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন রুবেল আহমেদ। পাঁচ বছর আগে যে বাজার ৮ হাজার টাকায় হতো, এখন সেটি করতে লাগে প্রায় ১৮ হাজার টাকা। অথচ বেতন বেড়েছে খুব সামান্য। সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে এখন প্রায়ই ধার করতে হয় তাকে। আসন্ন বাজেট নিয়ে তার প্রত্যাশা একটাই, কমপক্ষে নিত্যপণ্যের দাম কমুক।

রুবেল আহমেদ বলেন, আগে মাসের শুরুতে বেতন হাতে পেলেও কিছুটা স্বস্তি থাকত। এখন মাস শেষ হওয়ার আগেই সব টাকা ফুরিয়ে যায়। বাসাভাড়া, বাজার, যাতায়াত, বিদ্যুৎ বিল আর বাচ্চার খরচ মেটাতে গিয়ে এখন সঞ্চয়ের চিন্তাও করা যায় না। তার মতে, মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন এখন সবচেয়ে বেশি চাপে আছে। কারণ আয় থাকলেও সেই আয়ে স্বাভাবিকভাবে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

শুধু রুবেল নন, রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, মোহাম্মদপুর কিংবা পুরান ঢাকার অসংখ্য মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প এখন প্রায় একই। বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে বাড়ছে চাপ। আয় আছে, চাকরি আছে, কিন্তু স্বস্তি নেই। মাসের শুরুতে যে বেতন হাতে আসে, মাস শেষ হওয়ার আগেই তা ফুরিয়ে যায় বাসাভাড়া, স্কুল ফি, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ বিল আর বাজার খরচ মেটাতে।

উত্তরার একটি ভাড়া বাসায় থাকেন গৃহিণী সেলিনা আক্তার। স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দুই সন্তান স্কুলে পড়ে। তিনি বলছিলেন, আগে বাজার করতে গিয়ে একটু স্বস্তি ছিল। এখন বাজারে ঢুকলেই ভয় লাগে। এক হাজার টাকা নিয়ে গেলে মনে হয় কিছুই কিনতে পারলাম না। তার মতে, সংসারের খরচ এখন এমন পর্যায়ে গেছে যেখানে প্রতিদিন নতুন করে হিসাব করতে হয়।

তিনি আরও বলেন, আগে সপ্তাহে দুই-তিন দিন মাছ বা মাংস রান্না হতো। এখন হিসাব করে কিনতে হয়। অনেক সময় শুধু ডিম আর সবজি দিয়েই দিন চলে যায়। সন্তানদের চাহিদা পূরণ করতে না পারার কষ্টও তাকে প্রতিনিয়ত ভেতর থেকে চাপ দেয়। মধ্যবিত্ত জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট এখন নীরবে মানিয়ে নেওয়া।

Budget2
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জনসাধারণের। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর বড় একটি চাপ এখন বাসাভাড়া। মিরপুর-১ নম্বরে দুই রুমের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন চাকরিজীবী মাহবুব হোসেন। গত তিন বছরে তার বাসাভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে বেড়েছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও দৈনন্দিন অন্যান্য খরচও। ফলে সংসারের বাজেট সামলানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

মাহবুব বলেন, বেতন যতটা বেড়েছে, খরচ বেড়েছে তার কয়েকগুণ। বাসাভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার পর হাতে যা থাকে, সেটা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। শহুরে জীবনে এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো মাস শেষে টিকে থাকা। কারণ কোনো অপ্রত্যাশিত খরচ এলেই পুরো হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়।

মাহবুব বলছিলেন, আগে অন্তত বছরে একবার পরিবার নিয়ে কোথাও ঘুরতে যেতাম। এখন সেটা চিন্তাও করতে পারি না। মধ্যবিত্ত জীবনের আনন্দগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন টাকার হিসাবের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।

রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলো ঘুরে দেখা যায়, বাজার করতে এসেও মানুষ এখন হিসাব করে পণ্য কিনছেন। কেউ আধা কেজির জায়গায় ২৫০ গ্রাম নিচ্ছেন, কেউ আবার তালিকা থেকে কিছু পণ্য বাদ দিচ্ছেন। বাজারে ঢুকেই অনেকের মুখে প্রথম প্রশ্ন থাকে দাম কত, প্রয়োজন নয়।

মিরপুরের কাঁচাবাজারে দেখা হয় গৃহিণী রোকসানা বেগমের সঙ্গে। সবজির দাম শুনে কয়েকবার ব্যাগ খুলে আবার বন্ধ করছিলেন। তিনি বলেন, আগে একসঙ্গে সপ্তাহের বাজার করতাম। এখন দুই দিন পরপর আসতে হয়। কারণ হাতে টাকা কম থাকে। সংসারের খরচ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রতিটি কেনাকাটাই চিন্তার বিষয়।

রোকসানা বেগমের স্বামীও একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। সংসারে তিন সন্তান। তিনি বলেন, শুধু চাল-ডাল কিনতেই অনেক টাকা চলে যায়। মাছ-মাংস এখন বিলাসিতা। আগে যেসব খাবার নিয়মিত ছিল, এখন সেগুলো বিশেষ দিনের জন্যও ভাবতে হয়।

বাজারের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের আচরণ বদলে গেছে। আগে যারা এক কেজি কিনতেন, এখন তারা আধা কেজি নিচ্ছেন। কেউ কেউ দাম শুনেই চলে যাচ্ছেন। অনেকে আবার বাজারের শেষে কম দামে কিছু পাওয়া যায় কি না, সেই অপেক্ষাও করছেন।

শেওড়াপাড়া এলাকার একটি মুদি দোকানের মালিক আব্দুল কাদের বলেন, মধ্যবিত্ত মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি হিসাব করে। অনেকে বাকিও চাইছেন। আগে যারা নিয়মিত পুরো মাসের বাজার করতেন, এখন তারা প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত কিছু কিনছেন না।

পরিবহন খরচও নগরজীবনে বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসায় কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে অনেকের। বিশেষ করে যারা দূর থেকে রাজধানীতে কাজ করতে আসেন, তাদের অবস্থা আরও কঠিন। প্রতিদিনের যাতায়াত ব্যয়ও এখন সংসারের বড় বোঝা।

মিরপুর থেকে মতিঝিলে প্রতিদিন যাতায়াত করেন বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাসে শুধু যাতায়াতেই প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার টাকা চলে যায়। এরপর বাজার, বাসাভাড়া, বাচ্চার স্কুল আছে। এসব নিয়ে আর মাথা কাজ করে না। ছোট ছোট খরচ মিলেই এখন বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।

PM1
মন্ত্রিসভায় প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন। ছবি: সংগৃহীত

তিনি বলেন, আগে রিকশায় যেতাম, এখন হেঁটে যাই। ছোট ছোট খরচ কমাতে গিয়ে জীবনটাই বদলে গেছে। তার ভাষায়, মধ্যবিত্ত মানুষ এখন প্রতিদিন নিজের প্রয়োজন কমিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

শহুরে মধ্যবিত্তের আরেকটি বড় সংকট চিকিৎসা ব্যয়। সামান্য জ্বর বা অসুস্থতা মানেই এখন বাড়তি খরচের ভয়। ওষুধের দামও বেড়েছে অনেক। ফলে অনেক পরিবার প্রয়োজন হলেও দ্রুত চিকিৎসা নিতে পারছে না।

উত্তরার বাসিন্দা নাসরিন সুলতানা বলছিলেন, আগে অসুস্থ হলে দ্রুত ডাক্তার দেখাতাম। এখন আগে ভাবি কত টাকা লাগবে। তার মতে, চিকিৎসা খরচ এখন মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য আলাদা আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যবিত্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপদে থাকে কারণ তারা সরকারি সহায়তা পায় না, আবার ধনীও নয়। ফলে সব ধরনের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সরাসরি তাদের ওপর এসে পড়ে। সংসারের ভারসাম্য ধরে রাখতে গিয়ে মানসিক চাপও বাড়ছে।

শিক্ষাব্যয়ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হয়ে উঠেছে। স্কুলের বেতন, কোচিং, বই, যাতায়াতসহ সবকিছুতেই একেকটি সন্তানের পেছনে মাসে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত শিক্ষা ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে।

মিরপুরের বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, দুই সন্তানের স্কুল ফি দিতেই হিমশিম খেতে হয়। আগে কোচিং করাতাম, এখন কমিয়ে দিয়েছি। তার মতে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় আছেন মধ্যবিত্ত অভিভাবকেরা। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি। কিন্তু সংসারের বাস্তবতা অনেক কঠিন। তার ভাষায়, পরিবারের প্রয়োজন আর সন্তানের স্বপ্নের মাঝখানে প্রতিদিন সমন্বয় করতে হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ থাকলে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ তাদের নির্দিষ্ট আয় থাকলেও ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ফলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং সঞ্চয়ের সুযোগও সংকুচিত হয়।

তারা বলছেন, শুধু বড় উন্নয়ন প্রকল্প নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাপ কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন খাতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণি দুর্বল হয়ে গেলে সামগ্রিক নগর অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে।

এএইচ/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর