বিগত সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি, দুর্নীতি, লুটপাট এবং অনিয়মের কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ভুল সিদ্ধান্ত, বিতর্কিত চুক্তি এবং ক্যাপাসিটি চার্জের নামে অর্থ অপচয়ের কারণে জনগণকে এখন এর খেসারত দিতে হচ্ছে। শুধু বিদ্যুৎ খাতেই বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী এসব বলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট। একইসঙ্গে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীরও এটি প্রথম বাজেট।
বিজ্ঞাপন
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি এবং এ খাতে সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ খাতে হরিলুট হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মন্ত্রী জানান, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে সম্পাদিত বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে একতরফা ও বিতর্কিত শর্ত সংযোজনের ফলে বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বর্তমান সরকারের ওপর এসে পড়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমির খসরু বলেন, বর্তমানে দেশে আমদানি করা বিদ্যুৎ এবং অন-গ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। কিন্তু এত উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
মন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এসব পরিকল্পনার মাধ্যমে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অর্থমন্ত্রী জানান, বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পুরো খাতকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হবে।
মন্ত্রী বলেন, অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিকায়ন করা হবে। একই সঙ্গে ‘লিস্ট কস্ট জেনারেশন’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ক্যাপাসিটি চার্জ এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্কের পূর্ণাঙ্গ আধুনিকায়ন এবং স্মার্ট গ্রিড উন্নয়নের মাধ্যমে সিস্টেম লস কমিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বলে জানান আমির খসরু। একই সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা এবং সঞ্চালন লাইন ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে গৃহীত সংস্কার ও উন্নয়ন উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশে তুলনামূলক সাশ্রয়ী, নিরবচ্ছিন্ন এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে উৎপাদনশীল খাতের সক্ষমতা বাড়বে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সংসদ ভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি থাকতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে সাড়ে ৭ শতাংশ।
এএইচ/ক.ম

































































