বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ঢাকা

সাইফুরের পর কাঁধে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব, কেমন হচ্ছে আমির খসরুর বাজেট?

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২৬, ১২:১৯ পিএম

শেয়ার করুন:

Budget-news-dhakamail
২০২৬-২৭ অর্থবছরের দেশের ৫৬তম জাতীয় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
  • ব্যবসায়ী নেতা থেকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু
  • মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বঞ্চিতদের কল্যাণে জোর
  • বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় থাকছে সুনির্দিষ্ট পথনির্দেশনা 
  • বড় সুখবর পেতে পারেন সরকারি চাকরিজীবীরা

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সমাজের বঞ্চিত মানুষের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের দেশের ৫৬তম জাতীয় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল তিনটায় জাতীয় সংসদে তিনি এই বাজেট উপস্থাপন করবেন।


বিজ্ঞাপন


বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে বুধবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে বিরতির সময়ে নিজের চেম্বারে বাজেট নিয়ে একান্ত আলাপকালে অর্থমন্ত্রী এসব কথা জানান।

বাজেটের মূল ভাবনা নিয়ে অর্থমন্ত্রী ঢাকা মেইলকে বলেন, রাত পোহালেই বাজেট ঘোষণা করব। অস্থির হওয়ার কিছু নেই, একটু অপেক্ষা করুন। এই মুহূর্তে বিস্তারিত বলা যাবে না, তবে এটুকু বলতে পারি—আমরা একটি চমৎকার বাজেট দিতে যাচ্ছি। সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের কল্যাণের কথা এই বাজেটে থাকবে। ছাত্র, শ্রমিক, কামার, কুমার থেকে শুরু করে প্রান্তিক মানুষজন—কেউই বাদ যাবে না।'

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেটের 

আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ব্যয় ধরে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের ফর্দ মেলাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী।


বিজ্ঞাপন


আকার চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে ১৯ শতাংশ বেশি হওয়ার আভাস মিলেছে। চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে একবারেই আকার বাড়তে যাচ্ছে প্রায় এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা।

অতীতের অনিয়মের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, আমরা বঞ্চিত মানুষজনকে বিশেষভাবে অ্যাড্রেস করতে চাই। অতীতে দেশের প্রান্তিক মানুষের দিকে সেভাবে নজর দেওয়া হয়নি, ফ্যাসিস্ট শাসনামলে কী হয়েছে তা জনগণ দেখেছে। আমরা এর পরিবর্তন চাই। তারেক রহমানের সরকার সমাজের প্রত্যেকটা শ্রেণী ও মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেই এই বাজেট তৈরি করছে।

বাজেটের মূল ফোকাস ও নির্বাচনী অঙ্গীকার 

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটে আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফেরানো, সামষ্টিক অর্থনীতি (ম্যাক্রো ইকোনমি) শক্তিশালীকরণ এবং রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করতে কার্যকর বিভিন্ন পদক্ষেপ থাকবে।

এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পথনির্দেশনা থাকবে এই বাজেটে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান শপথ নেওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া বিভিন্ন নির্বাচনি অঙ্গীকার—যেমন ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ এবং ‘খাল খনন’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের রূপরেখাও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নেপথ্যের কর্মযজ্ঞ 

বাজেট চূড়ান্ত করার শেষ মুহূর্তে অর্থমন্ত্রীকে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করতে হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত পাঁচ দিন অর্থমন্ত্রী টানা ১৮ থেকে ১৯ ঘণ্টা কাজ করেছেন। বাজেট প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্বে তার এই নিবিড় সম্পৃক্ততা অত্যন্ত জরুরি ছিল। বুধবার সন্ধ্যায়ও তিনি সংসদ ভবনের ছয় তলায় নিজের চেম্বারে একা বসে বাজেট বক্তৃতার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছিলেন এবং এই সময়ে তিনি কারও সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ করেননি।

ব্যবসায়ী নেতা থেকে অর্থমন্ত্রী

বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত চার বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারে তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত তারেক রহমানের সরকারে তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের হাল ধরেন।

অতীতে জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে বেগম খালেদা জিয়ার শাসন আমলে বিএনপির হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় সামাল দিয়েছিলেন দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এম সাইফুর রহমান। এবার তারেক রহমান তার ওপর আস্থা রেখে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকেই বেছে নিয়েছেন।

রাজনীতির পাশাপাশি আমির খসরু একজন সফল ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষাবিদ। লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে হিসাব-বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা এবং চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক চেয়ারম্যান। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়া এক্সচেঞ্জ ফেডারেশনের প্রথম সভাপতি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অনারারি কনসাল হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

ইতিহাসের বড় বাজেট, কি থাকছে প্রস্তাবিত বাজেটে?

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এই বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে এই বাজেট পেশ করবেন। 

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর এটি বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ও দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ছাড়াও এবারের বাজেটে সরকারের মূল লক্ষ্য ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির’ পথে এগিয়ে নেওয়া।

বাজেটের আকার ও ঘাটতি

দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে সংগ্রহ করা হবে। এছাড়া আসন্ন বাজেটে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

জিডিপি, প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি

অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আসন্ন প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত সম্ভাব্য বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগ ও বাংলাবিজ

এবারের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার উদ্যোগ। এর আওতায় লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার পাশাপাশি ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।

উদ্যোক্তা তহবিল ও এসএমই

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আসন্ন বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে।

কর্মসংস্থান ও যুব উন্নয়ন

নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রাখার পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকতে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তা ও ই-হেলথ কার্ড 

আসন্ন বাজেটে ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার সঙ্গে বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে।

নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা 

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন অর্থবছরের বাজেটে বড় সুখবর আসতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণা আসতে পারে।

বিইউ/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর