বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ঢাকা

সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক আবু আহমেদ

বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম

শেয়ার করুন:

বাজেটের লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার: আবু আহমেদ

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এমন এক সময়ে আসছে, যখন দেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে ধীরগতি, কর্মসংস্থান সংকট এবং রাজস্ব আহরণের চাপের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বড় বাজেট, বড় ঘাটতি এবং ঋণনির্ভর অর্থায়নের মধ্যে সরকার কী ধরনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে, তা নিয়ে চলছে আলোচনা। 

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, বাজেটের সাফল্য শুধু এর আকারে নয়; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর নির্ভর করবে। তিনি মনে করেন, সুদের হার কমানো, করব্যবস্থাকে আরও যৌক্তিক করা এবং পুঁজিবাজারকে সক্রিয় করতে না পারলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। একইসঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। 


বিজ্ঞাপন


আসন্ন বাজেটের নানা দিক, অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ এবং করণীয় নিয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক আবু আহমেদ। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা মেইলের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক তারিক আবেদীন ইমন

ঢাকা মেইল: এবারের বাজেটের আকারকে কীভাবে দেখছেন?

আবু আহমেদ: বাজেটের আকার বড় হওয়া বর্তমান বাস্তবতায় অস্বাভাবিক নয়। সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা থেকেই বাজেটের পরিধি বাড়ছে। আমি মনে করি, এবার কিছু নতুন ও সৃজনশীল উদ্যোগও থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা শুধু তৈরি পোশাক খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যান্য রপ্তানিমুখী খাতেও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে বড় বাজেটের সঙ্গে বড় ঘাটতির বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে গেলে কিছু ঘাটতি থাকবেই, কারণ রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছানো সবসময় সম্ভব হয় না।

ঢাকা মেইল: বড় বাজেট কি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক?


বিজ্ঞাপন


আবু আহমেদ: শুধু বাজেটের আকার বড় হলেই ইতিবাচক ফল আসবে না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পরিচালন ব্যয় এবং উন্নয়ন ব্যয়ের কারণে বাজেট বড় হওয়া ছাড়া খুব বেশি বিকল্পও নেই। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগ বাড়াতে হয়। তবে সেই ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 

news
অধ্যাপক আবু আহমেদ (ফাইল ছবি)

ঢাকা মেইল: আপনার মতে এবারের বাজেটের প্রধান লক্ষ্য কী হওয়া উচিত?

আবু আহমেদ: আমার মতে বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাঙা করা। বর্তমানে অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান সংকট এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা। সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে বাজারে পণ্যের প্রবাহ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও কমে আসবে। অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বাজেটকে সেই দিকেই কেন্দ্রিত করতে হবে।

ঢাকা মেইল: জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?

আবু আহমেদ: বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে কিছুটা স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রবৃদ্ধির হার অন্তত সাড়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করার চেষ্টা করতে হবে। প্রবৃদ্ধি বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, রাজস্ব আহরণ বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরে আসবে।

ঢাকা মেইল: সামাজিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

আবু আহমেদ: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি অনেকাংশে সরকারের রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যদি উৎপাদন ও বিনিয়োগ না বাড়ে, তাহলে কেবল ব্যয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে।

ঢাকা মেইল: ব্যাংক থেকে সরকারের বড় অংকের ঋণ গ্রহণকে কীভাবে দেখছেন?

আবু আহমেদ: বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অলস অর্থ রয়েছে। ফলে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোই বেশি জরুরি। সরকারকে এমন নীতি নিতে হবে যাতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন এবং অর্থনীতির গতি বাড়ে।

ঢাকা মেইল: বিনিয়োগ বাড়াতে ও পুঁজিবাজার সম্প্রসারণে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ কী?

আবু আহমেদ: আমার মতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সুদের হার কমানো। বর্তমানে ঋণের উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায় আমাদের সুদের হার অনেক বেশি। সুদের হার কমাতে পারলে শিল্পোদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন এবং কর্মসংস্থানও বাড়বে। আর ভালো ও লাভজনক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সরকার চাইলে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সুকুক ও বন্ডের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। এতে বাজারের গভীরতা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের সঞ্চয় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হবে।

ঢাকা মেইল: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ নিয়ে আপনার মতামত কী?

আবু আহমেদ: এটা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন কারণ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির তুলনায় সন্তোষজনক নয়। পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তারও অনেক ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় না। দুর্নীতি, অপচয় এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এই খাতগুলোতে জবাবদিহিতা বাড়ানো জরুরি।

ঢাকা মেইল: বাজেট ঘাটতি কমানোর উপায় কী হতে পারে?

আবু আহমেদ: বাজেট ঘাটতি কমাতে হলে প্রথমত সরকারের পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে যাতে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে সরকারের ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাতগুলোর একটি হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধ। এই চাপ কমাতে হলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

ঢাকা মেইল: রাষ্ট্রায়ত্ত অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে আপনার মত কী?

আবু আহমেদ: অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লোকসান গুনছে এবং সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধাপে ধাপে পুঁজিবাজারে ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে সরকারের আর্থিক চাপ কমবে এবং সম্পদের আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

ঢাকা মেইল: বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?

আবু আহমেদ: বর্তমানে অর্থনীতি এবং পুঁজিবাজার—দুই ক্ষেত্রেই এক ধরনের স্থবিরতা রয়েছে। একই সঙ্গে বড় বাজেট ঘাটতি নিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে উঠছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকা বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা মেইল: সরকারের জন্য আপনার প্রধান অর্থনৈতিক পরামর্শ কী?

আবু আহমেদ: সুদের হার কমানো, করব্যবস্থাকে আরও যৌক্তিক করা এবং পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা—এই তিনটি বিষয়কে আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেব। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরে আসবে।

টিএই/

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর