শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬, ঢাকা

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষের ওপর চাপ বাড়বে, ব্যয়বহুল হবে জীবনযাত্রা

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০৬ জুন ২০২৬, ০১:১৫ পিএম

শেয়ার করুন:

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষের ওপর চাপ বাড়বে, ব্যয়বহুল হবে জীবনযাত্রা

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের অস্থিরতার মধ্যে নতুন করে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। বিদ্যুৎ শুধু গৃহস্থালির ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ নয়; কৃষি, শিল্প, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ও সেবা খাতসহ অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব ধীরে ধীরে খাদ্যপণ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার ব্যয়েও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সম্প্রতি গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে পাইকারি ও সঞ্চালন পর্যায়েও বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন এই মূল্যহার কার্যকর হওয়ার পর এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কীভাবে পড়ে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির তাৎক্ষণিক প্রভাব বেশি পড়বে কৃষি সেচ ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে। কারণ এই দুই খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি এবং ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি জনজীবনে পড়ে।

সেচ ব্যয় বাড়বে, চাপে কৃষক

বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, নিম্নচাপ কৃষি সেচে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বেড়ে ৬ টাকা ৪ পয়সা হয়েছে। মধ্যমচাপ সেচেও দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার বড় অংশই এখন সেচনির্ভর কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ধান, ভুট্টা ও সবজি উৎপাদনে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাবে।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশ কৃষক সমিতির নেতারা বলছেন, কৃষক ইতোমধ্যে সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয়ের চাপে রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি কৃষকদের জন্য নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

তাদের মতে, উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষক সবসময় তারা পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না। ফলে ক্ষতির ঝুঁকি বাড়বে। আবার কৃষক যদি বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে বাজারে বেশি দাম চান, তাহলে তার প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়বে।

হাসপাতালের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা

স্বাস্থ্যসেবা খাতেও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নতুন ঘোষণায় হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ানো হয়েছে।

হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, ল্যাব, এক্স-রে, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, পরিচালন ব্যয় বাড়লে তার একটি অংশ সেবার মূল্যে প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে ফি বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেই, তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় সমন্বয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।

স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুতের পাশাপাশি জ্বালানি, আমদানি ব্যয় এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের মূল্যও বেড়েছে। ফলে হাসপাতালগুলোর জন্য ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠছে।

বাজারেও ছড়াতে পারে প্রভাব

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের মতে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে অর্থনীতির সব খাতে পড়ে। কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার চাপ ভোক্তার ওপরই আসে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ আধুনিক অর্থনীতির একটি মৌলিক উপকরণ। এর মূল্য বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং সেবা প্রদানের ব্যয়ও বাড়ে। ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব একদিনে বোঝা যায় না। কয়েক মাসের ব্যবধানে এর প্রভাব বাজারে দৃশ্যমান হতে শুরু করে। কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ক্ষুদ্র শিল্পের পণ্য, এমনকি বিভিন্ন সেবার দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সামনে কী হতে পারে?

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব একদিনে বোঝা যায় না। তবে কয়েক মাসের মধ্যে তা ধীরে ধীরে বাজারে দৃশ্যমান হয়। কৃষিপণ্য, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, ক্ষুদ্র শিল্প উৎপাদন এবং বিভিন্ন সেবার খরচ বাড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করছেন, সেচ ব্যয় বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনকে ব্যয়বহুল করতে পারে, আর হাসপাতালের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি চিকিৎসাসেবার খরচ বাড়ানোর চাপ তৈরি করতে পারে।

ফলে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি মানুষের খাবার ও চিকিৎসার খরচও বাড়াবে, সেই প্রশ্ন এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এমন অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর চাপ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন তারা।

electricity_
নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাইকারি পর্যায়ের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণত খুচরা পর্যায়ে মূল্য সমন্বয়ের পথ তৈরি করে। ফলে ভবিষ্যতে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ সংস্থা কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতে এখন নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বাড়ানোর দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো সৌর ও বায়ুশক্তিসহ বিভিন্ন বিকল্প জ্বালানি উৎসে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ খাতের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি এখনো দৃশ্যমান নয়।’

নাজের হোসাইন আরো বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে যথাযথ গুরুত্ব না দিলে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আরো বাড়বে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি পড়বে এবং ঘন ঘন বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দ্রুত, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বিকল্প নেই।’

এমআর/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর