স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৭১৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা, আর সংশোধিত বাজেট ছিল ৬৮৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের ব্যবধানে সেই বাজেট এখন পৌঁছেছে ৯ লাখ কোটি টাকার ঘরে। আজ (বৃহস্পতিবার) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যা হবে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে দেশের প্রথম বাজেট ঘোষণা করেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ওই বাজেটের প্রস্তাবিত আকার ছিল ৭১৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং সংশোধিত বাজেট ছিল ৬৮৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে বাজেটের আকার বেড়ে দাঁড়ায় ৮২০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে তা পৌঁছে ৯৯৫ কোটি ২০ লাখ টাকায়।
বিজ্ঞাপন
১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে ড. আজিজুর রহমান মল্লিক ১ হাজার ৫৪৯ কোটি ২০ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেন, যা ছিল দেশের প্রথম দিকের বড় বাজেটগুলোর একটি। এরপর ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১ হাজার ৯০৮ কোটি ২০ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে বাজেটের আকার ২ হাজার কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে ২ হাজার ৯৭ কোটি টাকায় পৌঁছে। ১৯৭৮-৭৯ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে হয় ২ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা।
আশির দশকে বাজেটের আকার দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে এম সাইফুর রহমান ৪ হাজার ২২৭ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন। ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে আবুল মাল আবদুল মুহিতের বাজেট ৬ হাজার ৫৬ কোটি ৫০ লাখ টাকায় পৌঁছে। ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে বাজেট প্রথমবারের মতো ১০ হাজার কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করে ১০ হাজার ৩০০ কোটি ৮০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়।
নব্বইয়ের দশকে অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে বাজেটের আকারও ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে এম সাইফুর রহমান ১৬ হাজার ৩৭৩ কোটি ৩০ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে বাজেটের আকার ২১ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে শাহ এ এম এস কিবরিয়া ৩৬ হাজার ১৭৮ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন।
বিজ্ঞাপন
২০০০-এর দশকে বাজেটের প্রবৃদ্ধি আরও গতি পায়। ২০০০-০১ অর্থবছরে বাজেট দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। ২০০৩-০৪ অর্থবছরে তা ৫১ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা এবং ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৬৪ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকায় পৌঁছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ৮৭ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। পরের অর্থবছরে বাজেটের আকার ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকায় পৌঁছে লাখ কোটি টাকার দ্বারপ্রান্তে চলে আসে।
আরও পড়ুন: দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট পেশ আজ
২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো দেশের বাজেট ১ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে। ওই বছর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৯ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। এরপর ২০১০-১১ অর্থবছরে বাজেট হয় ১ লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা এবং ২০১১-১২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা।
২০১২-১৩ অর্থবছরে বাজেট ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা প্রথমবারের মতো ২ লাখ কোটি টাকার সীমা ছাড়িয়ে ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকায় পৌঁছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাজেটের আকার দাঁড়ায় ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। পরের বছর তা বেড়ে হয় ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাতীয় বাজেট ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকায় পৌঁছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বাজেট ৪ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটের আকার দাঁড়ায় ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা।
২০১৯-২০ অর্থবছরে আ হ ম মুস্তফা কামাল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে দেশের বাজেট প্রথমবারের মতো ৫ লাখ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেট হয় ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়ে ৬ লাখ কোটি টাকার সীমা ছাড়ায়।
২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজেটের আকার দাঁড়ায় ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন। তবে সংশোধিত বাজেটে এর আকার কমে ৭ লাখ ১৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকায় নেমে আসে।
এবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। স্বাধীনতার পর প্রথম বাজেটের সংশোধিত আকার ছিল ৬৮৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সেই তুলনায় নতুন বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৬৫ গুণ। এর মধ্য দিয়ে দেশের জাতীয় বাজেট প্রথমবারের মতো ৯ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করতে যাচ্ছে।
স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বেশি বাজেট উপস্থাপনের রেকর্ড রয়েছে আবুল মাল আবদুল মুহিতের দখলে। তিনি টানা ১০টি বাজেট উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে তাজউদ্দীন আহমদ, এম সাইফুর রহমান, শাহ এ এম এস কিবরিয়া, আ হ ম মুস্তফা কামাল, আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের মতো অর্থমন্ত্রী ও অর্থ উপদেষ্টাদের হাত ধরে বাংলাদেশের বাজেট ধাপে ধাপে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের এই সম্প্রসারণ দেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তার এবং সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রতিফলন। তবে একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করাও আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
টিএই/এমআই






















