বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ঢাকা

‘স্বাস্থ্য বাজেট শুধু বাড়ালেই হবে না, মানুষের উপকারে লাগাতে হবে’

মাহফুজ উল্লাহ হিমু
প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:০৫ এএম

শেয়ার করুন:

‘স্বাস্থ্য বাজেট শুধু বাড়ালেই হবে না, মানুষের উপকারে লাগাতে হবে’
বাজেটের আকার বাড়ালেই হবে না, সেটির পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তবে তিনি বলছেন, শুধু বাজেটের আকার বাড়ালেই হবে না, সেটির পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, সরকার যদি স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে, তবে তা ধীরে ধীরে বাড়ানো উচিত।

ঢাকা মেইলের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বাজেটের ব্লক বা থোক বরাদ্দের অর্থ মাতৃস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং জটিল রোগের চিকিৎসা সুরক্ষায় বিনিয়োগ করা গেলে স্বাস্থ্য খাতে দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।


বিজ্ঞাপন


সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা মেইলের নিজস্ব প্রতিবেদক মাহফুজ উল্লাহ হিমু

প্রশ্ন: আজ নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা হবে। আমরা যতদূর জানতে পেরেছি, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ হতে পারে। সার্বিকভাবে স্বাস্থ্য বাজেট নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?

সৈয়দ আব্দুল হামিদ: আমরা যেটা শুনেছি, সেটা আপনারাও শুনেছেন—স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির ১ শতাংশের কাছাকাছি যেতে পারে। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্লক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। এ কারণেই বাজেট বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি যে, সরকার যদি স্বাস্থ্য খাতে বড় বাজেট দিতে চায়, তাহলে একসময় জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। সে ক্ষেত্রে, প্রথম বছর থেকেই যাত্রা শুরু করতে হবে। এখন যদি সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়, তাহলে আমরা সেটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছি।


বিজ্ঞাপন


প্রশ্ন: স্বাস্থ্য বাজেটের একটা অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। এ বিষয়ে সরকারের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

সৈয়দ আব্দুল হামিদ: শুধু বড় বাজেট হলেই হবে না, সেই বাজেট মানুষের কল্যাণে কার্যকরভাবে ব্যয় করতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা তিনটি—এক, বড় বাজেট; দুই, সেই বাজেটের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার; তিন, ব্যবহার যেন কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়। বাজেট বাড়ল কিন্তু মানুষের উপকারে লাগল না, তাহলে তার কোনো অর্থ নেই।

সরকার বড় বাজেট দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে, এজন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেই বাজেট বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এবং কার্যকর ব্যয় নিশ্চিত করা, যাতে মানুষের প্রকৃত কল্যাণ সাধন হয়।

প্রশ্ন: বাস্তবায়নের জন্য সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে? বাজেটের মধ্যেই কি এ বিষয়ে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা বা বরাদ্দ থাকা উচিত?

সৈয়দ আব্দুল হামিদ: বাস্তবায়নের জন্য কিছু উদ্যোগ বাজেটের মধ্যে এবং আগে থেকেই নেওয়া যায়। তবে বর্তমান সরকার সময় খুব কম পেয়েছে। সে কারণেই তারা বড় একটি অংশ ব্লক বরাদ্দ হিসেবে রেখেছে। বাকি অর্থ নিয়মিত পরিচালন ও উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।

মূল বিষয় হলো, এসব অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে বাজেট পুরোপুরি খরচ হয়নি, আবার অনেক ব্যয় কার্যকরও ছিল না। অপচয় ও অদক্ষতা ছিল। সেসব বন্ধ করতে হবে।

এই যে ২৩ হাজার কোটি টাকার ব্লক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, আমি মনে করি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কথা বলছে, সেটি বাস্তবায়ন করতে পারে। একই সঙ্গে সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (Integrated Primary Health Care) কর্মসূচিও এগিয়ে নিতে পারে।

প্রশ্ন: ব্লক বা থোক বরাদ্দ কীভাবে ব্যবহার করা উচিত?

সৈয়দ আব্দুল হামিদ: আমি মনে করি, এই ২৩ হাজার কোটি টাকার একটি বড় অংশ মাতৃস্বাস্থ্যের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ মা সন্তান জন্ম দেন। সন্তান প্রসবের সময় এখনো প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার মা মৃত্যুবরণ করেন। একটি সভ্য সমাজে মাতৃমৃত্যু যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা জরুরি।

এ লক্ষ্যে সরকার প্রত্যেক মায়ের জন্য প্রায় ৫০ হাজার টাকা সমমূল্যের সেবা প্যাকেজ নির্ধারণ করতে পারে। ৩০ লাখ মাকে একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হলে তিন ধাপে, প্রতি বছর ১০ লাখ করে মাকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।

এই অর্থ নগদ দেওয়া হবে না; বরং সেবার মাধ্যমে ব্যয় হবে। যেমন, মাল্টিপল মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট, ক্যালসিয়াম, ভিটামিনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ, গর্ভকালীন চার থেকে আটটি স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করা। সরকারি হাসপাতাল ও মানসম্মত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই সেবা দেওয়া যেতে পারে।

এর ফলে মায়েরা পুষ্টিসম্পন্ন সন্তান জন্ম দিতে পারবেন, নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত হবে এবং মাতৃমৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। ২৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা এ খাতে ব্যয় করে সরকার দ্রুত একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ক্যানসার, কিডনি রোগ, ডায়ালাইসিস, হৃদরোগসহ জটিল দীর্ঘমেয়াদি রোগের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। যেমন থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য বর্তমানে সরকার নির্দিষ্ট পরিমাণ সহায়তা দেয়।

সব পরিবারের মাতৃস্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন নেই, কিন্তু কিছু পরিবারে জটিল রোগের চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। এসব পরিবারকে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার একটি প্যাকেজের আওতায় আনা যেতে পারে।

এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার শিকার রোগীদের জন্যও একটি ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বর্তমানে দুর্ঘটনার পর অনেক রোগী বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলেও অর্থের অভাবে যথাসময়ে চিকিৎসা পায় না। সরকার যদি বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে একটি সমন্বয় ব্যবস্থা করে, তাহলে দুর্ঘটনার রোগীদের জরুরি চিকিৎসা দিয়ে পরে হাসপাতালগুলো সরকার থেকে অর্থ পেতে পারে।

প্রাথমিকভাবে ক্যানসার, কিডনি রোগ এবং দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা—এই তিনটি ক্ষেত্র দিয়ে কর্মসূচি শুরু করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রেও ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত কভারেজ দেওয়া সম্ভব।

এভাবে সরকার শুধু বাজেটের আকার বাড়াবে না, বরং তার যথাযথ ব্যবহারও নিশ্চিত করতে পারবে। কারণ বড় বাজেটের পাশাপাশি মানুষের উপকারে আসে এমন যৌক্তিক কর্মসূচিও থাকতে হবে।

প্রশ্ন: বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য সরকার প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা রাখছে, যার মধ্যে স্বাস্থ্য কার্ডও থাকবে। এই বরাদ্দ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে কী?

সৈয়দ আব্দুল হামিদ: এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব আমি দিয়েছি। সরকার যে ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে, তার সঙ্গে স্বাস্থ্য সুবিধা যুক্ত করা যেতে পারে। প্রত্যেক পরিবারকে বছরে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকার ইনডোর চিকিৎসা সুবিধা (In-patient Benefit) দেওয়া যেতে পারে। এই অর্থ নগদ দেওয়া হবে না; বরং সেবার মাধ্যমে ব্যয় হবে। যেমন—মাল্টিপল মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট, ক্যালসিয়াম, ভিটামিনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ, গর্ভকালীন চার থেকে আটটি স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করা। সরকারি হাসপাতাল ও মানসম্মত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই সেবা দেওয়া যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে একটি সেবা প্যাকেজের সর্বোচ্চ সীমা বা প্রায় ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এই টাকার ভেতর থেকেই সরকারি হাসপাতালের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হবে। অর্থাৎ সেবার একটি নির্ধারিত মূল্য কাঠামো থাকবে, যাতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে যেভাবে সেবা দেওয়া হচ্ছে তার আর্থিক মূল্যায়ন ও হিসাব করা সম্ভব হয়।

বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া হলেও তার কোনো সুনির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ নেই; কোথাও ১০ টাকা টিকিট, কোথাও ৫০০ টাকা, আবার কোথাও ২০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। তাই একটি একক মূল্য কাঠামো নির্ধারণ করে দিলে পুরো সেবার হিসাব ও ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ হবে।

এই অতিরিক্ত বাজেটের জন্য আলাদা বরাদ্দের প্রয়োজন হলেও সেটি সামগ্রিক বাজেট কাঠামোর মধ্যেই রাখা সম্ভব। যেহেতু সরকার চলতি বাজেটে বড় ধরনের ব্লক বরাদ্দ রেখেছে, তাই এখান থেকেই এই খাতে অর্থায়ন করা যেতে পারে।

সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন কার্ড কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪০ থেকে ৪২ লাখ মানুষের জন্য কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যা বিভিন্ন জেলায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। যেখানে ই-হেলথ কার্ড বা সামাজিক সুরক্ষা কার্ড চালু হচ্ছে, সেখানে এই স্বাস্থ্য সুবিধা যুক্ত করা আরও সহজ হবে।

এমএইচ/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর