বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ঢাকা

গ্রামের মানুষ কী চায় এবারের বাজেটে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২৬, ০২:০০ পিএম

শেয়ার করুন:

গ্রামের মানুষ কী চায় এবারের বাজেটে?

গ্রামের মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু তাদের চাওয়া খুব সাধারণ ও বাস্তবভিত্তিক। রাস্তা, চিকিৎসা, কৃষি সহায়তা, কাজের সুযোগ। শহরের বাজেট আলোচনা যেখানে বড় বড় অঙ্ক আর নীতির ভেতরে সীমাবদ্ধ, সেখানে গ্রামীণ জীবনের হিসাব একেবারেই আলাদা। সেখানে বাজেট মানে আগামী মৌসুমে চাষ করা যাবে কি না, সার পাওয়া যাবে কি না, আর অসুস্থ হলে হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী গ্রামের মাঠে দাঁড়িয়ে কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, ডিজেল আর সারের দাম না কমলে কৃষি টিকবে না। তার মতে, এবার ধান চাষে খরচ এত বেড়েছে যে লাভের আশা করা কঠিন হয়ে গেছে। জমিতে সেচ দিতে গিয়ে প্রতিবারই বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে, আর সেই চাপ সরাসরি সংসারে গিয়ে পড়ছে। এখন ফসল ফলালেও লাভ থাকে না, শুধু ঋণের বোঝা বাড়ে। আবার সেই ঋণ শোধ করতে নতুন করে ধার করতে হয়।


বিজ্ঞাপন


চাঁপাইনবাবগঞ্জের আরেক সীমান্তবর্তী গ্রামের কৃষক বারিউল ইসলাম বলেন, মাঠে কাজ করলেও এখন আর আগের মতো স্বস্তি নেই। আবহাওয়া, বাজারদর আর উৎপাদন খরচ সবকিছুই অনিশ্চিত। তিনি জানান, কখনো ভালো ফলন হলেও দাম পড়ে যায়, আবার কখনো খরচই উঠে আসে না। আমরা বড় কিছু চাই না, শুধু চাই পরিশ্রমের ফল যেন হাতে থাকে।

একই এলাকার কৃষক আব্দুল বাক্কার জানান, ধান বিক্রি করে যে টাকা আসে, তা দিয়ে আগের ঋণ শোধ করতেই শেষ হয়ে যায়। নতুন মৌসুম শুরু হয় আবার ধার করে। তিনি বলেন, চাষাবাদ এখন আর লাভের কাজ নয়, এটা শুধু টিকে থাকার লড়াই হয়ে গেছে। বাজেটে কৃষকদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো উৎপাদন খরচ কমানো এবং ন্যায্য দামে সার ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।

গ্রামের দিনমজুরদের অবস্থাও একই রকম চাপের মধ্যে। কাজ কমেছে, কিন্তু খরচ কমেনি। অনেক সময় সপ্তাহে দুই-তিন দিন কাজ মেলে, আবার কখনো সেটাও থাকে না। সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের দিনমজুর হযরত আলী বলেন, আগে কাজ ছিল, এখন নেই। কাজ না থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়। তার মতে, বাজেটে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।


বিজ্ঞাপন


চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার চর নারায়নপুর এলাকার বাসিন্দা জাহানারা বেগম বলেন, জ্বর-সর্দি হলেও হাসপাতালে যেতে হয়, কিন্তু সেখানে গিয়ে অনেক সময় ডাক্তার পাওয়া যায় না। ওষুধ কিনতে গিয়ে খরচ আরও বেড়ে যায়। গ্রামের মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে চিকিৎসা নিয়ে, কারণ একবার অসুস্থ হলেই পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নড়ে যায়।

গ্রামীণ শিক্ষকদের কাছেও বাস্তবতা কঠিন। অনেক স্কুলে শিক্ষক সংকট, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নেই। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার চর এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জামাল উদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত আসে, কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বাজেটে শিক্ষা খাতে বাস্তব বরাদ্দ ও অবকাঠামো উন্নয়ন না হলে গ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থা আরও পিছিয়ে পড়বে।

গ্রামের আরেকটি বড় সমস্যা যোগাযোগ ব্যবস্থা। অনেক এলাকায় এখনো কাঁচা রাস্তা রয়েছে, বর্ষায় যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সিরাজগঞ্জের লুৎফর রহমান বলেন, বৃষ্টি হলে রাস্তা ডুবে যায়, তখন নৌকাই একমাত্র ভরসা। রোগীকে হাসপাতালে নিতে দেরি হলে অনেক সময় বড় বিপদ ঘটে যায়। তাই তাদের প্রধান চাওয়া হলো সহজ ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো গ্রামীণ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই বাজেটে গ্রামীণ খাতকে গুরুত্ব না দিলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে। তাদের মতে, কৃষি ভর্তুকি, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানে আলাদা নজর দেওয়া জরুরি।

গ্রামের মানুষ বাজেটের জটিল হিসাব বোঝে না, কিন্তু তারা খুব সহজ ভাষায় বোঝে তাদের জীবন কতটা কঠিন হয়ে গেছে। মাঠে কাজ করেও যদি সংসার না চলে, চিকিৎসার জন্য শহরে ছুটতে হয়, আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকে, তাহলে বাজেটের বড় বড় সংখ্যার কোনো অর্থ তাদের কাছে থাকে না।

এএইচ/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger

টাইমলাইন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর