# ডাক পড়লেই মনে হতো কসাইখানায় যাচ্ছি
# পেটানোর আগে জম টুপি পরানো হতো প্রত্যেককে
# নেতৃত্বে ছিলেন ডিবির হারুন ও মশিউর
চব্বিশ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) কার্যালয়ে আটক থাকা দিনগুলোর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপি নেতা সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তার দাবি, ডিবি কার্যালয়কে তখন ‘কসাইখানায়’ পরিণত করা হয়েছিল। রিমান্ডের নামে চোখে ‘জম টুপি’ পরিয়ে, হাতকড়া পরিয়ে ঝুলিয়ে মারধর করা হতো।
ঢাকা মেইলের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জুলাই আন্দোলনের সময় নিজের গ্রেফতার, ডিবি হেফাজতে থাকা এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন এই বিএনপি নেতা।
টুকু জানান, ওই সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাকর্মীকে ডিবি কার্যালয়ে রাখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে বর্তমানে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও ছিলেন।
রিমান্ডের নামে চলতো নির্যাতন
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ছাড়াও জুলাই আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হয়ে ডিবি কার্যালয়ে ছিলেন বর্তমান প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, সংসদ সদস্য শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী, গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নূর, জামায়াত নেতা গোলাম পরোয়ার, এনসিপি নেতা সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, নাহিদরাও।
প্রতিমন্ত্রী টুকুর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮ জুলাইয়ের পর বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের ধরে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে আটক রাখা হয়েছিল। তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো।
বিএনপির এই নেতা বলেন, রিমান্ডের সময় অনেককে হাতকড়া পরিয়ে চোখ-মুখ ঢেকে নির্যাতন করা হতো। তার দাবি, ডিবির গারদ থেকে দুই পুলিশ সদস্য এসে ডাক দেওয়া ব্যক্তিকে নিয়ে যেতেন রিমান্ড কক্ষে। তাদের হাতে থাকতো গামছা। সেখানে হাতকড়া বেঁধে ও জম টুপি পরিয়ে ঝুলিয়ে মারধর করা হতো।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মারধরের কারণে অনেকের উরু-পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত ঝরতো। কিন্তু চিকিৎসা না দিয়ে পরদিন আবারো নির্যাতন করা হতো। ২০ জুলাই থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত টানা নির্যাতন করা হয়েছিল। সেই আঘাতের চিহ্ন এখনো আছে।’
তার ভাষায়, ডিবি অফিসকে তারা কসাইখানা বানিয়ে ফেলেছিল। ডাক পড়লেই মনে হতো, কসাইখানায় যাচ্ছি।
চোখ বেঁধে সারাদিন ঝুলিয়ে পেটানো হয়
গ্রেফতারের পর নিজের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে টুকু জানান, ১৯ জুলাই রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ২০ জুলাই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাকে ঝুলিয়ে মারধর করা হয়।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘গ্রেফতারের পরদিন ২০ জুলাই সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাকে ঝুলিয়ে পেটানো হয়। হাতে হ্যান্ডকাফ থাকা অবস্থায় ঝুলানো হয়েছিল। একপর্যায়ে আমি প্রায় আধা ঘণ্টা অচেতন ছিলাম। সন্ধ্যায় চোখ খুলে দেওয়ার সময় মাগরিবের আজান হচ্ছিল। এরপর আমাকে তোলা হয় আদালতে।
বিএনপির এই নেতা বলেন, বিচারককে নিজের শরীরের আঘাতের চিহ্ন দেখিয়ে রিমান্ড না দেওয়ার অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু এরপরও রিমান্ডে পাঠানো হয়। এরপর টানা ১৪ দিন ডিবিতে রিমান্ড শেষে ৪ আগস্ট তিনিসহ অন্যদের কারাগারে পাঠানো হয় বলে জানান তিনি।
টুকু বলেন, ‘শুধু আমাকে নয়, তখন আমিনুল ইসলামসহ অনেককেই হাতকড়া পরিয়ে ঝুলিয়ে মারা হয়েছিল। সেই হাতকড়ার কালো দাগ দীর্ঘদিন ছিল।
নেতৃত্বে ছিলেন ডিবির হারুন ও মশিউর
ডিবিতে নির্যাতনের সময় তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদ ও ডিসি মশিউর রহমানের উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন টুকু।
তিনি বলেন, ‘আমাকে পেটানোর সময় তারা পাশেই দাঁড়িয়ে থাকতেন আর প্রশ্ন করতেন। চোখ বাঁধা থাকলেও কন্ঠ শুনে পরে বুঝতে পারি তারা সেখানে নেতৃত্বে ছিলেন।’
গ্রেফতারের রাতের বর্ণনা
গ্রেফতারের রাতের বর্ণনা দিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, ১৯ জুলাই রাতে তাকে ও আমিনুল হককে গুলশান-বারিধারা এলাকার একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনি বলেন, ‘সেই দিন সকাল দশটায় রামপুরায় মিছিল করে রাতে গুলশানে এমএ সালামের বাসায় রাত কাটাতে যাই। রাত ১২টার পর পুলিশ সেই বাসায় হানা দেয়। বাসায় ঢুকে পুলিশ এমএ সালামকে ঘুষি মারে এবং বাসার সবাইকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। আমার বুকে তিনটা রাইফেল তাক করে ধরে। পরে চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে সারারাত পুরো শহর ঘুরিয়ে সকালে ডিবি অফিসে নেয়।’
গায়েবানা জানাজার মিছিলে গুলি
জুলাই আন্দোলনের সময় ১৯ জুলাই কাকরাইল মসজিদে জুমার নামাজ শেষে গায়েবানা জানাজার মিছিলের ঘটনাও তুলে ধরেন টুকু। জানান, ১৮ জুলাই বিএনপি সারাদেশে গণহত্যার প্রতিবাদে গায়েবানা জানাজার মিছিল করার ঘোষণা দেয়। তারই অংশ হিসেবে ১৯ জুলাই কাকরাইল মসজিদে জুমার নামাজ পড়েন তিনি এবং আমিনুল হক। নামাজের পর তাদের নেতৃত্বে মসজিদটি থেকে একটি গায়েবানা জানাজার মিছিল বের করা হয়। মৎস্য ভবন মোড়ে যাওয়া মাত্রই মিছিলে গুলি করে পুলিশ। এতে রাজ নামে এক বিএনপি কর্মী পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। পরে তিনি ও আমিনুলসহ অন্যরা আহত ব্যক্তিতে পল্টনের দলীয় অফিসে নিয়ে যান।
সেদিন বিকেলে লন্ডন থেকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ফোন করেছিলেন জানিয়ে টুকু বলেন, ‘ঠিক বিকেল পাঁচটার দিকে আমাকে কল করলেন তারেক রহমান। ফোন করেই তিনি বলেন, আপনারা যেহেতু আন্দোলনকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছেন, এই আন্দোলন কিন্তু আর বন্ধ করা যাবে না। পেছনে ফিরে তাকানোর সময় নাই। আপনারা আন্দোলন চালিয়ে যান। এটা সফল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামানো যাবে না।
এমআইকে/এমআর




































































