জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে বাংলাদেশ নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, রাষ্ট্র সংস্কারের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, গণহত্যার বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবি এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়া কতদূর এগিয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো আদৌ জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করছে কি না—এসব প্রশ্ন এখনো জনপরিসরে সমানভাবে আলোচিত। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম মনে করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তি এবং ভয়হীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্থান। তবে তাঁর ভাষায়, ‘ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভেঙেছে, কিন্তু শিকড় এখনো রয়ে গেছে।’ তাই রাষ্ট্র সংস্কার, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথ এখনো শেষ হয়নি।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জাহিদুল ইসলাম বলেন, শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনই ছিল আন্দোলনের লক্ষ্য। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণে এখনো অনেক পথ বাকি। তাঁর মতে, বিচারপ্রক্রিয়ায় গতি আনতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আর জুলাইয়ের চেতনাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এবং নতুন প্রজন্মকে রাষ্ট্র গঠনের মূল শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ঢাকা মেইলের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাষ্ট্র সংস্কার, বিচারপ্রক্রিয়া, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভূমিকা, আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ এবং সরকার ও নাগরিকদের প্রতি নিজের প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন তারিক আবেদীন ইমন।
ঢাকা মেইল: জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পর ফিরে তাকালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন কী মনে হয়?
জাহিদুল ইসলাম: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল তরুণদের ঐক্য। তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলনে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হয়েছিল, যা প্রমাণ করেছে—জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হলে বড় পরিবর্তন সম্ভব। দ্বিতীয়ত, দেশে একটি ভয়হীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কেউ অন্যায় করলেও তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নতুন প্রজন্ম অর্জন করেছে। তৃতীয়ত, দেশকে নিয়ে ভাবতে ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী একটি নতুন নেতৃত্ব তৈরির ভিত্তি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ফ্যাসিবাদী কাঠামোর তৈরি মিথ্যা বয়ান ও বিভাজনের রাজনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। মানুষ এখন সত্য-মিথ্যা যাচাই করে নিজস্ব অবস্থান নির্ধারণে আরও সচেতন হচ্ছে। আমার কাছে এগুলোই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
ঢাকা মেইল: যে লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল, তার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
জাহিদুল ইসলাম: যে লক্ষ্য নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হয়েছে, আবার কিছু লক্ষ্য এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের দুঃশাসন থেকে মানুষ মুক্তি পেয়েছে এবং ফ্যাসিবাদী কাঠামো প্রাথমিকভাবে ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে সেই কাঠামোর শিকড় এখনো পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যায়নি। একইভাবে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। হত্যা, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলার নানা সমস্যা এখনো বিদ্যমান। আমি মনে করি, রাষ্ট্র সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। যারা আজ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তাঁরা জুলাইয়ের মূল চেতনা ধারণ করে সেই অসমাপ্ত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ঢাকা মেইল: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জুলাইয়ের চেতনা ধারণের ক্ষেত্রে আপনি কী দেখছেন?
জাহিদুল ইসলাম: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জুলাইয়ের চেতনা ধারণের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। বিএনপি মুখে জুলাইয়ের কথা বললেও রাষ্ট্র সংস্কার, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের অবস্থান ও কার্যক্রমের মধ্যে কিছু অসঙ্গতি ও দ্বিচারিতা দেখা গেছে, যা প্রশ্নের জন্ম দেয়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শহীদ পরিবারকে সহযোগিতা এবং জুলাইকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এই চেতনা ধারণের চেষ্টা করছে বলে আমার মনে হয়। এনসিপি জুলাইয়ের নেতৃত্ব থেকে গড়ে উঠলেও রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়ে তারা যেভাবে দ্রুত ও বিপ্লবী মানসিকতায় সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিতে পারত, তা করতে পারেনি। ফলে তাদের ক্ষেত্রেও কিছু প্রত্যাশা অপূর্ণ রয়ে গেছে। তবে আমরা আশা করি, শুধু বক্তব্যে নয়, সব রাজনৈতিক দলই নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রকৃত অর্থে জুলাইয়ের চেতনা ধারণ ও বাস্তবায়নে আন্তরিক ভূমিকা রাখবে।
ঢাকা মেইল: দায়ীদের বিচারে সবচেয়ে বড় বাধা কী?
জাহিদুল ইসলাম: আমার মতে, দায়ীদের বিচারে সবচেয়ে বড় বাধা হলো প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দ্রুততার অভাব। এত চাক্ষুষ প্রমাণ থাকার পরও বিচারপ্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। আমরা চাই, ট্রাইব্যুনালে নিরপেক্ষ ও দক্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হোক। পাশাপাশি মামলা-বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। শহীদ পরিবারের অনেক সদস্য অপরাধীদের পক্ষ থেকে হুমকি পাওয়ার অভিযোগও করেছেন। সরকার আন্তরিক ও দৃঢ় অবস্থান নিলে বিচারপ্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি।
ঢাকা মেইল: আগামী পাঁচ বছরে জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
জাহিদুল ইসলাম: আগামী পাঁচ বছরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এর চেতনা ও অর্জনকে ধরে রাখা। আমার আশঙ্কা, আওয়ামী লীগ দেশে-বিদেশে বিভিন্নভাবে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে এবং অনলাইন-অফলাইনে নানা ধরনের বয়ান তৈরি করে জুলাইকে বিতর্কিত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে জুলাইয়ের যোদ্ধাদেরও বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চলতে পারে। তাই জুলাইকে শুধু বক্তৃতা বা স্মরণানুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর চেতনাকে সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। সরকার, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
ঢাকা মেইল: আবারও যদি একই ধরনের সংকট তৈরি হয়, তাহলে আপনাদের করণীয় কী হবে?
জাহিদুল ইসলাম: বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভবিষ্যতেও বিভিন্ন ধরনের সংকট ও ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে জাতীয় ঐক্য এবং উদার রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আমরা বিশ্বাস করি, দেশের যেকোনো সংকটে ছাত্র-যুবসমাজ অতীতের মতোই অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছে, ছাত্র-যুবকরা যখন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নেমেছে, তখন আন্দোলন নতুন গতি পেয়েছে এবং সফল হয়েছে। তাই ভবিষ্যতে যদি আবারও কোনো জাতীয় সংকট তৈরি হয়, তাহলে জাতীয় ঐক্যকে ভিত্তি করে এবং সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়েই তা মোকাবিলা করতে হবে।
ঢাকা মেইল: সরকারের প্রতি আপনার একান্ত পরামর্শ কী?
জাহিদুল ইসলাম: সরকারের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, তারা যেন দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। রাজনৈতিক অর্জনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি শক্তিশালী না হলে রাজনৈতিক সাফল্যও দীর্ঘস্থায়ী হবে না। একই সঙ্গে আমরা চাই, সরকার শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তব কর্মকাণ্ডেও জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করুক এবং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করুক। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশ পরিচালনা এবং যেকোনো আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখাও জরুরি।
ঢাকা মেইল: দেশবাসীর প্রতি আপনার কী পরামর্শ?
জাহিদুল ইসলাম: দেশবাসীর প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, আমরা যেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যে ঐক্য, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছিলাম, তা ধরে রাখতে পারি। রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, প্রতিটি নাগরিকেরও। তাই সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে হবে। একই সঙ্গে যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে এবং মেধাপাচার (ব্রেইন ড্রেইন) রোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে দেশের মেধাবীরা দেশের উন্নয়নেই অবদান রাখতে পারেন। সর্বোপরি, জুলাইকে শুধু বক্তৃতা বা স্মরণানুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি আমরা এর চেতনাকে আমাদের ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে ধারণ করতে পারি, তাহলে একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
টিএই/এআর


























